নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘ধাপে ধাপে পরীক্ষা’ শুরু, ১২ ফেব্রুয়ারি হবে ফাইনাল: প্রধান উপদেষ্টা
- প্রকাশঃ ০৭:৩৯:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
- / 47
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন যেন ভবিষ্যতের জন্য একটি আদর্শ নির্বাচন হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে—সে লক্ষ্যেই সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা একযোগে কাজ করছে। তিনি বলেন, “নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের ধাপে ধাপে পরীক্ষা শুরু হলো। আজ থেকে শুরু, ১২ ফেব্রুয়ারি হবে ফাইনাল। এখন সবচেয়ে বড় নির্দেশ হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ। ইসির নির্দেশনা মেনে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।”
বুধবার (২১ জানুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর আয়োজিত গণভোটকে সামনে রেখে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় এসব কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন তিনি।
সভায় উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান, পুলিশ প্রধান, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা। বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং সভার আলোচনার সারসংক্ষেপ জানায়। পরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে সভার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
সভায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করাই সরকারের মূল দায়িত্ব। “জাতির জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই বিশাল কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করে আমরা একে একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে দাঁড় করাতে চাই,”—বলেন তিনি। নির্বাচনের দিন যেন কোনো ধরনের ঘাটতি বা দুর্বলতা না থাকে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কমান্ডের মূল ভূমিকায় থাকবে। তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করা হবে। “আমরা বডি ক্যামেরা ব্যবহার করবো, সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করবো এবং কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম থেকে সবকিছু মনিটরিং করা হবে,”—বলেন তিনি।
বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের ঘাটতি না থাকে। তিনি উল্লেখ করেন, এবারের নির্বাচন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। “তারা বিষয়টিকে খুবই সিরিয়াসলি নিয়েছেন। আমাদেরও সুপার সিরিয়াস থাকতে হবে,”—বলেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রস্তুতির ভিত্তিতে একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীরা ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখবেন এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য নষ্ট করবেন না।
সভায় নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ জানান, এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশগ্রহণ করছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ২৬টি দেশের প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ৩০০ সদস্যের একটি পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশে আসতে পারে। ইতোমধ্যে তাদের ৫৬ জন প্রতিনিধি দেশে অবস্থান করছেন এবং দুজন প্রতিনিধি মনোনয়নপত্র সংক্রান্ত আপিল প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন।
ইসি সচিব আরও জানান, আজ মধ্যরাত থেকে শুরু হয়ে ১০ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে ৭টা পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচারণা চালাতে পারবেন প্রার্থীরা। তিনি বলেন, সাইবার স্পেসে তথ্য বিকৃতি এবারের নির্বাচনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দলীয় প্রতীকের ব্যালট, গণভোটের ব্যালট ও পোস্টাল ব্যালট গণনায় বাড়তি সময় লাগতে পারে—এ বিষয়টি নিয়ে যেন কোনো ধরনের অপতথ্য বা গুজব না ছড়ায়, সে জন্য গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, নির্বাচনের দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে তাঁর মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, সব ভোটকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা হবে।
সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান সভায় জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকালে বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া ৩ হাজার ৬১৯টি অস্ত্রের মধ্যে ২ হাজার ২৫৯টি উদ্ধার করা হয়েছে, যা মোট লুট হওয়া অস্ত্রের ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে লুট হওয়া ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮ রাউন্ড গোলাবারুদের মধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ১০০ রাউন্ড উদ্ধার হয়েছে, যা প্রায় ৫২ শতাংশ।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, এবারের নির্বাচনে প্রিসাইডিং অফিসারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র আনসার সদস্যরা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে দায়িত্ব পালন করবেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, এবারের নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং প্রয়োজনে তারা ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় প্রবেশ করতে পারবেন।
স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গণি জানান, আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে মাঠপর্যায়ে বডি ক্যামেরা পৌঁছে দেওয়া হবে। ভোটের চার দিন আগে সব বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে এবং ভোটের পর আরও সাত দিন তারা মাঠে থাকবে। তিনি বলেন, আজ থেকেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একাধিক টিম নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্য ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং ও রেকর্ড করবে।
সভা শেষে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বডি ক্যামেরা সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। তিনি জানান, এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে এবং প্রয়োজনে আরও ঘন ঘন এ ধরনের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে।





























