যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরানের মানুষ, উদ্বেগে দিন কাটছে তাদের
- প্রকাশঃ ০৩:২৯:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 8
মার্কিন হামলার আশঙ্কায় উত্তর-পূর্ব তুরস্কের রাজি-কাপিকোয় সীমান্ত পার হওয়ার পর মিনিবাসের জন্য অপেক্ষায় থাকা ইরানিরা। ছবি: এএফপি
যুদ্ধের সম্ভাবনা ঘিরে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন ইরানের সাধারণ মানুষ। গত ৩০ জানুয়ারি রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির ভেতরে ও প্রবাসে থাকা ইরানিদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গুঞ্জন ওঠে, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সময় হামলা চালাতে পারে।
তেহরানে বসবাসরত ৪৩ বছর বয়সী এক প্রকৌশলী মিলাদ (ছদ্মনাম) বলেন, আমি হামলার অপেক্ষায় ছিলাম। ভোর না হওয়া পর্যন্ত ঘুমাতে পারিনি। বারবার জেগে উঠছিলাম, কখন বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়—সে অপেক্ষায় ছিলাম।
৬৮ বছর বয়সী সোহরেহ প্রতিদিন সকালে বাড়ির পাশের পার্কে ব্যায়াম করতে যান। ৩১ জানুয়ারি সকালে ফিরে তিনি জানান, আজ আমার সব বন্ধু বলছিলেন, রাতেই হামলা হবে।
সোহরেহ বিদেশি হামলার বিরোধিতা করে বলেন, মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। তারা ভাবছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দমন-পীড়নে মানুষ এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছে যে কোনটা তাদের পক্ষে আর কোনটা বিপক্ষে—তা আর বুঝতে পারছে না।
সংঘাতের আশঙ্কা আরও বাস্তব
এক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানে হামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবহরের উপস্থিতি এবং ইসরায়েল ও সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি চুক্তি ইরানিদের মধ্যে বিভ্রান্তি, মানসিক চাপ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।
এর মধ্যেই অর্থনৈতিক সংকটের জেরে গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের একটি বাজার থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সরকার নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে কঠোর দমন-পীড়ন চালায়।
সরকারি হিসাবে, এসব ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। তবে পশ্চিমা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, নিহতের সংখ্যা সাড়ে ৬ হাজারের বেশি, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা এখনো এই সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি।
‘প্রথম বিস্ফোরণের অপেক্ষায় সবাই’
৩২ বছর বয়সী সরকারি চাকরিজীবী আরজু, যিনি বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরোধী, বলেন,
“মানুষের মধ্যে চাপা উদ্বেগ কাজ করছে। গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে অনেকেই যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে কথা এড়িয়ে চলছেন। কিন্তু সবাই যেন প্রথম বিস্ফোরণের অপেক্ষায়।”
তিনি আরও জানান, তাঁর পাশের ভবনের এক প্রতিবেশী জানালার কাচ সিল করে দিয়েছেন।
“তিনি আমাকে বলেছেন, জানালাগুলো সিল করে দাও। তারা যখন বোমা মারবে, তখন সরকারি কিংবা বিরোধী দল দেখবে না।”
সামাজিক মাধ্যমে ছড়াচ্ছে বাঁচার নির্দেশনা
বিক্ষোভ দমনের সময় ইরানে তিন সপ্তাহের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছিল। পুনরায় সংযোগ চালু হতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা হামলা থেকে বাঁচার পরামর্শে।
এ তালিকায় রয়েছে—
১০ দিনের জন্য খাবার ও পানি মজুত রাখা
প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম হাতের কাছে রাখা
পরিচয়পত্র ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র একটি ব্যাগে প্রস্তুত রাখা
জরুরি বের হওয়ার পথ পরিষ্কার রাখা
বিস্ফোরণের শব্দ শুনলে খোলা জায়গায় চলে যাওয়া
দেয়ালের পাশে মাটিতে শুয়ে পড়া
ফার্সি ভাষার প্ল্যাটফর্মগুলোতে এসব পরামর্শ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এসব তথ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস স্পষ্ট নয়।
ওষুধ ও খাদ্য মজুতে ব্যস্ত মানুষ
আরজু জানান, তিনি ১০ বোতল পানি ও কিছু কৌটার খাবার কিনে রেখেছেন।
কিডনি রোগে আক্রান্ত ৭৫ বছর বয়সী আমিন তিন মাসের ওষুধ মজুত করেছেন। তিনি বলেন, এগুলো গণমাধ্যমের কারসাজি হতে পারে। তবু সাবধানতা জরুরি। কাল কী হবে, কেউ জানে না।
আমিন আট বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, আমি এই শাসকদের ঘৃণা করি, কিন্তু যুদ্ধকেও ঘৃণা করি। যুদ্ধ আমাদের যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তার সবই ধ্বংস করে দেবে।
প্রবাসীরাও আতঙ্কিত
এই আতঙ্ক শুধু ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বাইরে থাকা প্রায় ৪০ লাখ প্রবাসীও উদ্বিগ্ন। তারা আশঙ্কা করছেন, আবারও ইন্টারনেট বন্ধ হলে প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
ফিনল্যান্ডে বসবাসরত ফাতেমা বলেন, আমি মা–বাবাকে তেহরান ছেড়ে যেতে বলেছি। কিন্তু তারা বলেছেন, যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা নেই।
তিনি এক বন্ধুকে তাঁদের কাছে গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ও ওষুধ কিনে দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
আপাত শান্ত, ভেতরে গভীর শঙ্কা
ইরানের শহরগুলো আপাতত শান্ত। গ্যাস স্টেশনে ভিড় নেই, দোকানপাট খোলা, স্কুলবাসে শিশুদের যাতায়াত চলছে। তবে এই স্বাভাবিকতার আড়ালে রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
২৭ বছর বয়সী ছাত্র সরোশ বলেন, আগের মতো এখন গণ-আতঙ্ক নেই। মনে হচ্ছে, মানুষ মানসিকভাবে প্রস্তুত। আগে জানতাম না যুদ্ধ কেমন হয়, এখন সে অভিজ্ঞতা আমাদের আছে।
৪১ বছর বয়সী সাবা সরকারের দমন-পীড়ন, প্রবাসে থাকা বিরোধী নেতাদের ভূমিকা এবং সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ।
ইরানের আকাশ আপাতত শান্ত থাকলেও মানুষের মনে প্রতিনিয়ত ঘুরছে একটাই প্রশ্ন—যুদ্ধ শুরু হলে কী হবে?

























