ঢাকা ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কয়েক বছরে ফ্ল্যাট–প্লট–টয়োটা হ্যারিয়ার: সিটি ব্যাংক কর্মকর্তার সম্পদবৃদ্ধি নিয়ে তদন্ত

বিশেষ প্রতিনিধি
  • প্রকাশঃ ১২:৫১:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 143

অভিযুক্ত সিটি ব্যাংক কর্মকর্তা মোতাসিম বিল্লাহ সিজন | ছবি: সংগৃহীত


পেশায় তিনি একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। কিন্তু তার হাতে যেন ছিল ‘আলাদিনের চেরাগ’। তবে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে তার জীবনযাত্রা ও সম্পদের পরিমাণ এমনভাবে পাল্টেছে যে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ব্যাংকের ভেতর-বাইরে। সিটি ব্যাংকের কার্ড ডিভিশন থেকে উঠে আসা এই কর্মকর্তা মোতাসিম বিল্লাহ সিজন এখন ঢাকার আফতাবনগরে ফ্ল্যাটের মালিক; একই এলাকায় রয়েছে প্লটও। চলাফেরায় ব্যবহার করেন অর্ধকোটি টাকার বেশি দামের টয়োটা হ্যারিয়ার।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র বলছে, বিগত সরকারের সময় থেকেই বিভিন্ন মন্ত্রী ও পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। অভিযোগ আছে সাবেক মন্ত্রী নসরুল হামিদ, তাজুল ইসলাম, সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী, মনিরুল ইসলাম, ডিআইজি আব্দুল বাতেন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম, হাবিবুর রহমানসহ সাবেক কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও মন্ত্রীর অবৈধ অর্থ লেনদেন ও পাচারের সঙ্গেও সিজনের সম্পৃক্ততা ছিল।
সম্প্রতি বনানী শাখায় এক নারী সহকর্মীর সঙ্গে সিজনের আচরণ নিয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়। ব্যাংকের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ওই সহকর্মীর সঙ্গে তিনি এমন দুর্ব্যবহার করেন যে তা উপস্থিত কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। ঘটনার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলে তিনি উল্টো পদত্যাগপত্র পাঠান।

সিটি ব্যাংকের বিভিন্ন কর্মকর্তা বলছেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে গত ৭–৮ বছরে সিজন ব্যাংকের ভেতরে কার্যত অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন। ২০১৯ সালে একই ব্যাংকের কর্মী পপি এমডি মাসরুর আরেফিনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করলে তা নস্যাৎ করতে সিজন পুলিশি যোগাযোগ ব্যবহার করেন এমন অভিযোগও রয়েছে। বিনিময়ে তৎকালীন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার আত্মীয়-স্বজনকে ব্যাংকে চাকরি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

২০২১ ও ২০২২ সালে টানা দুই বছরে সিজন দুবার পদোন্নতি পান। কার্ড ডিভিশনের সেলস টিম লিডার থেকে ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংয়ে বদলি হয়ে পরে একই বছরে ভিপি পদে উন্নীত হন। কোনো বিশেষ দক্ষতা নয়, বরং এমডির বিশেষ অনুকম্পার কারণেই এই পদোন্নতি এমন অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ আছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্যতা কাজে লাগিয়ে আফতাবনগর জহুরুল ইসলাম সিটি সোসাইটির নির্বাচনে তিনি প্রভাব বিস্তার করেন। ভোটে কারচুপি করে নিজে প্রচার সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন এবং নিজের পুরো প্যানেলকে জয়ী করান। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা অভিযোগ করেন গুম ও নির্যাতনের ভয় দেখানো হয়েছিল, ফলে তারা মুখ খোলেননি।

সিজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকের নিলাম হওয়া টয়োটা হ্যারিয়ার গাড়িটি তিনি কাস্টমারকে দিয়ে নিলাম স্থগিত করিয়ে নিজেই ৫২ লাখ টাকা দিয়ে কিনে নেন। বিষয়টি ব্যাংকের নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন ও স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখা হলেও সেসময় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নীরব ছিল।

মানবসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে তিনি পদত্যাগ করলেও তা এখনো গ্রহণ করা হয়নি। তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে এবং তার সম্পদবৃদ্ধি ও আচরণসংক্রান্ত অভিযোগে তদন্ত চলছে।

যোগাযোগ করা হলে সিজন জানান, ছাত্রজীবনে তিনি শিবিরকর্মী ছিলেন, পরে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ফ্ল্যাট, প্লট ও হ্যারিয়ার কেনার বিষয়ে তিনি বলেন সবই লোন নিয়ে করেছেন। আবার স্বীকার করেন ব্যাংকের রিকভারি গাড়িটি তিনি নিজেই কিনেছেন।

বনানী শাখায় সহকর্মীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার প্রসঙ্গে বলেন, ‘টিমের একজনকে বকেছি। বিজনেসের জন্য বকা তো দিতেই হয়।’ সবশেষে তিনি জানান, ব্যাংকের আচরণে অপমানিত হয়েই তিনি পদত্যাগ করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে সিজনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে সিটি ব্যাংকের এমডি ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের ওপর চাপ দিচ্ছেন।

শেয়ার করুন

কয়েক বছরে ফ্ল্যাট–প্লট–টয়োটা হ্যারিয়ার: সিটি ব্যাংক কর্মকর্তার সম্পদবৃদ্ধি নিয়ে তদন্ত

প্রকাশঃ ১২:৫১:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫

অভিযুক্ত সিটি ব্যাংক কর্মকর্তা মোতাসিম বিল্লাহ সিজন | ছবি: সংগৃহীত


পেশায় তিনি একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। কিন্তু তার হাতে যেন ছিল ‘আলাদিনের চেরাগ’। তবে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে তার জীবনযাত্রা ও সম্পদের পরিমাণ এমনভাবে পাল্টেছে যে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ব্যাংকের ভেতর-বাইরে। সিটি ব্যাংকের কার্ড ডিভিশন থেকে উঠে আসা এই কর্মকর্তা মোতাসিম বিল্লাহ সিজন এখন ঢাকার আফতাবনগরে ফ্ল্যাটের মালিক; একই এলাকায় রয়েছে প্লটও। চলাফেরায় ব্যবহার করেন অর্ধকোটি টাকার বেশি দামের টয়োটা হ্যারিয়ার।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র বলছে, বিগত সরকারের সময় থেকেই বিভিন্ন মন্ত্রী ও পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। অভিযোগ আছে সাবেক মন্ত্রী নসরুল হামিদ, তাজুল ইসলাম, সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী, মনিরুল ইসলাম, ডিআইজি আব্দুল বাতেন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম, হাবিবুর রহমানসহ সাবেক কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও মন্ত্রীর অবৈধ অর্থ লেনদেন ও পাচারের সঙ্গেও সিজনের সম্পৃক্ততা ছিল।
সম্প্রতি বনানী শাখায় এক নারী সহকর্মীর সঙ্গে সিজনের আচরণ নিয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়। ব্যাংকের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ওই সহকর্মীর সঙ্গে তিনি এমন দুর্ব্যবহার করেন যে তা উপস্থিত কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। ঘটনার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলে তিনি উল্টো পদত্যাগপত্র পাঠান।

সিটি ব্যাংকের বিভিন্ন কর্মকর্তা বলছেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে গত ৭–৮ বছরে সিজন ব্যাংকের ভেতরে কার্যত অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন। ২০১৯ সালে একই ব্যাংকের কর্মী পপি এমডি মাসরুর আরেফিনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করলে তা নস্যাৎ করতে সিজন পুলিশি যোগাযোগ ব্যবহার করেন এমন অভিযোগও রয়েছে। বিনিময়ে তৎকালীন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার আত্মীয়-স্বজনকে ব্যাংকে চাকরি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

২০২১ ও ২০২২ সালে টানা দুই বছরে সিজন দুবার পদোন্নতি পান। কার্ড ডিভিশনের সেলস টিম লিডার থেকে ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংয়ে বদলি হয়ে পরে একই বছরে ভিপি পদে উন্নীত হন। কোনো বিশেষ দক্ষতা নয়, বরং এমডির বিশেষ অনুকম্পার কারণেই এই পদোন্নতি এমন অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ আছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্যতা কাজে লাগিয়ে আফতাবনগর জহুরুল ইসলাম সিটি সোসাইটির নির্বাচনে তিনি প্রভাব বিস্তার করেন। ভোটে কারচুপি করে নিজে প্রচার সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন এবং নিজের পুরো প্যানেলকে জয়ী করান। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা অভিযোগ করেন গুম ও নির্যাতনের ভয় দেখানো হয়েছিল, ফলে তারা মুখ খোলেননি।

সিজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকের নিলাম হওয়া টয়োটা হ্যারিয়ার গাড়িটি তিনি কাস্টমারকে দিয়ে নিলাম স্থগিত করিয়ে নিজেই ৫২ লাখ টাকা দিয়ে কিনে নেন। বিষয়টি ব্যাংকের নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন ও স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখা হলেও সেসময় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নীরব ছিল।

মানবসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে তিনি পদত্যাগ করলেও তা এখনো গ্রহণ করা হয়নি। তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে এবং তার সম্পদবৃদ্ধি ও আচরণসংক্রান্ত অভিযোগে তদন্ত চলছে।

যোগাযোগ করা হলে সিজন জানান, ছাত্রজীবনে তিনি শিবিরকর্মী ছিলেন, পরে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ফ্ল্যাট, প্লট ও হ্যারিয়ার কেনার বিষয়ে তিনি বলেন সবই লোন নিয়ে করেছেন। আবার স্বীকার করেন ব্যাংকের রিকভারি গাড়িটি তিনি নিজেই কিনেছেন।

বনানী শাখায় সহকর্মীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার প্রসঙ্গে বলেন, ‘টিমের একজনকে বকেছি। বিজনেসের জন্য বকা তো দিতেই হয়।’ সবশেষে তিনি জানান, ব্যাংকের আচরণে অপমানিত হয়েই তিনি পদত্যাগ করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে সিজনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে সিটি ব্যাংকের এমডি ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের ওপর চাপ দিচ্ছেন।
সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”