ঢাকা ০৫:১২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাসূল (সাঃ) এঁর প্রতি ভালোবাসা: ঈমানের মূলভিত্তি

গোলাম মোস্তফা
  • প্রকাশঃ ০১:৩৬:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর ২০২৫
  • / 44

ছবি: এআই / প্রজন্ম কথা


পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ পাক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও ভালোবাসার যে নির্দেশ প্রদান করেছেন, সাহাবীগণ তাঁদের জীবনে তা যথার্থভাবে প্রতিপালন করে মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভ করেছেন, নিজেদের ঈমানকে পরিপূর্ণ করেছেন, মুমিন হয়েছেন।

মহান আল্লাহ পাক বলেন, আমার এ হাবীব মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক ঘনিষ্ঠ। — (সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৬)

অর্থাৎ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসা মুমিনের নিজের প্রাণ থেকেও অগ্রগণ্য।

আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসার সংজ্ঞা কুরআনের আলোকে বলুন, যদি তোমাদের পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোন, স্ত্রী-পরিজন, স্বজন, উপার্জিত ধন-সম্পদ, মন্দার আশঙ্কায় সঞ্চিত ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পছন্দের আবাসভূমি তোমাদের কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং আল্লাহর পথে জিহাদের চেয়ে বেশি প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো—আল্লাহ তাঁর ফয়সালা নিয়ে আসা পর্যন্ত। – (সূরা আত-তাওবা: ২৪)

এ আয়াতে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা সকল ভালোবাসার চেয়ে ঊর্ধ্বে এবং ঈমানের মূল ভিত্তি।

যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করল।- (সূরা আন-নিসা ৪:৮০)

অতএব, যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা যেন সতর্ক থাকে—তাদের ওপর কোনো বিপদ এসে না পড়ে কিংবা তাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি এসে না যায়।- (সূরা আন-নূর ২৪:৬৩)

নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের উপর দুনিয়া ও আখিরাতে লা‘নত দিয়েছেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।- (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৭)

তাফসীরে ইবনে কাসীর-এর ব্যাখ্যায় এসেছে, রাসূল (সাঃ)-কে কষ্ট দেওয়া বলতে বোঝায়—তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটানো, তাঁর সম্মানহানি করা, তাঁর স্ত্রীগণ বা পরিবার সম্পর্কে কটু কথা বলা, তাঁর আদেশকে উপহাস করা। এগুলোই রাসূল (সাঃ)-কে কষ্ট দেওয়া।- (তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরা আহযাব ৩৩:৫৭)

হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের কণ্ঠস্বর নবীর কণ্ঠস্বরের উপরে উঁচু করো না এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় যেমন তোমরা একে অপরের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলো, তেমন করো না—নতুবা তোমাদের আমল ব্যর্থ হয়ে যাবে অথচ তোমরা টেরও পাবে না।- (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:২)

ওয়ালিদ বিন মুগিরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কটূক্তি করায় মহান আল্লাহ পাক তাঁর ১০টি দোষ প্রকাশ করে দেন। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় দোষটি হলো, সে ছিল জারজ সন্তান।

মহান আল্লাহ তাআলা সেখানে ওয়ালিদ ইবনুল মুগীরাহ সম্পর্কে বলেন — দোষারোপকারী, অপবাদ প্রচারকারী, কল্যাণে বাধাদানকারী, সীমালঙ্ঘনকারী, পাপাচারী, রূঢ় ও উপদ্রবকারী— তদুপরি জারজ সন্তান।- (সূরা আল-ক্বালম, আয়াত ১০-১৩)

উপরোক্ত আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও আনুগত্যের অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে মহান আল্লাহ পাকের দরবারে।

আর আমি আপনাকে (হে নবী (সাঃ)) সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।- (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:১০৭)

বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ মাফ করে দেবেন।- (সূরা আলে-ইমরান ৩:৩১)

আল কুরআনের আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্য ও ভালোবাসা ঈমানের পূর্ণতার জন্য কত জরুরি।

রাসূলপ্রেমে সাহাবীগণের দৃষ্টান্ত
হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু কিছু লোকের মাঝে তাঁর পিতা আবু কুহাফাকে দেখতে পেলেন। তাঁর পিতা তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমালোচনা করছিলেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে তাঁর পিতাকে আঘাত করেছিলেন। তখন হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পিতা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বিচার প্রার্থী হলে, মহান আল্লাহ পাক একটি আয়াত নাযিল করেন — যারা আল্লাহ এবং রাসূলের মোহাব্বতে এরূপ করে, তাদের জন্য রয়েছে পরকালে পুরস্কার।- (সূরা আল-মুজাদিলাহ, আয়াত ২২)

পরবর্তীতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পিতা আবু কুহাফা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

সাহাবীর হৃদয়ে রাসূলপ্রেম
হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে আমার সন্তান, পিতা-মাতা এবং নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি। আমি যখনই ঘরে থাকি, তখন আপনাকে স্মরণ করি, আর ধৈর্য রাখতে পারি না যতক্ষণ না আপনাকে দেখি। কিন্তু আমি চিন্তা করি—যদি আমি জান্নাতে প্রবেশ করি, আপনি তো নবীদের উচ্চ মর্যাদায় থাকবেন। তখন আমি যদি আপনাকে না পাই, জান্নাত আমার কাছে অর্থহীন মনে হবে।

এ কথা শুনে নবী করিম (সাঃ) কোনো উত্তর দেননি। তখনই মহান আল্লাহ তাআলা একটি আয়াত নাজিল করেন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, তারা নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের সঙ্গ লাভ করবে।- (সূরা আন-নিসা ৪:৬৯)

এখানে শিক্ষণীয় বিষয়— সর্বোপরি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসায় ওই সাহাবী জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম যেখানে নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের সঙ্গ লাভ করবেন; যা স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক ওহী নাযিল করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে ওই সাহাবীকে জানিয়ে দিয়েছেন।

রাসূলপ্রেম হাদীসের আলোকে- তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, সন্তান এবং সমগ্র মানবজাতির চেয়েও প্রিয় হয়ে উঠি।- (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

আরেকটি হাদীসে এসেছে: যে আমার সুন্নাহকে ভালোবাসে, সে আমাকেই ভালোবাসে, আর যে আমায় ভালোবাসে, সে জান্নাতে আমার সঙ্গে থাকবে।- (তিরমিজি)

সাহাবাদের জীবনে ভালোবাসার দৃষ্টান্ত
সাহাবায়ে কেরাম এ ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বদরের ময়দানে, উহুদের রণক্ষেত্রে কিংবা হিজরতের সময়, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর জন্য জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন। হযরত আলী (রা.) হিজরতের রাতে রাসূল (সাঃ) এঁর বিছানায় শুয়ে প্রমাণ করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর নিরাপত্তা নিজের জীবনের চেয়েও অগ্রগণ্য। কাফেরদের আক্রমণে তিনি নিজে শহীদ হয়েও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর উদ্দেশ্য, বিছানায় শোয়ার কারণ।

হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সকল মানুষের চেয়েও অধিক প্রিয় হয়ে উঠি।- (সহিহ বুখারী, হাদীস নং ৬৬৩২)

অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, হযরত উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি আমার নিকট আমার প্রাণ ছাড়া সবকিছুর চেয়েও প্রিয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, না, হে উমর! যতক্ষণ না আমি তোমার নিকট তোমার নিজের প্রাণ থেকেও অধিক প্রিয় হব—ততক্ষণ নয়। তখন হযরত উমর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! এখন আপনি আমার নিজের প্রাণ থেকেও অধিক প্রিয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, হে উমর, এখন তুমি পূর্ণ ঈমানদার হয়েছ। এ হাদীস সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিম এবং অন্যান্য কিতাবে এসেছে।

ভালোবাসার বাস্তব প্রকাশ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, বরং ঈমানের শর্ত। এই ভালোবাসার প্রকাশ হতে হবে তাঁর আনুগত্য, তাঁর সুন্নাহর অনুসরণ এবং তাঁর দেখানো পথে চলা। আল্লাহ পাকের ভালোবাসা অর্জনের একমাত্র পথ হলো প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা ও আনুগত্য।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ পাক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও ভালোবাসার প্রতি যে নির্দেশনা প্রদান করেছেন, সাহাবীগণ তা তাঁদের নিজেদের জীবনে যথার্থভাবে প্রতিপালন করেছেন। শুধু তাই নয়— রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হবে, আচরণ করতে হবে, সম্মান করতে হবে, তাও মহান আল্লাহ পাক আল-কোরআনে ঘোষণা করেছেন। সাহাবীগণ তা সম্পূর্ণভাবে অনুসরণ ও প্রতিপালন করে কুরআনের নির্দেশনাকে বাস্তবায়িত করেছেন তাঁদের জীবনে এবং মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভে সক্ষম হয়েছেন।

আওলিয়ায়ে কেরামগণও অনুসরণ করেছেন একই পথ
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত নকশে বন্দ রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মঈনুদ্দিন চিশতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মুজাদ্দিদে আল-ফেসানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ফতেহ আলী ওআইসি রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ওয়াজেদ আলী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত খাজা ইউনুস আলী এনায়েতপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং আল্লামা শাহসুফি হযরত খাজা মুহাম্মদ ছাইফুদ্দিন এনায়েতপুরী-সম্ভুগঞ্জী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত শাহ পরান রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি— সকল তরিকতের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অলি-গণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসা কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী সাহাবীগণের মতোই অনুসরণ করেছেন এবং সফলকাম হয়েছেন, মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভ করে আল্লাহর বন্ধু (অলি) হয়েছেন।

আজও তাঁদের প্রতিষ্ঠিত দরবার শরীফগুলোতে অনুসারীরা রুহানী ফয়েজ লাভ করে মহান আল্লাহ পাক ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেমে নিজেদের অন্তরকে আলোকিত করেছে, করছে এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।

আল্লামা শাহসুফি হযরত খাজা মুহাম্মদ ছাইফুদ্দিন এনায়েতপুরী-সম্ভুগঞ্জী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন—
“নবীর মহব্বতই ঈমান; যার দিলেতে নবীর মহব্বত নাই—তার ঈমান নাই।”

আমরা যদি আমাদের জীবনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরি, তাঁর দেখানো পথে চলি এবং আমাদের অন্তরকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসায় ভরে তুলি, তাহলেই অর্জিত হবে আত্মার পবিত্রতা। ইবাদত হবে রিয়া-মুক্ত এবং কবুলযোগ্য। সেটিই হবে আমাদের জন্য জান্নাতের চাবিকাঠি।

 ~ গোলাম মোস্তফা ফিচার্স রাইটার ও কলামিস্ট

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

শেয়ার করুন

রাসূল (সাঃ) এঁর প্রতি ভালোবাসা: ঈমানের মূলভিত্তি

প্রকাশঃ ০১:৩৬:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর ২০২৫

ছবি: এআই / প্রজন্ম কথা


পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ পাক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও ভালোবাসার যে নির্দেশ প্রদান করেছেন, সাহাবীগণ তাঁদের জীবনে তা যথার্থভাবে প্রতিপালন করে মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভ করেছেন, নিজেদের ঈমানকে পরিপূর্ণ করেছেন, মুমিন হয়েছেন।

মহান আল্লাহ পাক বলেন, আমার এ হাবীব মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক ঘনিষ্ঠ। — (সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৬)

অর্থাৎ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসা মুমিনের নিজের প্রাণ থেকেও অগ্রগণ্য।

আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসার সংজ্ঞা কুরআনের আলোকে বলুন, যদি তোমাদের পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোন, স্ত্রী-পরিজন, স্বজন, উপার্জিত ধন-সম্পদ, মন্দার আশঙ্কায় সঞ্চিত ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পছন্দের আবাসভূমি তোমাদের কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং আল্লাহর পথে জিহাদের চেয়ে বেশি প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো—আল্লাহ তাঁর ফয়সালা নিয়ে আসা পর্যন্ত। – (সূরা আত-তাওবা: ২৪)

এ আয়াতে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা সকল ভালোবাসার চেয়ে ঊর্ধ্বে এবং ঈমানের মূল ভিত্তি।

যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করল।- (সূরা আন-নিসা ৪:৮০)

অতএব, যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা যেন সতর্ক থাকে—তাদের ওপর কোনো বিপদ এসে না পড়ে কিংবা তাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি এসে না যায়।- (সূরা আন-নূর ২৪:৬৩)

নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের উপর দুনিয়া ও আখিরাতে লা‘নত দিয়েছেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।- (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৭)

তাফসীরে ইবনে কাসীর-এর ব্যাখ্যায় এসেছে, রাসূল (সাঃ)-কে কষ্ট দেওয়া বলতে বোঝায়—তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটানো, তাঁর সম্মানহানি করা, তাঁর স্ত্রীগণ বা পরিবার সম্পর্কে কটু কথা বলা, তাঁর আদেশকে উপহাস করা। এগুলোই রাসূল (সাঃ)-কে কষ্ট দেওয়া।- (তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরা আহযাব ৩৩:৫৭)

হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের কণ্ঠস্বর নবীর কণ্ঠস্বরের উপরে উঁচু করো না এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় যেমন তোমরা একে অপরের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলো, তেমন করো না—নতুবা তোমাদের আমল ব্যর্থ হয়ে যাবে অথচ তোমরা টেরও পাবে না।- (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:২)

ওয়ালিদ বিন মুগিরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কটূক্তি করায় মহান আল্লাহ পাক তাঁর ১০টি দোষ প্রকাশ করে দেন। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় দোষটি হলো, সে ছিল জারজ সন্তান।

মহান আল্লাহ তাআলা সেখানে ওয়ালিদ ইবনুল মুগীরাহ সম্পর্কে বলেন — দোষারোপকারী, অপবাদ প্রচারকারী, কল্যাণে বাধাদানকারী, সীমালঙ্ঘনকারী, পাপাচারী, রূঢ় ও উপদ্রবকারী— তদুপরি জারজ সন্তান।- (সূরা আল-ক্বালম, আয়াত ১০-১৩)

উপরোক্ত আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও আনুগত্যের অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে মহান আল্লাহ পাকের দরবারে।

আর আমি আপনাকে (হে নবী (সাঃ)) সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।- (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:১০৭)

বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ মাফ করে দেবেন।- (সূরা আলে-ইমরান ৩:৩১)

আল কুরআনের আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্য ও ভালোবাসা ঈমানের পূর্ণতার জন্য কত জরুরি।

রাসূলপ্রেমে সাহাবীগণের দৃষ্টান্ত
হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু কিছু লোকের মাঝে তাঁর পিতা আবু কুহাফাকে দেখতে পেলেন। তাঁর পিতা তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমালোচনা করছিলেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে তাঁর পিতাকে আঘাত করেছিলেন। তখন হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পিতা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বিচার প্রার্থী হলে, মহান আল্লাহ পাক একটি আয়াত নাযিল করেন — যারা আল্লাহ এবং রাসূলের মোহাব্বতে এরূপ করে, তাদের জন্য রয়েছে পরকালে পুরস্কার।- (সূরা আল-মুজাদিলাহ, আয়াত ২২)

পরবর্তীতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পিতা আবু কুহাফা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

সাহাবীর হৃদয়ে রাসূলপ্রেম
হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে আমার সন্তান, পিতা-মাতা এবং নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি। আমি যখনই ঘরে থাকি, তখন আপনাকে স্মরণ করি, আর ধৈর্য রাখতে পারি না যতক্ষণ না আপনাকে দেখি। কিন্তু আমি চিন্তা করি—যদি আমি জান্নাতে প্রবেশ করি, আপনি তো নবীদের উচ্চ মর্যাদায় থাকবেন। তখন আমি যদি আপনাকে না পাই, জান্নাত আমার কাছে অর্থহীন মনে হবে।

এ কথা শুনে নবী করিম (সাঃ) কোনো উত্তর দেননি। তখনই মহান আল্লাহ তাআলা একটি আয়াত নাজিল করেন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, তারা নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের সঙ্গ লাভ করবে।- (সূরা আন-নিসা ৪:৬৯)

এখানে শিক্ষণীয় বিষয়— সর্বোপরি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসায় ওই সাহাবী জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম যেখানে নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের সঙ্গ লাভ করবেন; যা স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক ওহী নাযিল করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে ওই সাহাবীকে জানিয়ে দিয়েছেন।

রাসূলপ্রেম হাদীসের আলোকে- তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, সন্তান এবং সমগ্র মানবজাতির চেয়েও প্রিয় হয়ে উঠি।- (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

আরেকটি হাদীসে এসেছে: যে আমার সুন্নাহকে ভালোবাসে, সে আমাকেই ভালোবাসে, আর যে আমায় ভালোবাসে, সে জান্নাতে আমার সঙ্গে থাকবে।- (তিরমিজি)

সাহাবাদের জীবনে ভালোবাসার দৃষ্টান্ত
সাহাবায়ে কেরাম এ ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বদরের ময়দানে, উহুদের রণক্ষেত্রে কিংবা হিজরতের সময়, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর জন্য জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন। হযরত আলী (রা.) হিজরতের রাতে রাসূল (সাঃ) এঁর বিছানায় শুয়ে প্রমাণ করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর নিরাপত্তা নিজের জীবনের চেয়েও অগ্রগণ্য। কাফেরদের আক্রমণে তিনি নিজে শহীদ হয়েও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর উদ্দেশ্য, বিছানায় শোয়ার কারণ।

হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সকল মানুষের চেয়েও অধিক প্রিয় হয়ে উঠি।- (সহিহ বুখারী, হাদীস নং ৬৬৩২)

অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, হযরত উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি আমার নিকট আমার প্রাণ ছাড়া সবকিছুর চেয়েও প্রিয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, না, হে উমর! যতক্ষণ না আমি তোমার নিকট তোমার নিজের প্রাণ থেকেও অধিক প্রিয় হব—ততক্ষণ নয়। তখন হযরত উমর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! এখন আপনি আমার নিজের প্রাণ থেকেও অধিক প্রিয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, হে উমর, এখন তুমি পূর্ণ ঈমানদার হয়েছ। এ হাদীস সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিম এবং অন্যান্য কিতাবে এসেছে।

ভালোবাসার বাস্তব প্রকাশ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, বরং ঈমানের শর্ত। এই ভালোবাসার প্রকাশ হতে হবে তাঁর আনুগত্য, তাঁর সুন্নাহর অনুসরণ এবং তাঁর দেখানো পথে চলা। আল্লাহ পাকের ভালোবাসা অর্জনের একমাত্র পথ হলো প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা ও আনুগত্য।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ পাক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও ভালোবাসার প্রতি যে নির্দেশনা প্রদান করেছেন, সাহাবীগণ তা তাঁদের নিজেদের জীবনে যথার্থভাবে প্রতিপালন করেছেন। শুধু তাই নয়— রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হবে, আচরণ করতে হবে, সম্মান করতে হবে, তাও মহান আল্লাহ পাক আল-কোরআনে ঘোষণা করেছেন। সাহাবীগণ তা সম্পূর্ণভাবে অনুসরণ ও প্রতিপালন করে কুরআনের নির্দেশনাকে বাস্তবায়িত করেছেন তাঁদের জীবনে এবং মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভে সক্ষম হয়েছেন।

আওলিয়ায়ে কেরামগণও অনুসরণ করেছেন একই পথ
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত নকশে বন্দ রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মঈনুদ্দিন চিশতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মুজাদ্দিদে আল-ফেসানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ফতেহ আলী ওআইসি রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ওয়াজেদ আলী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত খাজা ইউনুস আলী এনায়েতপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং আল্লামা শাহসুফি হযরত খাজা মুহাম্মদ ছাইফুদ্দিন এনায়েতপুরী-সম্ভুগঞ্জী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত শাহ পরান রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি— সকল তরিকতের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অলি-গণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসা কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী সাহাবীগণের মতোই অনুসরণ করেছেন এবং সফলকাম হয়েছেন, মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভ করে আল্লাহর বন্ধু (অলি) হয়েছেন।

আজও তাঁদের প্রতিষ্ঠিত দরবার শরীফগুলোতে অনুসারীরা রুহানী ফয়েজ লাভ করে মহান আল্লাহ পাক ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেমে নিজেদের অন্তরকে আলোকিত করেছে, করছে এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।

আল্লামা শাহসুফি হযরত খাজা মুহাম্মদ ছাইফুদ্দিন এনায়েতপুরী-সম্ভুগঞ্জী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন—
“নবীর মহব্বতই ঈমান; যার দিলেতে নবীর মহব্বত নাই—তার ঈমান নাই।”

আমরা যদি আমাদের জীবনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরি, তাঁর দেখানো পথে চলি এবং আমাদের অন্তরকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসায় ভরে তুলি, তাহলেই অর্জিত হবে আত্মার পবিত্রতা। ইবাদত হবে রিয়া-মুক্ত এবং কবুলযোগ্য। সেটিই হবে আমাদের জন্য জান্নাতের চাবিকাঠি।

 ~ গোলাম মোস্তফা ফিচার্স রাইটার ও কলামিস্ট

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”