ঢাকা ০৪:৫৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশিদের ভিসা জটিলতা কেন বাড়ছে? একাধিক দেশ ভিসা না দেওয়ায় শঙ্কা–ক্ষোভ বাড়ছে বিদেশগামীদের

  • প্রকাশঃ ১১:১৬:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ নভেম্বর ২০২৫
  • / 119

বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে জটিলতা দিন দিন বাড়ছে। শিক্ষার্থী, পর্যটক, দক্ষ কর্মী এমনকি অভিজ্ঞ ভ্রমণকারীরাও এখন ভিসা না পাওয়ার অভিযোগ তুলছেন। ভারত ছাড়া কার্যত কোনো দেশ বাংলাদেশের ওপর আনুষ্ঠানিক ভিসা নিষেধাজ্ঞা না দিলেও বাস্তবে বহু দেশ ভিসা প্রদান প্রায় বন্ধ বা সীমিত করে দিয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, আগে যেসব দেশে স্বল্প সময়ে সহজেই ভিসা পাওয়া যেত—ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ—সেগুলোও এখন কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সীমিত সংখ্যক ভিসা দিচ্ছে বা দীর্ঘ সময় নিচ্ছে।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান জানান, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমান, সৌদি আরব, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনামসহ বেশ কয়েকটি দেশ এখন বাংলাদেশিদের ভিসা দিচ্ছে না বা খুব সীমিত দিচ্ছে। এছাড়া থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের ভিসা প্রসেসিংয়ে অস্বাভাবিক সময় লাগছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে ভারত বাংলাদেশিদের পর্যটন ভিসা বন্ধ করে দেয়। এর পর থেকেই ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে ভিসা প্রত্যাখ্যান বাড়তে থাকে। পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে প্রতিবছর পাঁচ–ছয় লাখ বি১/বি২ ভিসা দিত—এ বছর সেই সংখ্যাও ব্যাপকভাবে কমেছে।

কেন ভিসা পাওয়া কঠিন হচ্ছে?

বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূল কারণ ভিসার অপব্যবহার এবং অনিয়মিত অভিবাসনের প্রবণতা। কম খরচে ভিসা পাওয়া যায় এমন দেশ থেকে ভ্রমণ ভিসা নিয়ে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলো বিদেশি কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। পাশাপাশি কিছু অসাধু এজেন্ট ভ্রমণ ভিসা দিয়ে বিদেশে লোক পাঠিয়ে তা শ্রমিক ভিসায় রূপান্তরের চেষ্টা করায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বাংলাদেশিদের বিষয়ে আরও সতর্ক হয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, ভিসার সুযোগকে অনেকে অনিয়মিতভাবে ব্যবহার করছে। এর ফলে যেসব দেশে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব কম ছিল, সেগুলোও এখন সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

তাছাড়া বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলগুলোর অনুসারীদের প্রকাশ্য বিবাদ, সামাজিক মাধ্যমে বিব্রতকর আচরণ, এবং ভিসা–নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

পাসপোর্ট র‍্যাংকিংও একটি বড় কারণ

হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের পাসপোর্ট বিশ্বের অন্যতম দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত—নিচ থেকে সপ্তম অবস্থানে। মাত্র ৩৮টি দেশে ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করা যায়, যার অধিকাংশই আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশ; যেখানে বাংলাদেশি নাগরিকদের যাতায়াত খুবই কম।

সমাধানের পথ কী?

বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার সমাধানে প্রথম প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ভিসা–অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়ানোও জরুরি।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, দেশের ভেতরে অনিয়ম রোধে দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে পারলে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ইতিবাচক বার্তা যাবে, যা ভিসা জটিলতা কমাতে সহায়তা করতে পারে।

ভারতের ভিসা কঠোরতার ক্ষেত্রে তিনি মনে করেন, এ সমস্যা রাজনৈতিক; নির্বাচিত সরকার আসার পর দূতাবাস–স্তরে আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বিদেশে শ্রমবাজার ও শিক্ষার সুযোগ ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সুনাম পুনরুদ্ধারই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা
প্রাসঙ্গিক

শেয়ার করুন

বাংলাদেশিদের ভিসা জটিলতা কেন বাড়ছে? একাধিক দেশ ভিসা না দেওয়ায় শঙ্কা–ক্ষোভ বাড়ছে বিদেশগামীদের

প্রকাশঃ ১১:১৬:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে জটিলতা দিন দিন বাড়ছে। শিক্ষার্থী, পর্যটক, দক্ষ কর্মী এমনকি অভিজ্ঞ ভ্রমণকারীরাও এখন ভিসা না পাওয়ার অভিযোগ তুলছেন। ভারত ছাড়া কার্যত কোনো দেশ বাংলাদেশের ওপর আনুষ্ঠানিক ভিসা নিষেধাজ্ঞা না দিলেও বাস্তবে বহু দেশ ভিসা প্রদান প্রায় বন্ধ বা সীমিত করে দিয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, আগে যেসব দেশে স্বল্প সময়ে সহজেই ভিসা পাওয়া যেত—ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ—সেগুলোও এখন কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সীমিত সংখ্যক ভিসা দিচ্ছে বা দীর্ঘ সময় নিচ্ছে।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান জানান, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমান, সৌদি আরব, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনামসহ বেশ কয়েকটি দেশ এখন বাংলাদেশিদের ভিসা দিচ্ছে না বা খুব সীমিত দিচ্ছে। এছাড়া থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের ভিসা প্রসেসিংয়ে অস্বাভাবিক সময় লাগছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে ভারত বাংলাদেশিদের পর্যটন ভিসা বন্ধ করে দেয়। এর পর থেকেই ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে ভিসা প্রত্যাখ্যান বাড়তে থাকে। পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে প্রতিবছর পাঁচ–ছয় লাখ বি১/বি২ ভিসা দিত—এ বছর সেই সংখ্যাও ব্যাপকভাবে কমেছে।

কেন ভিসা পাওয়া কঠিন হচ্ছে?

বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূল কারণ ভিসার অপব্যবহার এবং অনিয়মিত অভিবাসনের প্রবণতা। কম খরচে ভিসা পাওয়া যায় এমন দেশ থেকে ভ্রমণ ভিসা নিয়ে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলো বিদেশি কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। পাশাপাশি কিছু অসাধু এজেন্ট ভ্রমণ ভিসা দিয়ে বিদেশে লোক পাঠিয়ে তা শ্রমিক ভিসায় রূপান্তরের চেষ্টা করায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বাংলাদেশিদের বিষয়ে আরও সতর্ক হয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, ভিসার সুযোগকে অনেকে অনিয়মিতভাবে ব্যবহার করছে। এর ফলে যেসব দেশে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব কম ছিল, সেগুলোও এখন সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

তাছাড়া বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলগুলোর অনুসারীদের প্রকাশ্য বিবাদ, সামাজিক মাধ্যমে বিব্রতকর আচরণ, এবং ভিসা–নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

পাসপোর্ট র‍্যাংকিংও একটি বড় কারণ

হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের পাসপোর্ট বিশ্বের অন্যতম দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত—নিচ থেকে সপ্তম অবস্থানে। মাত্র ৩৮টি দেশে ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করা যায়, যার অধিকাংশই আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশ; যেখানে বাংলাদেশি নাগরিকদের যাতায়াত খুবই কম।

সমাধানের পথ কী?

বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার সমাধানে প্রথম প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ভিসা–অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়ানোও জরুরি।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, দেশের ভেতরে অনিয়ম রোধে দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে পারলে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ইতিবাচক বার্তা যাবে, যা ভিসা জটিলতা কমাতে সহায়তা করতে পারে।

ভারতের ভিসা কঠোরতার ক্ষেত্রে তিনি মনে করেন, এ সমস্যা রাজনৈতিক; নির্বাচিত সরকার আসার পর দূতাবাস–স্তরে আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বিদেশে শ্রমবাজার ও শিক্ষার সুযোগ ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সুনাম পুনরুদ্ধারই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা