ঢাকা ০৩:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইরানে বিক্ষোভের নতুন ঢেউ: আস্থার সংকটে ইসলামি প্রজাতন্ত্র, সামাল দিতে পারবে কি সরকার?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • প্রকাশঃ ০৮:৪৫:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 49

ইরানজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে নতুন দফার বিক্ষোভ। অর্থনৈতিক সংকট, রিয়ালের দরপতন ও দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এই আন্দোলনের মূল প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে এসেছে। বিদেশি চাপ বাড়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের মুখে পড়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধর্মীয় নেতৃত্ব ক্রমেই চাপে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গত মাসে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এ আন্দোলন ইতিমধ্যে দেশের ৩১টি প্রদেশের সবকটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও আন্দোলনের মাত্রা এখনো ২০২২ সালে মাসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হওয়া ব্যাপক বিক্ষোভের পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে গভীর আস্থার সংকটের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, নতুন করে শুরু হওয়া অস্থিরতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী ও চারজন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ২০০ জনকে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভ কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও ক্রমবর্ধমান হতাশার প্রতিফলন। ইরানের সংস্কারপন্থী শিবিরের এক সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের যেসব নীতিকে আদর্শিক স্তম্ভ হিসেবে দেখা হয়—পোশাকবিধি থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতি—তা ৩০ বছরের কম বয়সী তরুণ প্রজন্মের কাছে আর গ্রহণযোগ্য নয়। এই বয়সী জনগোষ্ঠীই বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, “এটি শুধু রিয়ালের পতন নয়; এটি বিশ্বাসের পতন।”

সরকারি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভ মোকাবিলায় দ্বিমুখী কৌশল নিচ্ছে। একদিকে অর্থনৈতিক দাবিকে বৈধ আখ্যা দিয়ে সংলাপের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সহিংসতা ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে।

চলমান আন্দোলনে আঞ্চলিক নীতির বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিক্ষোভকারীরা। ‘গাজা নয়, লেবানন নয়—আমার জীবন ইরানের জন্য’ স্লোগানের মাধ্যমে তারা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিরোধিতা করছেন।

রয়টার্স যাচাইকৃত ভিডিওতে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার, মাশহাদ ও ইলামসহ বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ ও মিছিলের দৃশ্য দেখা গেছে। কিছু এলাকায় ধর্মীয় স্থাপনা ঘিরেও বিক্ষোভের চিত্র উঠে এসেছে, যা ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি জনঅসন্তোষের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সামনে সহজ কোনো পথ নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ভাতাঙ্কা বলেন, দমন ও সীমিত ছাড়ের পুরোনো কৌশল কার্যকারিতা হারাতে বসেছে। পরিবর্তন অনিবার্য বলে মনে হচ্ছে, যদিও সরকারের পতন নিশ্চিত নয়।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিক্ষোভকারীদের প্রশংসা করে একে “ইরানি জনগণের জন্য সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্ত” বলে অভিহিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তবে ইরানের অভ্যন্তরে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেক বিক্ষোভকারী শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চাইলেও নতুন কোনো যুদ্ধ বা হামলা চান না বলে জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বারবারের গণবিক্ষোভ ইঙ্গিত দিচ্ছে-ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এক গভীর কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার পরিণতি নির্ধারিত হবে রাজপথ, ক্ষমতার কেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমন্বয়ে।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

প্রাসঙ্গিক

শেয়ার করুন

ইরানে বিক্ষোভের নতুন ঢেউ: আস্থার সংকটে ইসলামি প্রজাতন্ত্র, সামাল দিতে পারবে কি সরকার?

প্রকাশঃ ০৮:৪৫:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬

ইরানজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে নতুন দফার বিক্ষোভ। অর্থনৈতিক সংকট, রিয়ালের দরপতন ও দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এই আন্দোলনের মূল প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে এসেছে। বিদেশি চাপ বাড়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের মুখে পড়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধর্মীয় নেতৃত্ব ক্রমেই চাপে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গত মাসে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এ আন্দোলন ইতিমধ্যে দেশের ৩১টি প্রদেশের সবকটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও আন্দোলনের মাত্রা এখনো ২০২২ সালে মাসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হওয়া ব্যাপক বিক্ষোভের পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে গভীর আস্থার সংকটের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, নতুন করে শুরু হওয়া অস্থিরতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী ও চারজন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ২০০ জনকে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভ কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও ক্রমবর্ধমান হতাশার প্রতিফলন। ইরানের সংস্কারপন্থী শিবিরের এক সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের যেসব নীতিকে আদর্শিক স্তম্ভ হিসেবে দেখা হয়—পোশাকবিধি থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতি—তা ৩০ বছরের কম বয়সী তরুণ প্রজন্মের কাছে আর গ্রহণযোগ্য নয়। এই বয়সী জনগোষ্ঠীই বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, “এটি শুধু রিয়ালের পতন নয়; এটি বিশ্বাসের পতন।”

সরকারি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভ মোকাবিলায় দ্বিমুখী কৌশল নিচ্ছে। একদিকে অর্থনৈতিক দাবিকে বৈধ আখ্যা দিয়ে সংলাপের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সহিংসতা ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে।

চলমান আন্দোলনে আঞ্চলিক নীতির বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিক্ষোভকারীরা। ‘গাজা নয়, লেবানন নয়—আমার জীবন ইরানের জন্য’ স্লোগানের মাধ্যমে তারা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিরোধিতা করছেন।

রয়টার্স যাচাইকৃত ভিডিওতে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার, মাশহাদ ও ইলামসহ বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ ও মিছিলের দৃশ্য দেখা গেছে। কিছু এলাকায় ধর্মীয় স্থাপনা ঘিরেও বিক্ষোভের চিত্র উঠে এসেছে, যা ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি জনঅসন্তোষের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সামনে সহজ কোনো পথ নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ভাতাঙ্কা বলেন, দমন ও সীমিত ছাড়ের পুরোনো কৌশল কার্যকারিতা হারাতে বসেছে। পরিবর্তন অনিবার্য বলে মনে হচ্ছে, যদিও সরকারের পতন নিশ্চিত নয়।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিক্ষোভকারীদের প্রশংসা করে একে “ইরানি জনগণের জন্য সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্ত” বলে অভিহিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তবে ইরানের অভ্যন্তরে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেক বিক্ষোভকারী শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চাইলেও নতুন কোনো যুদ্ধ বা হামলা চান না বলে জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বারবারের গণবিক্ষোভ ইঙ্গিত দিচ্ছে-ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এক গভীর কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার পরিণতি নির্ধারিত হবে রাজপথ, ক্ষমতার কেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমন্বয়ে।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”