প্রতিবাদ ও করতালির মধ্য দিয়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার ৭৮তম আসরের উদ্বোধন
- প্রকাশঃ ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৪
- / 7
ফ্রাঙ্কফুর্ট, ৭ অক্টোবর, (প্রজন্ম কথা) – জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে শুরু হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বইমেলার ৭৮তম আসর। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উদ্বোধন হওয়া এই মেলা আগামী ১১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এবারের আয়োজনে বিশ্বের ১৩০টি দেশের প্রায় চার হাজার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। সম্মানিত অতিথি দেশ হিসেবে এবার নির্বাচিত হয়েছে চেক প্রজাতন্ত্র।
তবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি কেবল বই ও প্রকাশনা ঘিরে ছিল না। চেক প্রজাতন্ত্রের সংস্কৃতিমন্ত্রী ওতো ক্লেমপিরের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দর্শকদের একাংশের প্রতিবাদ ও কটূক্তি শোনা যায়। বিপরীতে চেক লেখক রাদকা ডেনেমারকোভা বক্তব্য দেওয়ার সময় ব্যাপক করতালি পান এবং দর্শকেরা দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান।
মঙ্গলবার বইমেলার সংলাপ মঞ্চে উদ্বোধনী সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন মেলার পরিচালক ইউর্গেন বুস এবং জার্মান প্রকাশক ও বই বিক্রেতা সমিতির সেবাস্তিয়ান গুগোলজ। সংবাদ সম্মেলনের পর সম্মানিত অতিথি দেশ চেক প্রজাতন্ত্রের প্যাভিলিয়নে গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে পরিদর্শনের আয়োজন করা হয়। বিদায়ী পরিচালক ইউর্গেন বুস প্রতীকী হাতুড়ির আঘাতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের মেলার উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী ক্লেমপিরের বক্তব্যের পরপরই মঞ্চে আসেন লেখক রাদকা ডেনেমারকোভা। চেক সরকারের সংস্কৃতিনীতি এবং ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি সরাসরি কথা বলেন।
ডেনেমারকোভা বলেন, সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা কোনো সরকারের মন্ত্রীরা আসেন এবং চলে যান, কিন্তু সাহিত্য থেকে যায়। ইউরোপে উগ্র ডানপন্থার উত্থান এবং চেক সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর অতীত নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে তিনি রাজনীতি ও সাহিত্যকে আলাদা করার প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাকে ক্লান্ত ও বিরক্ত করেছে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় রাখতে নাগরিকদের সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সাহিত্যের স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরে ডেনেমারকোভা গ্রন্থাগার ধ্বংসের বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। তার মতে, স্বাধীন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, সৃজনশীল চিন্তা, পরিষ্কার মনন এবং সাহসের প্রয়োজন। বক্তব্য শেষ হলে দর্শকেরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় তাকে করতালি দিয়ে অভিবাদন জানান।
ক্লেমপিরকে ঘিরে বিতর্কের পেছনে তার রাজনৈতিক পরিচয়ও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চেক প্রজাতন্ত্রের উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘মোটরিস্টে’-এর সদস্য। সংস্কৃতি খাতে সরকারি নীতি পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ও চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অর্থায়নের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর উদ্যোগের কারণে দেশটির সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একাংশ তার সমালোচনা করে আসছে।
ফ্রাঙ্কফুর্ট আন্তর্জাতিক বইমেলা বর্তমানে বিশ্বের প্রকাশনা শিল্পের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক আয়োজন। বইয়ের পাশাপাশি শিক্ষা, চলচ্চিত্র, গেমস, বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট সৃজনশীল শিল্পের প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নেন। প্রকাশক, লেখক, সাহিত্যিক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের মধ্যে যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবেও মেলাটি পরিচিত।
প্রতি বছর অক্টোবর মাসে মেলার আয়োজনকে কেন্দ্র করে মাইন নদীর তীরের ফ্রাঙ্কফুর্ট আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ও গণমাধ্যম অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ মিলনস্থলে পরিণত হয়। উপন্যাস ও শিশুতোষ বই থেকে শুরু করে বৈজ্ঞানিক তথ্যভান্ডার পর্যন্ত নানা ধরনের প্রকাশনা এখানে উপস্থাপিত হয়।
ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলার ইতিহাসও কয়েক শতাব্দীর পুরোনো। ষোড়শ শতাব্দীর শুরু থেকেই ইউরোপের অধ্যাপক, পণ্ডিত, আর্কাইভার ও ধর্মযাজকেরা বই প্রকাশ, প্রকাশক খোঁজা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন ধারা সম্পর্কে জানতে ফ্রাঙ্কফুর্টে সমবেত হতেন।
পরবর্তী সময়ে বই প্রকাশনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়। ত্রিশ বছরের যুদ্ধের সময় ফ্রাঙ্কফুর্টের বইকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশ জার্মানির লাইপজিগে স্থানান্তরিত হয়। পরে লাইপজিগ ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য ও সংগীতচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রাঙ্কফুর্টে আবার বইমেলার ঐতিহ্য ফিরে আসে। ১৯৪৯ সালের ১৮ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর শহরের কেন্দ্রস্থলে পাউল গির্জায় ২০৫টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ৮৪৪টি বই প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে আধুনিক ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার নতুন যাত্রা শুরু হয়।
আজকের মেলা সেই ঐতিহ্যকে আরও বিস্তৃত করে বিশ্বের প্রকাশনা, সাহিত্য ও সৃজনশীল শিল্পের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে।





























