আবুল সরকার: বিচারগানের এ কেমন বিচার
- প্রকাশঃ ০৯:৩৫:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৫
- / 114
বিচারগান আমাদের সংস্কৃতির একটি অসাধারণ অঙ্গ। কোনো একটি বিষয় নিয়ে দীর্ঘ তর্কে মাতে দুই পক্ষ, কথা বলে, গানে গানে প্রশ্নের উত্তর দেয়, নতুন প্রশ্নও তোলে। এভাবে আলাপে আলাপে শরিয়ত-মারফত, জীবাত্মা-পরমাত্মা, নারী-পুরুষ, গুরু-শিষ্য—বিবিধ বিষয়ে শ্রোতারা পক্ষ আর বিপক্ষের যুক্তিগুলোর সঙ্গে পরিচিত হন।
গুরুগম্ভীর তত্ত্বের আলাপ সেখানে যে ভঙ্গিতে উত্থাপিত হয়, সমবেতমণ্ডলী তাতে কখনো হেসে ফেলেন বা কখনো গভীর চিন্তায় মগ্ন হন। গায়কেরা সেখানে চর্বিতচর্বণ উপস্থাপন করেন না, নতুন নতুন ভাবনার খোরাক দিতে না পারলে তিনি আকর্ষণ হারাবেন। ফলে মুখস্থ করা কথা আর রপ্ত করা সুর আদৌ যথেষ্ট নয়; সংগত কারণেই বিচারগানের কিংবদন্তিরা নিজেরাও একেকজন মৌলিক ভাবুক। গুরুর সঙ্গে থেকে থেকেই শিষ্যরা রপ্ত করেন তাঁদের কৌশল।
বিচারগান উপস্থাপন কৌশল যেমন, একই সঙ্গে তা বুদ্ধিবৃত্তিরও চর্চা। আরবি-ফারসি সংস্কৃত–ঐতিহ্য থেকে আসা পরিভাষা ও ভাবনার ছড়াছড়ি সেখানে—নিজের যুক্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁরা হাতড়ে বেড়ান তামাম দুনিয়া।
হাঙ্গামা যে লাগত না, তা নয়। সবচেয়ে বেশি হাঙ্গামা শরিয়ত-মারফত নিয়ে। শরিয়তে সৃষ্টিতত্ত্ব বিষয়ে একটা পর্যায়ের পর ভাবারও অনুমতি নেই ধর্মীয় নির্দেশনায়। কিন্তু এর পরও মানুষের মন কি মানে! ভাবনার এই প্রেরণাও তো অনেকে পান ধর্মীয় অনুষঙ্গ থেকে।
‘দয়ালরে, ও দয়াময়
তুমি জুড়িয়াছ পুতুল খেলা
আমার তাতে কিসের জ্বালা
পরাজয় কি জয়ের মালা
পরাও তোমার মন মতন
তবে কেন দোষী আমি
ওহে প্রভু নিরঞ্জন’
এই গানের মাঝে সেই বিস্ময়ই আছে, যে বিস্ময়ে আরবের ‘জাবারিয়া’ আর ‘কাদারিয়া’রা মানবভাগ্য পূর্বনির্ধারিত কি না, নির্ধারিত হলে মানুষের পাপ–পুণ্যের বিচার কীভাবে সম্ভব—সেই তর্কগুলো করেছেন। ধর্মতত্ত্ব, দর্শন ও জ্ঞানের এই প্রশ্নগুলোর মীমাংসা চান মানুষ। বিচারগানে আসলে চির অমীমাংসিত সেই বিষয়গুলো নিয়েই নিত্য আলোচনা হয়। তর্কযুদ্ধে প্রশ্নের ছলে পরস্পরকে ঠেস দেওয়া, শ্লেষ করা চলে, কখনো কখনো তর্ক চলে যায় উষ্মার পর্যায়ে—কিন্তু বহুবার দেখেছি দুই বিবদমান পক্ষ বিচার শেষে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে, প্রশংসা করে, শ্রদ্ধা জানায়।
দর্শক শ্রোতাদের মনেও কি এই তর্কশেষের মিলনের অনুভূতিটা গভীরভাবে কাজ করে না? অজস্র প্রশ্ন আর ভাবনা নিয়ে তাঁরা বাড়ি ফেরেন, প্রশ্ন আর জবাবগুলো ছড়িয়ে দেন গ্রামান্তরে, নতুন নতুন প্রশ্ন আর জবাবও তৈরি করেন নিজের জন্য।
এই তো আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিতে সহিষ্ণুতার ভিত্তি!
পালাগানের আসরে আবুল সরকার | ছবি: পালাগানের ভিডিও থেকে সংগৃহীতসেই আবুল সরকারের বিরুদ্ধে যখন ‘ইসলাম ধর্মের বিশ্বাসের অবমাননা করে এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে কটূক্তি করে এবং অট্টহাসি দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে উসকানি দেওয়ার অপরাধ’ প্রভৃতি অভিযোগ আনা হয় এবং আবুল সরকার গ্রেপ্তারও হন, তাঁর জামিন না মঞ্জুর হয়, তখন রাষ্ট্র যে ‘অট্টহাস্যের স্তরে’ নিজেকে পৌঁছে দেয় কি না, সেই বিচারের সময় আসে না?
দুটি বিষয় খুব পরিষ্কার করে বলে রাখা দরকার। এক হলো, আবুল সরকারের নেশা ও পেশা সংগীত। গ্রামীণ ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীই তাঁর শ্রোতা। ফলে সহজ যুক্তিতেই বলা যায়, ধর্মের অবমাননা করে আবুল সরকারের পক্ষে কি একটা দিনও মঞ্চে গান গাওয়া সম্ভব না?
দ্বিতীয় বিষয় হলো, আবুল সরকারের ধর্মপ্রাণ শ্রোতাগোষ্ঠী তাঁর গানে ধর্মের অবমাননা দেখতে পাননি, সেই কাজ কেন পুলিশ বা আদালত করতে যাবে, তৃতীয় একজন ব্যক্তির কথায়? অভিযোগ যে কেউ করতে পারেন, কিন্তু অবমাননা ইত্যাদি মামলায় গ্রেপ্তার ও জামিন না দেওয়ার যে হয়রানি, সেটি আমাদের বিচারিক ব্যবস্থার একটা ভয়াবহ দিক। হাসিনার আমলেও রীতা দেওয়ান একইভাবে দিনের পর দিন কারাগারে বন্দী থেকেছেন, নিছক গান গাওয়ার অপরাধে। সেই দৃষ্টান্তই কেন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অনুসরণ করা হলো?

৩. কিন্তু এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে বিচারগান এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটা বিশাল ফাটলের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশে আগেও তা ছিল, কিন্তু গত আগস্টের অভ্যুত্থানের পর সংঘবদ্ধ দঙ্গলবাজি একটি বিশাল রাজনৈতিক কৌশল আকারে দেখা দিয়েছে। মাজারে হামলা, ভাঙচুর, নারীর ওপর হামলা ইত্যাদি অজস্র ঘটনা ঘটছে এবং এগুলো ঘটেছে ‘তৌহিদি জনতা’ ইত্যাদি নামের আড়ালে; হামলাগুলোর লক্ষ্য ধর্মের বা শালীনতার একটি মাত্র ব্যাখ্যাকে বৈধতা দেওয়া, বাকিদের যথাসম্ভব নিষিদ্ধ করা।
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী শরিয়তি বা মারফতি যে ধারারই হোক না কেন, পরস্পরের প্রতি সাধারণত শ্রদ্ধাই ছিল তার ঐক্যের শক্তি। ফলে বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে ধর্মীয় সংঘাত এখানকার ঐতিহ্য ছিল না। গত কয়েক দশকে প্রভাব বিস্তার করা ধর্মীয় মতাদর্শ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সনাতনী হানাফি, পীরপন্থী কিংবা তরিকতপন্থী নানা ধারার কিছু সমস্যা দেখা দিলেও সেগুলো সাধারণত বেশ সীমিত সময় ও সীমিত অঞ্চলের বিষয় ছিল।































