ঢাকা ১১:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মব সন্ত্রাসের আতঙ্কের পাঁচ বছরে নিহত বেড়েছে সাত গুণ, চলতি বছরেই প্রাণ গেল ১৯৬ জনের

মোবারক আজাদ
  • প্রকাশঃ ০২:২৯:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 68

ছবি: সংগৃহীত


মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিক থেকে চলতি বছরটিকে মব ভায়োলেন্সের ক্ষেত্রে চরম উদ্বেগজনক ও আতঙ্কের বছর হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশ্লেষকরা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা—কোথাও এই সহিংসতা থেকে রেহাই নেই। সন্দেহ, গুজব ও তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সংঘটিত এসব ঘটনায় মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে উঠেছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জরিপ অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ১৮৪ জন মব ভায়োলেন্সে নিহত হয়েছেন। ডিসেম্বর মাসের পূর্ণাঙ্গ জরিপ এখনো প্রকাশ না হলেও, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে আরও অন্তত ১২ জন গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আসকের জরিপ ও কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানের তথ্য মিলিয়ে চলতি বছর মোট ১৯৬ জন মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এ সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের ওপরও একাধিকবার মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটেছে।

আসকের জরিপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত চার বছর ১১ মাসে সারা দেশে মবের ঘটনায় মোট ৪২৭ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২১ সালে নিহত হন ২৮ জন, ২০২২ সালে ৩৬ জন, ২০২৩ সালে ৫১ জন, ২০২৪ সালে ১২৮ জন এবং চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসেই নিহত হয়েছেন ১৮৪ জন। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে মব সন্ত্রাসে নিহতের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাত গুণ।

অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। গত পাঁচ বছরে এই বিভাগে মোট ১৯০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসেই ৭৮ জন। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে পাঁচ বছরে ৮০ জন নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে কম ঘটনা ঘটেছে সিলেট বিভাগে—পাঁচ বছরে সেখানে ১৫ জন নিহত হয়েছেন।

চুরি, খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টা, ছিনতাই, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, কটূক্তি, প্রতারণা ও অপহরণের অভিযোগ এনে এসব গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ না দিয়েই উত্তেজিত জনতা কাউকে পিটিয়ে হত্যা করেছে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই মব সন্ত্রাস থামানো সম্ভব নয়। অন্যথায় আতঙ্কের এই বছর ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপে ফিরে আসতে পারে।

চলতি বছর মব ভায়োলেন্স বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে না পারা, আইনের শাসনের ওপর মানুষের আস্থার ঘাটতি, অপরাধের বিচার নিশ্চিত না হওয়ার ধারণা মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উদ্বুদ্ধ করছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজবের দ্রুত বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। একটি পোস্ট, ভিডিও বা অডিও ক্লিপ মুহূর্তেই জনমনে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে দিচ্ছে।

এ ছাড়া ব্যক্তিগত শত্রুতা, তাৎক্ষণিক উত্তেজনা ও দলগত মানসিকতা ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তির নিজস্ব বিবেচনাবোধ নষ্ট করে দেয়। অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিও মানুষের ধৈর্য কমিয়ে দিয়েছে, যা মব সহিংসতার প্রবণতা বাড়াচ্ছে।

অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, বিশৃঙ্খল জনতা যখন আইনের আশ্রয় না নিয়ে নিজের হাতে আইন তুলে নেয়, তখন সেটিই মব জাস্টিস বা মব ভায়োলেন্স। সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক বিরোধ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর প্রবণতাও মব সন্ত্রাস বাড়িয়ে তুলছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চলতি বছর ঢাকাসহ সারা দেশে বেশ কয়েকটি গণপিটুনির ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কোথাও ছিনতাইয়ের অভিযোগে, কোথাও চোর সন্দেহে পথচারীদের মারধরের শিকার হতে হয়েছে। অনেক ঘটনায় পুলিশ পৌঁছানোর আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

রাজধানীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন এলাকা, অফিস-আদালত, বাস টার্মিনাল, কাঁচাবাজার ও জনবহুল মোড়গুলোতে এ ধরনের ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটেছে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও মব ভায়োলেন্স উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গ্রামাঞ্চলে চুরি-ডাকাতির সন্দেহে একাধিক ব্যক্তিকে মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও আবার মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে ‘চোর’ সন্দেহে পিটিয়ে আহত বা হত্যা করা হয়েছে। কিছু ঘটনায় ধর্মীয় অনুভূতি ও গুজব বড় ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্লেষকরা বলেন, ধর্মীয় ইস্যুতে গুজব ছড়ালে মানুষ দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে এবং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর একটি দৃষ্টান্ত গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ঘটে যাওয়া ঘটনা। সেখানে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে হিন্দু ধর্মাবলম্বী পোশাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাস (২৮)–কে দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। যদিও র‌্যাব জানিয়েছে, এ ঘটনায় ধর্ম অবমাননার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সূত্র বলছে, ২০২৫ সালে গণপিটুনি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও আবার পুলিশের দেরিতে পৌঁছানোর কারণে প্রাণহানি ঘটেছে। সরকার ও পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো চলতি বছরের গণপিটুনির ঘটনাগুলোকে ‘চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তাদের মতে, বিচার প্রক্রিয়া রাষ্ট্রের হাতে থাকা উচিত, কোনোভাবেই জনতার হাতে নয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, দেশে মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। তবে পুলিশের একার পক্ষে মব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে সবার সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, মব সন্ত্রাস নিয়ে সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী নির্দেশনা দিচ্ছে, কিন্তু যারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত তারা সেগুলো গুরুত্ব দিচ্ছে না। এদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মব ভায়োলেন্স সমাজে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সামাজিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, বাড়ছে অবিশ্বাস। আইনের শাসনের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

প্রাসঙ্গিক

শেয়ার করুন

মব সন্ত্রাসের আতঙ্কের পাঁচ বছরে নিহত বেড়েছে সাত গুণ, চলতি বছরেই প্রাণ গেল ১৯৬ জনের

প্রকাশঃ ০২:২৯:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫

ছবি: সংগৃহীত


মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিক থেকে চলতি বছরটিকে মব ভায়োলেন্সের ক্ষেত্রে চরম উদ্বেগজনক ও আতঙ্কের বছর হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশ্লেষকরা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা—কোথাও এই সহিংসতা থেকে রেহাই নেই। সন্দেহ, গুজব ও তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সংঘটিত এসব ঘটনায় মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে উঠেছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জরিপ অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ১৮৪ জন মব ভায়োলেন্সে নিহত হয়েছেন। ডিসেম্বর মাসের পূর্ণাঙ্গ জরিপ এখনো প্রকাশ না হলেও, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে আরও অন্তত ১২ জন গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আসকের জরিপ ও কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানের তথ্য মিলিয়ে চলতি বছর মোট ১৯৬ জন মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এ সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের ওপরও একাধিকবার মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটেছে।

আসকের জরিপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত চার বছর ১১ মাসে সারা দেশে মবের ঘটনায় মোট ৪২৭ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২১ সালে নিহত হন ২৮ জন, ২০২২ সালে ৩৬ জন, ২০২৩ সালে ৫১ জন, ২০২৪ সালে ১২৮ জন এবং চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসেই নিহত হয়েছেন ১৮৪ জন। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে মব সন্ত্রাসে নিহতের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাত গুণ।

অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। গত পাঁচ বছরে এই বিভাগে মোট ১৯০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসেই ৭৮ জন। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে পাঁচ বছরে ৮০ জন নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে কম ঘটনা ঘটেছে সিলেট বিভাগে—পাঁচ বছরে সেখানে ১৫ জন নিহত হয়েছেন।

চুরি, খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টা, ছিনতাই, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, কটূক্তি, প্রতারণা ও অপহরণের অভিযোগ এনে এসব গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ না দিয়েই উত্তেজিত জনতা কাউকে পিটিয়ে হত্যা করেছে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই মব সন্ত্রাস থামানো সম্ভব নয়। অন্যথায় আতঙ্কের এই বছর ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপে ফিরে আসতে পারে।

চলতি বছর মব ভায়োলেন্স বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে না পারা, আইনের শাসনের ওপর মানুষের আস্থার ঘাটতি, অপরাধের বিচার নিশ্চিত না হওয়ার ধারণা মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উদ্বুদ্ধ করছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজবের দ্রুত বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। একটি পোস্ট, ভিডিও বা অডিও ক্লিপ মুহূর্তেই জনমনে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে দিচ্ছে।

এ ছাড়া ব্যক্তিগত শত্রুতা, তাৎক্ষণিক উত্তেজনা ও দলগত মানসিকতা ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তির নিজস্ব বিবেচনাবোধ নষ্ট করে দেয়। অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিও মানুষের ধৈর্য কমিয়ে দিয়েছে, যা মব সহিংসতার প্রবণতা বাড়াচ্ছে।

অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, বিশৃঙ্খল জনতা যখন আইনের আশ্রয় না নিয়ে নিজের হাতে আইন তুলে নেয়, তখন সেটিই মব জাস্টিস বা মব ভায়োলেন্স। সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক বিরোধ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর প্রবণতাও মব সন্ত্রাস বাড়িয়ে তুলছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চলতি বছর ঢাকাসহ সারা দেশে বেশ কয়েকটি গণপিটুনির ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কোথাও ছিনতাইয়ের অভিযোগে, কোথাও চোর সন্দেহে পথচারীদের মারধরের শিকার হতে হয়েছে। অনেক ঘটনায় পুলিশ পৌঁছানোর আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

রাজধানীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন এলাকা, অফিস-আদালত, বাস টার্মিনাল, কাঁচাবাজার ও জনবহুল মোড়গুলোতে এ ধরনের ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটেছে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও মব ভায়োলেন্স উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গ্রামাঞ্চলে চুরি-ডাকাতির সন্দেহে একাধিক ব্যক্তিকে মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও আবার মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে ‘চোর’ সন্দেহে পিটিয়ে আহত বা হত্যা করা হয়েছে। কিছু ঘটনায় ধর্মীয় অনুভূতি ও গুজব বড় ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্লেষকরা বলেন, ধর্মীয় ইস্যুতে গুজব ছড়ালে মানুষ দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে এবং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর একটি দৃষ্টান্ত গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ঘটে যাওয়া ঘটনা। সেখানে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে হিন্দু ধর্মাবলম্বী পোশাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাস (২৮)–কে দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। যদিও র‌্যাব জানিয়েছে, এ ঘটনায় ধর্ম অবমাননার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সূত্র বলছে, ২০২৫ সালে গণপিটুনি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও আবার পুলিশের দেরিতে পৌঁছানোর কারণে প্রাণহানি ঘটেছে। সরকার ও পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো চলতি বছরের গণপিটুনির ঘটনাগুলোকে ‘চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তাদের মতে, বিচার প্রক্রিয়া রাষ্ট্রের হাতে থাকা উচিত, কোনোভাবেই জনতার হাতে নয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, দেশে মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। তবে পুলিশের একার পক্ষে মব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে সবার সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, মব সন্ত্রাস নিয়ে সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী নির্দেশনা দিচ্ছে, কিন্তু যারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত তারা সেগুলো গুরুত্ব দিচ্ছে না। এদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মব ভায়োলেন্স সমাজে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সামাজিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, বাড়ছে অবিশ্বাস। আইনের শাসনের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”