ঢাকা ১১:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বাউলশিল্পীদের ওপর হামলা: যারা ধর্মকে গানেই মহিমান্বিত করেন, তারা কার শত্রু হয়ে গেলো

শাহারিয়া নয়ন
  • প্রকাশঃ ০৮:১১:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫
  • / 124

ছবি: প্রজন্ম কথা


মাজারভাঙা, সাধুসভার ওপর হামলা, বাউল আসর ভণ্ডুল, শিল্পীদের গ্রেপ্তার—এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে উগ্রতার যে রূপ দেখা যাচ্ছে, তা শুধু সাংস্কৃতিক ক্ষতিই নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধেরও অবক্ষয়।

বাউল–বয়াতিদের ওপর হামলা মানে শুধু একজন শিল্পীর ওপর হামলা নয়—এটা আমাদের হাজার বছরের মানবতাবাদী সংস্কৃতির ওপর আঘাত। এই সমাজের যে মমতা, সহনশীলতা, প্রেম ও ঐক্য—এসব মূল্যবোধের ওপর আঘাত।

সম্পত্তি মানিকগঞ্জে কথিত ‘তৌহিদি জনতা’র হামলায় আবুল সরকারের সমর্থকেরা আহত হয়েছেন; অনেকে হামলা থেকে বাঁচতে পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছেন।     তবে এটি একক ঘটনা নয়; দীর্ঘদিন ধরেই বাউল–ফকির–পালাকারদের ওপর এ ধরনের আক্রমণ চলছে। ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পালাগানের আসরে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন রিতা দেওয়ান। একই অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন শরীয়ত সরকার নামের আরেক বয়াতি। অধ্যাপক ইউনূস সরকারের অধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। গত বছরের ২৫ নভেম্বর যশোরে দুই দিনব্যাপী সাধুসংঘের বাউলগানের আয়োজন ভণ্ডুল হয়। এরকম আরো অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। একটি ঘটনা থামার আগেই আরেকটি শুরু হচ্ছে। শুধু রিতা দেওয়ান, শরীয়ত সরকার বা আবুল সরকারের ঘটনা নয়— বিভিন্ন জেলায় ধর্মীয় অনুভূতির অজুহাতে বাউল, পালাক থক, বয়াতি ও সুফি সাধকদের ওপর হামলা, অনুষ্ঠান বন্ধ, সামাজিক চাপ এবং গ্রেপ্তারের ঘটনা বাড়ছে।

সমাজে একটি বক্তব্য শক্তি সক্রিয়—যারা চায় না বহুমত, বহুধারা বা আধ্যাত্মিক ভাবনার চর্চা বজায় থাকুক। তারা চায় ভয়, বিভাজন ও উগ্রতার পরিবেশ টিকে থাকুক, যাতে সমাজকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বাউলরা সেই পরিবেশের বিরোধী—কারণ তারা ভালোবাসা, মানবতা, ধর্মের উদার ব্যাখ্যা আর সার্বজনীনতার কথা বলেন। এই উদারতা থেকেই উগ্রতার ভয়।

বাউলরা কার শত্রু? বাউল–পালাকার–বয়াতিরা কারও শত্রু নন— বরং উগ্রতার শত্রু, অসহিষ্ণুতার শত্রু, অজ্ঞতার শত্রু, ধর্মের কঠোর ব্যাখ্যার শত্রু, ভেদাভেদের রাজনীতির শত্রু।

তাদের গান ভেদাভেদ কমায়, মানুষকে এক করে—এতে চরমপন্থী গোষ্ঠীর অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বাংলাদেশের পরিচয় বহুত্বে, উদারতায়, লোকসংস্কৃতিতে। যারা সেই সংস্কৃতিকে বহন করেন, তাদের নিরাপত্তা দেওয়াই রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। যদি এই ধারার মানুষরা ভয় পেয়ে গান ছেড়ে দেয়, তা শুধু সাংস্কৃতিক ক্ষতি নয়—এটা হবে আমাদের আত্মপরিচয়ের ক্ষয়।

এই দেশ কি সব মানুষের? বাউল–ফকিরদের মতো উদার মানুষরা কি এখানে নিরাপদ? নাকি উগ্রতার ভীতিতে আমরা ধীরে ধীরে আমাদেরই অস্তিত্ব হারাচ্ছি?

বাংলার আধ্যাত্মিক ও মানবতাবাদী সংস্কৃতির একটি বিশাল ধারক হলো বাউলগান—যেখানে গান মানে শুধু বিনোদন নয়, ধর্মীয় ও দার্শনিক ভাবনার সহজ ভাষায় উপস্থাপন। এই ধারার শিল্পীরা গ্রামবাংলার মাটিতে শত শত বছর ধরে মানুষের কাছে মানবিকতা, সমতা, প্রেম, সহনশীলতা ও ঈশ্বরানুভূতির কথা গেয়ে এসেছেন। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে—এই বাউলশিল্পীদেরই নানা অজুহাতে টার্গেট করা হচ্ছে, বাধা দেওয়া হচ্ছে, এমনকি হামলা ও গ্রেপ্তার পর্যন্ত করা হচ্ছে।

প্রশ্ন জাগে—যারা ধর্মকে গানের সুরে মহিমান্বিত করেন, মানুষকে আধ্যাত্মিকতার পথে ডাকেন, তারা হঠাৎ করে কার শত্রু হয়ে গেলেন?

বাংলাদেশের বহু অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে বাউল–পালাকার–বয়াতিদের বিরুদ্ধে হামলা, অনুষ্ঠান ভণ্ডুল, সামাজিক চাপ ও মামলা-মোকদ্দমার ঘটনা বেড়েছে। ধর্মীয় অনুভূতি আঘাতের অভিযোগ এখন যেন একটি সহজ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে—যার লক্ষ্যবস্তু প্রায়ই হয় লোকসংস্কৃতির এই সাধুরা।

এদের গানের ভাষা হচ্ছে উপমা, রূপক আর ইঙ্গিতে ভরপুর। অনেকেই এই ভাষা বুঝতে না পেরে, কিংবা বুঝেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে, ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি করে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। ফলে শিল্পীদের ওপর অবিশ্বাসের দেয়াল গড়ে তোলা হচ্ছে—যা তাদের জন্য শারীরিক ও সামাজিক দুটো ধরনেরই হুমকি সৃষ্টি করেছে।

বাউল বা সুফিগানের মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষের হৃদয়ে আধ্যাত্মিকতা জাগানো। ঈশ্বর, মানবপ্রেম, অনাসক্তি—এসব ভাবকে তারা সহজ ভাষায় মানুষের কানে পৌঁছে দেন।

এদের গান কোনোদিন ধর্মবিরোধী ছিল না; বরং বহু ধর্মের মিল, ঐক্য, সহনশীলতা ও মানবিকতা এই গানের মাধ্যমে গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে পড়েছে।

তাহলে কারা তাদের ‘ধর্মবিরোধী’ বলে চিহ্নিত করছে?  এটা বোঝা জরুরি—এই টার্গেটিং ধর্মের নামে হলেও উদ্দেশ্য কিন্তু সবসময় ধর্ম নয়। অনেক সময় এর পেছনে থাকে রাজনৈতিক স্বার্থ, প্রভাব বিস্তার, কিংবা সমাজে ভয়-দমনের পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

শেয়ার করুন

বাউলশিল্পীদের ওপর হামলা: যারা ধর্মকে গানেই মহিমান্বিত করেন, তারা কার শত্রু হয়ে গেলো

প্রকাশঃ ০৮:১১:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫

ছবি: প্রজন্ম কথা


মাজারভাঙা, সাধুসভার ওপর হামলা, বাউল আসর ভণ্ডুল, শিল্পীদের গ্রেপ্তার—এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে উগ্রতার যে রূপ দেখা যাচ্ছে, তা শুধু সাংস্কৃতিক ক্ষতিই নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধেরও অবক্ষয়।

বাউল–বয়াতিদের ওপর হামলা মানে শুধু একজন শিল্পীর ওপর হামলা নয়—এটা আমাদের হাজার বছরের মানবতাবাদী সংস্কৃতির ওপর আঘাত। এই সমাজের যে মমতা, সহনশীলতা, প্রেম ও ঐক্য—এসব মূল্যবোধের ওপর আঘাত।

সম্পত্তি মানিকগঞ্জে কথিত ‘তৌহিদি জনতা’র হামলায় আবুল সরকারের সমর্থকেরা আহত হয়েছেন; অনেকে হামলা থেকে বাঁচতে পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছেন।     তবে এটি একক ঘটনা নয়; দীর্ঘদিন ধরেই বাউল–ফকির–পালাকারদের ওপর এ ধরনের আক্রমণ চলছে। ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পালাগানের আসরে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন রিতা দেওয়ান। একই অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন শরীয়ত সরকার নামের আরেক বয়াতি। অধ্যাপক ইউনূস সরকারের অধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। গত বছরের ২৫ নভেম্বর যশোরে দুই দিনব্যাপী সাধুসংঘের বাউলগানের আয়োজন ভণ্ডুল হয়। এরকম আরো অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। একটি ঘটনা থামার আগেই আরেকটি শুরু হচ্ছে। শুধু রিতা দেওয়ান, শরীয়ত সরকার বা আবুল সরকারের ঘটনা নয়— বিভিন্ন জেলায় ধর্মীয় অনুভূতির অজুহাতে বাউল, পালাক থক, বয়াতি ও সুফি সাধকদের ওপর হামলা, অনুষ্ঠান বন্ধ, সামাজিক চাপ এবং গ্রেপ্তারের ঘটনা বাড়ছে।

সমাজে একটি বক্তব্য শক্তি সক্রিয়—যারা চায় না বহুমত, বহুধারা বা আধ্যাত্মিক ভাবনার চর্চা বজায় থাকুক। তারা চায় ভয়, বিভাজন ও উগ্রতার পরিবেশ টিকে থাকুক, যাতে সমাজকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বাউলরা সেই পরিবেশের বিরোধী—কারণ তারা ভালোবাসা, মানবতা, ধর্মের উদার ব্যাখ্যা আর সার্বজনীনতার কথা বলেন। এই উদারতা থেকেই উগ্রতার ভয়।

বাউলরা কার শত্রু? বাউল–পালাকার–বয়াতিরা কারও শত্রু নন— বরং উগ্রতার শত্রু, অসহিষ্ণুতার শত্রু, অজ্ঞতার শত্রু, ধর্মের কঠোর ব্যাখ্যার শত্রু, ভেদাভেদের রাজনীতির শত্রু।

তাদের গান ভেদাভেদ কমায়, মানুষকে এক করে—এতে চরমপন্থী গোষ্ঠীর অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বাংলাদেশের পরিচয় বহুত্বে, উদারতায়, লোকসংস্কৃতিতে। যারা সেই সংস্কৃতিকে বহন করেন, তাদের নিরাপত্তা দেওয়াই রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। যদি এই ধারার মানুষরা ভয় পেয়ে গান ছেড়ে দেয়, তা শুধু সাংস্কৃতিক ক্ষতি নয়—এটা হবে আমাদের আত্মপরিচয়ের ক্ষয়।

এই দেশ কি সব মানুষের? বাউল–ফকিরদের মতো উদার মানুষরা কি এখানে নিরাপদ? নাকি উগ্রতার ভীতিতে আমরা ধীরে ধীরে আমাদেরই অস্তিত্ব হারাচ্ছি?

বাংলার আধ্যাত্মিক ও মানবতাবাদী সংস্কৃতির একটি বিশাল ধারক হলো বাউলগান—যেখানে গান মানে শুধু বিনোদন নয়, ধর্মীয় ও দার্শনিক ভাবনার সহজ ভাষায় উপস্থাপন। এই ধারার শিল্পীরা গ্রামবাংলার মাটিতে শত শত বছর ধরে মানুষের কাছে মানবিকতা, সমতা, প্রেম, সহনশীলতা ও ঈশ্বরানুভূতির কথা গেয়ে এসেছেন। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে—এই বাউলশিল্পীদেরই নানা অজুহাতে টার্গেট করা হচ্ছে, বাধা দেওয়া হচ্ছে, এমনকি হামলা ও গ্রেপ্তার পর্যন্ত করা হচ্ছে।

প্রশ্ন জাগে—যারা ধর্মকে গানের সুরে মহিমান্বিত করেন, মানুষকে আধ্যাত্মিকতার পথে ডাকেন, তারা হঠাৎ করে কার শত্রু হয়ে গেলেন?

বাংলাদেশের বহু অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে বাউল–পালাকার–বয়াতিদের বিরুদ্ধে হামলা, অনুষ্ঠান ভণ্ডুল, সামাজিক চাপ ও মামলা-মোকদ্দমার ঘটনা বেড়েছে। ধর্মীয় অনুভূতি আঘাতের অভিযোগ এখন যেন একটি সহজ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে—যার লক্ষ্যবস্তু প্রায়ই হয় লোকসংস্কৃতির এই সাধুরা।

এদের গানের ভাষা হচ্ছে উপমা, রূপক আর ইঙ্গিতে ভরপুর। অনেকেই এই ভাষা বুঝতে না পেরে, কিংবা বুঝেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে, ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি করে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। ফলে শিল্পীদের ওপর অবিশ্বাসের দেয়াল গড়ে তোলা হচ্ছে—যা তাদের জন্য শারীরিক ও সামাজিক দুটো ধরনেরই হুমকি সৃষ্টি করেছে।

বাউল বা সুফিগানের মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষের হৃদয়ে আধ্যাত্মিকতা জাগানো। ঈশ্বর, মানবপ্রেম, অনাসক্তি—এসব ভাবকে তারা সহজ ভাষায় মানুষের কানে পৌঁছে দেন।

এদের গান কোনোদিন ধর্মবিরোধী ছিল না; বরং বহু ধর্মের মিল, ঐক্য, সহনশীলতা ও মানবিকতা এই গানের মাধ্যমে গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে পড়েছে।

তাহলে কারা তাদের ‘ধর্মবিরোধী’ বলে চিহ্নিত করছে?  এটা বোঝা জরুরি—এই টার্গেটিং ধর্মের নামে হলেও উদ্দেশ্য কিন্তু সবসময় ধর্ম নয়। অনেক সময় এর পেছনে থাকে রাজনৈতিক স্বার্থ, প্রভাব বিস্তার, কিংবা সমাজে ভয়-দমনের পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”