ঢাকা ০৯:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আওয়ামী লীগ আমলে গুমের শিকার অন্তত ১,৫৬৯ জন, এখনো নিখোঁজ ২৫১

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশঃ ১২:৪৬:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 81

আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে সংঘটিত গুমের ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনার সত্যতা পেয়েছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। এর মধ্যে অন্তত ২৫১ জন ব্যক্তি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, যাঁদের মৃত বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। এসব গুমের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় কমপক্ষে ২৮৭টি।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেয় কমিশন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন।

মোট অভিযোগ ১,৯১৩, গুম হিসেবে প্রমাণিত ১,৫৬৯

কমিশন জানায়, তাদের কাছে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগকে গুমের আইনি সংজ্ঞার আওতাভুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনা ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত, যেখানে নিখোঁজের নির্দিষ্ট সময় পর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।

এ ছাড়া ১১৩টি অভিযোগ তদন্তে দেখা গেছে, সেগুলো গুম হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আইনগত মানদণ্ড পূরণ করে না। কিছু ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছিলেন না, আবার কিছু ঘটনায় নিয়মিত গ্রেপ্তার হলেও আটককাল ২৪ ঘণ্টার কম ছিল।

প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে

কমিশনের মতে, জমা পড়া অভিযোগগুলো প্রকৃত ঘটনার পূর্ণ প্রতিফলন নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ হাজার ৫৬৯টি যাচাইকৃত অভিযোগ সম্ভবত মোট ঘটনার এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ মাত্র। সে হিসাবে সম্ভাব্য গুমের সংখ্যা আনুমানিক ৪ হাজার থেকে ৬ হাজারের মধ্যে হতে পারে।

র‍্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর নাম উঠে এসেছে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের ঘটনায় র‍্যাব, পুলিশ, ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার নাম উঠে এসেছে। বাহিনীভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট অভিযোগের প্রায় এক-চতুর্থাংশে র‍্যাবের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

কোন দলের কত গুম

কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে গুম হওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয়ের বিস্তারিত চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় জানা এমন ভুক্তভোগীর হার ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ (৯৪৮ জন)।

দলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী—

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর: ৪৭৬ জন (৫০.২%)

ইসলামী ছাত্রশিবির: ২৩৬ জন (২৪.৯%)

বিএনপি: ১৪২ জন (১৫%)

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল: ৪৬ জন (৪.৯%)

জাতীয়তাবাদী যুবদল: ১৭ জন (১.৮%)

কমিশন বলছে, এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে গুম ও সংশ্লিষ্ট নির্যাতন রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ছিল না। বরং বিরোধী রাজনৈতিক দল ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরাই প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিশ্চিত রাজনৈতিক পরিচয় থাকা নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী প্রায় ৬৮ শতাংশ। এ ছাড়া এখনো নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ২২ শতাংশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য।

গুম হয়েছেন ২৩ জন নারী

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ১ হাজার ৫৪৬ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে পুরুষ প্রায় ৯৮.৫ শতাংশ, আর নারী মাত্র ২৩ জন (১.৫ শতাংশ)। কমিশনের মতে, সামাজিক কলঙ্ক, ভয় ও চাপের কারণে নারী গুমের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা আনুষ্ঠানিক অভিযোগে প্রতিফলিত হয়নি।

বছরভিত্তিক গুমের চিত্র

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে গুমের ঘটনা ছিল ১০টি। পরবর্তী বছরগুলোতে সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে—২০১৩ সালে ১২৮টি, ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ২১৫টি এবং ২০১৭ ও ২০১৮ সালে প্রায় ১৯০টির বেশি গুমের ঘটনা ঘটে। ২০১৮ সালের পর সংখ্যায় কিছুটা হ্রাস পেলেও পুরো সময়জুড়েই গুমের ঘটনা অব্যাহত ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের এই প্রবণতা রাজনৈতিক অস্থিরতা, জাতীয় নির্বাচন, আন্দোলন ও নিরাপত্তা অভিযানের সময় তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গুমের ঘটনায় বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়।

ধারাবাহিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দমননীতির ইঙ্গিত

কমিশনের মতে, এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে গুম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি ছিল দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত একটি ধারাবাহিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দমননীতি, যার লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন ও ভীতি সৃষ্টি।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

প্রাসঙ্গিক

শেয়ার করুন

আওয়ামী লীগ আমলে গুমের শিকার অন্তত ১,৫৬৯ জন, এখনো নিখোঁজ ২৫১

প্রকাশঃ ১২:৪৬:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬

আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে সংঘটিত গুমের ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনার সত্যতা পেয়েছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। এর মধ্যে অন্তত ২৫১ জন ব্যক্তি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, যাঁদের মৃত বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। এসব গুমের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় কমপক্ষে ২৮৭টি।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেয় কমিশন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন।

মোট অভিযোগ ১,৯১৩, গুম হিসেবে প্রমাণিত ১,৫৬৯

কমিশন জানায়, তাদের কাছে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগকে গুমের আইনি সংজ্ঞার আওতাভুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনা ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত, যেখানে নিখোঁজের নির্দিষ্ট সময় পর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।

এ ছাড়া ১১৩টি অভিযোগ তদন্তে দেখা গেছে, সেগুলো গুম হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আইনগত মানদণ্ড পূরণ করে না। কিছু ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছিলেন না, আবার কিছু ঘটনায় নিয়মিত গ্রেপ্তার হলেও আটককাল ২৪ ঘণ্টার কম ছিল।

প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে

কমিশনের মতে, জমা পড়া অভিযোগগুলো প্রকৃত ঘটনার পূর্ণ প্রতিফলন নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ হাজার ৫৬৯টি যাচাইকৃত অভিযোগ সম্ভবত মোট ঘটনার এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ মাত্র। সে হিসাবে সম্ভাব্য গুমের সংখ্যা আনুমানিক ৪ হাজার থেকে ৬ হাজারের মধ্যে হতে পারে।

র‍্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর নাম উঠে এসেছে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের ঘটনায় র‍্যাব, পুলিশ, ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার নাম উঠে এসেছে। বাহিনীভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট অভিযোগের প্রায় এক-চতুর্থাংশে র‍্যাবের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

কোন দলের কত গুম

কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে গুম হওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয়ের বিস্তারিত চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় জানা এমন ভুক্তভোগীর হার ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ (৯৪৮ জন)।

দলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী—

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর: ৪৭৬ জন (৫০.২%)

ইসলামী ছাত্রশিবির: ২৩৬ জন (২৪.৯%)

বিএনপি: ১৪২ জন (১৫%)

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল: ৪৬ জন (৪.৯%)

জাতীয়তাবাদী যুবদল: ১৭ জন (১.৮%)

কমিশন বলছে, এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে গুম ও সংশ্লিষ্ট নির্যাতন রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ছিল না। বরং বিরোধী রাজনৈতিক দল ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরাই প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিশ্চিত রাজনৈতিক পরিচয় থাকা নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী প্রায় ৬৮ শতাংশ। এ ছাড়া এখনো নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ২২ শতাংশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য।

গুম হয়েছেন ২৩ জন নারী

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ১ হাজার ৫৪৬ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে পুরুষ প্রায় ৯৮.৫ শতাংশ, আর নারী মাত্র ২৩ জন (১.৫ শতাংশ)। কমিশনের মতে, সামাজিক কলঙ্ক, ভয় ও চাপের কারণে নারী গুমের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা আনুষ্ঠানিক অভিযোগে প্রতিফলিত হয়নি।

বছরভিত্তিক গুমের চিত্র

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে গুমের ঘটনা ছিল ১০টি। পরবর্তী বছরগুলোতে সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে—২০১৩ সালে ১২৮টি, ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ২১৫টি এবং ২০১৭ ও ২০১৮ সালে প্রায় ১৯০টির বেশি গুমের ঘটনা ঘটে। ২০১৮ সালের পর সংখ্যায় কিছুটা হ্রাস পেলেও পুরো সময়জুড়েই গুমের ঘটনা অব্যাহত ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের এই প্রবণতা রাজনৈতিক অস্থিরতা, জাতীয় নির্বাচন, আন্দোলন ও নিরাপত্তা অভিযানের সময় তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গুমের ঘটনায় বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়।

ধারাবাহিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দমননীতির ইঙ্গিত

কমিশনের মতে, এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে গুম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি ছিল দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত একটি ধারাবাহিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দমননীতি, যার লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন ও ভীতি সৃষ্টি।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”