ঢাকা ০৮:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬, ১৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভোটের রাজনীতিতে তিন ছেলেকে হারানো মা গোলজার বেগম: পাঁচ মাসেও গ্রেপ্তার নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশঃ ১০:৫১:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 74

তিন ছেলের ছবি হাতে বৃদ্ধা মা গোলজার বেগম। সম্প্রতি তোলা | ছবি: সংগৃহীত 


কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের মনখালী গ্রামে ভোটের রাজনীতির বিরোধে একে একে তিন সন্তানকে হারিয়েছেন গোলজার বেগম। সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য ছেলে কামাল হোসাইন হত্যার পাঁচ মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে পরিবারটি। অসুস্থ ও বৃদ্ধ এই মা নিহত সন্তানদের ছবি বুকে জড়িয়ে বিচার পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন।

উখিয়া উপজেলার সমুদ্র উপকূলীয় জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মনখালী গ্রামে গেলে শোনা যায় এক বৃদ্ধা নারীর বিলাপ। পথচারী কাউকে দেখলেই তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁর ছেলেদের ফিরিয়ে দেওয়ার কথা। তিনি গোলজার বেগম (৬৬)। এক যুগ আগে তাঁর স্বামী, সাবেক ইউপি সদস্য ছিদ্দিক আহমদের মৃত্যু হয়। এরপর চার ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে শুরু হয় তাঁর নতুন জীবন। কিন্তু স্থানীয় ভোটের রাজনীতি ধীরে ধীরে তাঁর পরিবারকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

দুই কানি জমির ওপর টিনশেডের পুরোনো ভিটেবাড়িতে বসবাস গোলজার বেগমের। সাত মাস আগে নিহত ছেলে কামাল হোসাইন বাড়ির একটি অংশ ভেঙে পাকা ঘর নির্মাণ করেন। ১৫ দিন পর মাকে নিয়ে সেখানে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই কামাল হোসাইনকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়। পরে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। বাড়ির আঙিনায় থাকা সুপারি ও নারকেলগাছের ফাঁকে এখনো শীতের হাওয়ার সঙ্গে মিশে থাকে মায়ের কান্নার সুর।

নিহত কামালের স্ত্রী ও দুই নাতিকে নিয়ে গোলজার বেগম এখন বাড়িতে একাই ভরসাহীন জীবন যাপন করছেন। ঘরে কোনো পুরুষ সদস্য নেই। পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ভেতর থেকে নিহত তিন ছেলের বাঁধাই করা ছবি বের করে বলেন, চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা একে একে আমার ছেলেদের হত্যা করেছে। খুনিরা এলাকায় ঘোরাফেরা করছে, অথচ বিচার হচ্ছে না।

নিহতদের বাবা ছিদ্দিক আহমদ স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত ইউপি সদস্য ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর দুবার ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন ছেলে কামাল হোসাইন। স্থানীয় সূত্র জানায়, ইউপি নির্বাচনকেন্দ্রিক বিরোধের জের ধরেই ছিদ্দিক আহমদের তিন ছেলে হত্যার শিকার হন।

গত ৮ জুলাই জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ও য়ার্ডের ইউপি সদস্য কামাল হোসাইনের মরদেহ মনখালী গ্রামের একটি খাল থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই সাহাব উদ্দিন বাদী হয়ে উখিয়া থানায় আটজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ-ছয়জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে মামলা দায়েরের পরও কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।

এর আগে ২০১৯ সালের ২৭ জুলাই বড় ছেলে জসিম উদ্দিনকে হত্যা করে মেরিন ড্রাইভের পাশে সাগরপাড়ে ফেলে রাখা হয়। ওই মামলাটি বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) চট্টগ্রামে তদন্তাধীন। আর ২০১৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মেজ ছেলে জিয়া উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনাকেও পরিবার পরিকল্পিত হত্যা বলে দাবি করলেও সে সময় কোনো মামলা হয়নি।

মামলার তদন্ত প্রসঙ্গে উখিয়া থানার সাবেক তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই দুর্জয় সরকার জানান, প্রাথমিক তদন্তে কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে মামলাটি জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করছে। ডিবির পরিদর্শক ইমন চৌধুরী বলেন, তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে, তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় অভিযোগপত্র দাখিল বিলম্বিত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, মামলার আসামিরা হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিনে থাকায় গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। নিহত ও অভিযুক্তরা পরস্পরের নিকটাত্মীয়। ২০১৭ সাল থেকে নির্বাচনী দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে সহিংসতায় রূপ নেয়। ২০২১ সালের ইউপি নির্বাচনে কামাল হোসাইনের বিজয়ের পর বিরোধ আরও তীব্র হয় এবং শুরু হয় খুনোখুনি।

আজও গোলজার বেগম ছেলেহারা মায়ের অসহায় কান্না নিয়ে অপেক্ষা করছেন—কবে তাঁর সন্তানের হত্যার বিচার হবে, কবে থামবে এই রক্তাক্ত রাজনীতি।

শেয়ার করুন

ভোটের রাজনীতিতে তিন ছেলেকে হারানো মা গোলজার বেগম: পাঁচ মাসেও গ্রেপ্তার নেই

প্রকাশঃ ১০:৫১:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫

তিন ছেলের ছবি হাতে বৃদ্ধা মা গোলজার বেগম। সম্প্রতি তোলা | ছবি: সংগৃহীত 


কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের মনখালী গ্রামে ভোটের রাজনীতির বিরোধে একে একে তিন সন্তানকে হারিয়েছেন গোলজার বেগম। সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য ছেলে কামাল হোসাইন হত্যার পাঁচ মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে পরিবারটি। অসুস্থ ও বৃদ্ধ এই মা নিহত সন্তানদের ছবি বুকে জড়িয়ে বিচার পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন।

উখিয়া উপজেলার সমুদ্র উপকূলীয় জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মনখালী গ্রামে গেলে শোনা যায় এক বৃদ্ধা নারীর বিলাপ। পথচারী কাউকে দেখলেই তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁর ছেলেদের ফিরিয়ে দেওয়ার কথা। তিনি গোলজার বেগম (৬৬)। এক যুগ আগে তাঁর স্বামী, সাবেক ইউপি সদস্য ছিদ্দিক আহমদের মৃত্যু হয়। এরপর চার ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে শুরু হয় তাঁর নতুন জীবন। কিন্তু স্থানীয় ভোটের রাজনীতি ধীরে ধীরে তাঁর পরিবারকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

দুই কানি জমির ওপর টিনশেডের পুরোনো ভিটেবাড়িতে বসবাস গোলজার বেগমের। সাত মাস আগে নিহত ছেলে কামাল হোসাইন বাড়ির একটি অংশ ভেঙে পাকা ঘর নির্মাণ করেন। ১৫ দিন পর মাকে নিয়ে সেখানে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই কামাল হোসাইনকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়। পরে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। বাড়ির আঙিনায় থাকা সুপারি ও নারকেলগাছের ফাঁকে এখনো শীতের হাওয়ার সঙ্গে মিশে থাকে মায়ের কান্নার সুর।

নিহত কামালের স্ত্রী ও দুই নাতিকে নিয়ে গোলজার বেগম এখন বাড়িতে একাই ভরসাহীন জীবন যাপন করছেন। ঘরে কোনো পুরুষ সদস্য নেই। পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ভেতর থেকে নিহত তিন ছেলের বাঁধাই করা ছবি বের করে বলেন, চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা একে একে আমার ছেলেদের হত্যা করেছে। খুনিরা এলাকায় ঘোরাফেরা করছে, অথচ বিচার হচ্ছে না।

নিহতদের বাবা ছিদ্দিক আহমদ স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত ইউপি সদস্য ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর দুবার ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন ছেলে কামাল হোসাইন। স্থানীয় সূত্র জানায়, ইউপি নির্বাচনকেন্দ্রিক বিরোধের জের ধরেই ছিদ্দিক আহমদের তিন ছেলে হত্যার শিকার হন।

গত ৮ জুলাই জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ও য়ার্ডের ইউপি সদস্য কামাল হোসাইনের মরদেহ মনখালী গ্রামের একটি খাল থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই সাহাব উদ্দিন বাদী হয়ে উখিয়া থানায় আটজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ-ছয়জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে মামলা দায়েরের পরও কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।

এর আগে ২০১৯ সালের ২৭ জুলাই বড় ছেলে জসিম উদ্দিনকে হত্যা করে মেরিন ড্রাইভের পাশে সাগরপাড়ে ফেলে রাখা হয়। ওই মামলাটি বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) চট্টগ্রামে তদন্তাধীন। আর ২০১৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মেজ ছেলে জিয়া উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনাকেও পরিবার পরিকল্পিত হত্যা বলে দাবি করলেও সে সময় কোনো মামলা হয়নি।

মামলার তদন্ত প্রসঙ্গে উখিয়া থানার সাবেক তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই দুর্জয় সরকার জানান, প্রাথমিক তদন্তে কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে মামলাটি জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করছে। ডিবির পরিদর্শক ইমন চৌধুরী বলেন, তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে, তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় অভিযোগপত্র দাখিল বিলম্বিত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, মামলার আসামিরা হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিনে থাকায় গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। নিহত ও অভিযুক্তরা পরস্পরের নিকটাত্মীয়। ২০১৭ সাল থেকে নির্বাচনী দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে সহিংসতায় রূপ নেয়। ২০২১ সালের ইউপি নির্বাচনে কামাল হোসাইনের বিজয়ের পর বিরোধ আরও তীব্র হয় এবং শুরু হয় খুনোখুনি।

আজও গোলজার বেগম ছেলেহারা মায়ের অসহায় কান্না নিয়ে অপেক্ষা করছেন—কবে তাঁর সন্তানের হত্যার বিচার হবে, কবে থামবে এই রক্তাক্ত রাজনীতি।