অস্ট্রেলিয়ায় বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা গড়ে মেয়েদের শিক্ষায় ১০০ মিলিয়ন ডলার দিলেন বাংলাদেশি রবিন খোদা
- প্রকাশঃ ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১২
- / 1
সিডনি, ২২ অক্টোবর (প্রজন্ম কথা) – মাত্র ১৮ বছর বয়সে বাংলাদেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন রবিন খোদা। পড়াশোনা শেষে প্রযুক্তি খাতে কাজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ডেটা সেন্টার কোম্পানি এয়ারট্রাঙ্ক। একসময় আর্থিক সংকটে পড়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়লেও পরে প্রতিষ্ঠানটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ২০২৪ সালে এয়ারট্রাঙ্ক অধিগ্রহণের চুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন করা হয় ২৪ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলারের বেশি। ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি পশ্চিম সিডনির মেয়েদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ১০০ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলারের অনুদান কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েও আলোচনায় এসেছেন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এই উদ্যোক্তা।
রবিন খোদার সাফল্যের শুরু অস্ট্রেলিয়ায় নতুন জীবন গড়ার মধ্য দিয়ে। সেখানে যাওয়ার পর তিনি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনিতে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি অবকাঠামো খাতে কর্মজীবন শুরু করেন। সিংটেল অপটাস, ফুজিৎসু ও পাইপ নেটওয়ার্কসের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করে প্রযুক্তি ব্যবসা, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা ও বৃহৎ প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠান নেক্সটডিসিতেও নেতৃত্বস্থানীয় দায়িত্ব পালন করেন।
কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে রবিন খোদা বুঝতে পারেন, ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের বিস্তার এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ডেটা সেন্টার ব্যবসার জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে ২০১৫ সালে সিডনিতে এয়ারট্রাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
তবে বড় আকারের ডেটা সেন্টার নির্মাণের জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল বিনিয়োগ। জমি, বিদ্যুৎ, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তোলার ব্যয় সামাল দেওয়া নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম ডেটা সেন্টার নির্মাণের সময়সীমা মেনে কাজ শেষ করতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন রবিন। ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এমনকি দেউলিয়া হওয়ার বিষয়ে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়ার কথাও বিবেচনা করেছিলেন তিনি।
সেই সংকট কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম এগিয়ে নেন রবিন। ধীরে ধীরে এয়ারট্রাঙ্ক বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্লাউড সেবা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসাও সম্প্রসারিত হতে থাকে।
রবিন খোদার ব্যবসায়িক যাত্রায় বড় মাইলফলক আসে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। ওই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন এবং কানাডা পেনশন প্ল্যান ইনভেস্টমেন্টস বোর্ড এয়ারট্রাঙ্ক অধিগ্রহণের চুক্তি ঘোষণা করে। চুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটির এন্টারপ্রাইজ মূল্যায়ন নির্ধারণ করা হয় ২৪ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলারের বেশি, যা সে সময় প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান ছিল।
এটি অস্ট্রেলিয়ার বড় ব্যবসায়িক লেনদেনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এয়ারট্রাঙ্কের এন্টারপ্রাইজ মূল্যায়নকে রবিন খোদার ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এন্টারপ্রাইজ মূল্যায়ন একটি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ব্যবসায়িক মূল্য বোঝায়; এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত মালিকানা ও প্রাপ্ত অর্থের হিসাব এক নয়।
অধিগ্রহণের পরও রবিন খোদা এয়ারট্রাঙ্কের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন এবং প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বের একটি অংশ ধরে রাখেন। ফলে মালিকানা পরিবর্তনের পরও প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম ও সম্প্রসারণের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা বজায় থাকে।
এয়ারট্রাঙ্কের ব্যবসা অস্ট্রেলিয়ার বাইরে জাপান, মালয়েশিয়া, হংকং ও সিঙ্গাপুরসহ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন বাজারে বিস্তৃত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রক্রিয়াকরণের প্রয়োজন বাড়ায় এ খাতে বিনিয়োগের গুরুত্বও বেড়েছে।
২০২৬ সালের জুনে ভারতে ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ গিগাওয়াটের বেশি ডেটা সেন্টার সক্ষমতা গড়ে তুলতে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথা জানায় এয়ারট্রাঙ্ক। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ভারতের ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে। তবে ঘোষিত বিনিয়োগ পরিকল্পনার পুরো অর্থ ইতিমধ্যে ব্যয় করা হয়েছে, এমন নয়।
বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য সংরক্ষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল পরিচালনা এবং অনলাইন সেবা সচল রাখতে ডেটা সেন্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এয়ারট্রাঙ্কের সম্প্রসারণও এই বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও অবদান রাখছেন রবিন খোদা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত খোদা ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়কে ১০০ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে বড় একক অনুদান।
এই অর্থ দিয়ে ২০ বছর মেয়াদি একটি কর্মসূচি পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য পশ্চিম সিডনির মেয়েদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ে পড়াশোনা এবং ভবিষ্যতে এসব খাতে পেশাজীবন গড়ার সুযোগ বাড়ানো।
কর্মসূচির আওতায় স্কুলপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সহায়তা, পরামর্শদান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তির ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশেষ করে এসব বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে রবিন খোদার পারিবারিক ফাউন্ডেশন দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষামূলক কর্মসূচিতে অর্থায়ন করছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।
রবিন খোদার যাত্রায় রয়েছে অভিবাসন, উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি খাতে কর্মজীবন এবং উদ্যোক্তা হিসেবে ঝুঁকি নেওয়ার অভিজ্ঞতা। ১৮ বছর বয়সে বাংলাদেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া এই উদ্যোক্তা কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলেন এয়ারট্রাঙ্ক। প্রাথমিক আর্থিক সংকট কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন তিনি।
তাঁর অর্জনের তাৎপর্য কেবল প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যবসার সম্ভাবনা চিহ্নিত করা, প্রযুক্তি অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের অভিজ্ঞতাও তাঁর পথচলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একই সঙ্গে মেয়েদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় ১০০ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলারের অনুদান উদ্যোগ তাঁর পারিবারিক ফাউন্ডেশনের সামাজিক কার্যক্রমকে সামনে এনেছে। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এই উদ্যোক্তার কর্মজীবন প্রবাসে ব্যবসা গড়ে তোলা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।


























