ভেজাল ও বিষাক্ত খাবার: দেশের মানুষের জন্য নীরব হুমকি
- প্রকাশঃ ১০:৩৭:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 36
ছবি: প্রজন্ম কথা
আজকের বাংলাদেশে খাবার মানেই অনিশ্চয়তা। চাল, ডাল, আটা, মসলা, দুধ, মিষ্টি, ফল কিংবা মাছ প্রায় প্রতিটি খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ফল পাকাতে ব্যবহৃত হচ্ছে কার্বাইড ও ফরমালিন, মাছ ও মুরগিতে প্রয়োগ করা হচ্ছে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক, এমনকি শিশুখাদ্য ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধেও মিলছে ভেজাল উপাদান। প্রতিনিয়ত মানুষের শরীরে ঢুকছে নীরব বিষ, যা কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের জন্য নয় সমগ্র জাতির ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) পরীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের খাদ্য নমুনার প্রায় ৫২ শতাংশই দূষিত। ফল ও শাকসবজির ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ নমুনায় কীটনাশকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। চালের নমুনায় অতিমাত্রায় আর্সেনিক ও ক্রোমিয়াম, হলুদের গুঁড়ায় সিসা ও ভারী ধাতু এবং লবণে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি সিসার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এমনকি মাছ ও মুরগিতেও মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া যাচ্ছে।
এই সংকটের মূল কারণ প্রশাসনিক উদাসীনতা ও সমন্বয়হীনতা। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিএসটিআই এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে ভেজালকারীরা দিনের পর দিন পার পেয়ে যাচ্ছে। দেশে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ থাকা সত্ত্বেও আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। ফলে সাধারণ মানুষ এখনও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত।
বিএসটিআই ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (সিএবি) অনুসন্ধান বলছে, বাজারের প্রায় ৮৫ শতাংশ মাছ ফরমালিনযুক্ত এবং ফল পাকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে কার্বাইড ও ইথোফেন। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে মানহীন খাদ্যপণ্যের সংখ্যা ৮১ থেকে বেড়ে ১৯৯-এ দাঁড়িয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে সবচেয়ে বেশি শিশুদের ওপর তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি। দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা পড়ছে চরম চাপে।
আরও পড়ুন
হলুদে ভেজাল, রঙে নয়, বিষে রাঙানো খাদ্য!
ভেজাল খাদ্য কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয় এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তা সংকট। সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো জাতি এগোতে পারে না। অথচ ভেজাল খাদ্যের কারণে ধীরে ধীরে একটি অসুস্থ জাতি গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারি তদারকির দুর্বলতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
বিএসটিআই গত এক বছরে ১ হাজার ১০২টি অভিযান পরিচালনা করে ২ কোটি ৫৩ লাখ টাকার বেশি জরিমানা আদায় করেছে। নিম্নমানের পণ্য বাজার থেকে অপসারণ ও কিছু প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলও হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ এখনো বিচ্ছিন্ন ও অস্থায়ী। কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ ছাড়া ভেজাল খাদ্যের ভয়াল চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।
এই লড়াইয়ে কৃষক মূলত দায়ী নন। অধিকাংশ কৃষকই সৎভাবে উৎপাদন করেন; কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের লোভ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং একই সঙ্গে সৎ কৃষকের মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সুস্থ জাতি গঠনের প্রথম শর্ত হলো ভেজালমুক্ত খাদ্য। আর সেই ভিত্তি রচিত হয় মাঠের সৎ কৃষকের ঘামে এবং রাষ্ট্রের শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদারকিতে। এখনই সময় নীরব এই হুমকির বিরুদ্ধে সমন্বিত ও দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলার।





























