নোয়াখালীর মেয়ে শামীমা সুলতানা, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার থেকে ইউএস আর্মিতে
- প্রকাশঃ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:৪২
- / 3
একদিকে কম্পিউটারের পর্দায় প্রযুক্তির জটিল কাজ, অন্যদিকে সামরিক পোশাকে কঠোর শৃঙ্খলা ও দায়িত্ব। জীবনের এই দুই ভিন্ন জগতকে একসঙ্গে বেছে নিয়েছেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর শামীমা সুলতানা। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পেশাগত দক্ষতা অর্জনের পর তিনি পা রাখেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে। সহজ কোনো পথ ছিল না সেই যাত্রা। সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে তাঁকে পেরোতে হয়েছে কঠোর প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। সেই পথ পেরিয়ে এখন তিনি ইউএস আর্মির সার্জেন্ট।
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার কৃতি সন্তান শামীমা সুলতানা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে সার্জেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পেশাগত জীবনে তিনি একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। প্রযুক্তির জ্ঞান এবং সামরিক জীবনের কঠোর শৃঙ্খলা, দুটি ভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর পেশাগত পথচলা।
সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর শামীমার সামনে ছিল নতুন এক বাস্তবতা। প্রযুক্তিনির্ভর পেশাজীবনের অভিজ্ঞতার বাইরে সামরিক জীবনের জন্য প্রয়োজন কঠোর নিয়ম মেনে চলা, শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা এবং নির্ধারিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা। প্রশিক্ষণের সময় এই শৃঙ্খলার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াই ছিল তাঁর পথচলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কঠোর পরিশ্রম ও নিয়মিত অনুশীলনের মধ্য দিয়ে সামরিক জীবনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন তিনি।
শামীমার এই যাত্রার পেছনে পারিবারিক সামরিক ঐতিহ্যেরও একটি গল্প রয়েছে। তাঁর বাবা আলহাজ্ব মো. তৈয়ব আলী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক ল্যান্স নায়েক এবং একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া বাবার কাছ থেকেই শামীমা ছোটবেলা থেকে দেশপ্রেম, সাহস, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের মূল্যবোধ পেয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বাবার সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা হয়তো তাঁকে সামরিক পেশার সঙ্গে পরিচিত করেছিল, কিন্তু নিজের পথ তাঁকেই তৈরি করতে হয়েছে। প্রথমে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করে প্রযুক্তি খাতে নিজের দক্ষতা তৈরি করেন শামীমা। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর কর্মজীবনকে নতুন দিকে নিয়ে যায়।
সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর প্রযুক্তি খাতের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন কর্মপরিবেশের মুখোমুখি হন তিনি। নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলা, দায়িত্বের প্রতি অবিচল থাকা এবং কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে নিজেকে তৈরি করার প্রয়োজন ছিল প্রতিদিন। সেই পরিশ্রমের ধারাবাহিকতায় ইউএস আর্মিতে সার্জেন্ট পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান তিনি।
একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে তাঁর এই অবস্থান পরিবার ও জন্মস্থান নোয়াখালীর মানুষের কাছেও গর্বের বিষয়। বিশেষ করে তাঁর বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সেনাসদস্য হওয়ায় পরিবারের সামরিক ঐতিহ্যের সঙ্গে শামীমার পেশাগত জীবন একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে।
তবে শামীমার গল্পকে শুধু সামরিক পেশায় সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখলে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। তাঁর পথচলায় প্রযুক্তি ও সামরিক জীবন পাশাপাশি রয়েছে। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো জ্ঞানভিত্তিক পেশা থেকে সামরিক বাহিনীর কঠোর শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া তাঁর পেশাগত জীবনের বড় পরিবর্তনগুলোর একটি।
এই পরিবর্তনের পেছনে ছিল নিজের সক্ষমতার ওপর আস্থা এবং নতুন পরিবেশে নিজেকে তৈরি করার মানসিকতা। সামরিক বাহিনীতে দায়িত্ব পালনের জন্য যে কঠোর পরিশ্রম ও নিয়মতান্ত্রিক জীবন প্রয়োজন, সেটিকে গ্রহণ করেই ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন শামীমা।
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর একটি পরিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে সার্জেন্ট হয়ে ওঠার গল্পে তাই রয়েছে একাধিক অধ্যায়। রয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবার সামরিক ঐতিহ্য, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষা, নতুন দেশে পেশাজীবন এবং এরপর কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে নতুন পরিচয় তৈরি করার চেষ্টা।
তরুণদের জন্য তাঁর এই পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, পেশাগত জীবনে একটি নির্দিষ্ট পথে এগিয়ে যাওয়ার পরও নতুন ক্ষেত্রের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা সম্ভব। তবে সেই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নতুন করে শেখা, কঠোর পরিশ্রম এবং শৃঙ্খলার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা।
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে সার্জেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন, শামীমা সুলতানার এই পথচলা তাঁর পরিবার ও জন্মভূমির মানুষের কাছে গর্বের একটি গল্প। প্রযুক্তির জ্ঞান থেকে সামরিক শৃঙ্খলা, দুই ভিন্ন জগতের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি তৈরি করেছেন নিজের আলাদা পেশাগত পরিচয়।



























