লন্ডন ঘুরে দেখুন পায়ে হেঁটে, ইতিহাস-সাহিত্য থেকে ব্রিক লেনের বাঙালি সংস্কৃতি
- প্রকাশঃ ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ১০:১০
- / 4
লন্ডন, ২৪ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – বিগ বেন, লন্ডন আই, বাকিংহাম প্যালেস কিংবা টাওয়ার ব্রিজ লন্ডনের পরিচিত পর্যটন আকর্ষণ। তবে শহরটির ইতিহাস, সাহিত্য, শিল্প ও বহুসাংস্কৃতিক জীবনকে কাছ থেকে দেখতে চাইলে পায়ে হেঁটে ঘোরার অভিজ্ঞতা হতে পারে ভিন্নরকম। হাঁটার পথে চোখে পড়তে পারে পুরোনো ভবনের নীল ফলক, ঐতিহাসিক বইয়ের দোকান, জাদুঘর, স্ট্রিট আর্ট, টেমস নদীর তীর এবং পূর্ব লন্ডনের ব্রিক লেনের বাঙালি সংস্কৃতির নানা চিহ্ন।
হাঁটার এই যাত্রা শুরু করা যেতে পারে ব্লুমসবেরি থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর, ঐতিহাসিক ভবন ও সাহিত্যিকদের স্মৃতির কারণে এলাকাটি লন্ডনের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অঞ্চলগুলোর একটি। বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে থাকা নীল ফলক থেকে জানা যায়, সেখানে অতীতে বসবাস বা কাজ করেছেন বহু পরিচিত ব্যক্তি।
ব্লুমসবেরির সঙ্গে মহাত্মা গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিও যুক্ত। একই এলাকায় ভার্জিনিয়া উল্ফ, টি এস এলিয়ট, পার্সি শেলি ও মেরি শেলির মতো সাহিত্যিকদের স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। ফলে অল্প দূরত্ব হাঁটার মধ্যেই লন্ডনের সাহিত্য ও ইতিহাসের নানা অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়।
ব্লুমসবেরির কাছেই রয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম। বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতার ঐতিহাসিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ এই জাদুঘরে দক্ষিণ এশিয়া ও মিসরীয় সভ্যতার উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ রয়েছে। কাছাকাছি ব্রিটিশ লাইব্রেরিতেও রয়েছে বিপুলসংখ্যক বই, পাণ্ডুলিপি ও ঐতিহাসিক নথি।
বইয়ের প্রতি আগ্রহ থাকলে হাঁটার পথে পুরোনো ও বিশেষায়িত বইয়ের দোকানেও ঢুঁ মারা যেতে পারে। ব্লুমসবেরি ও আশপাশের এসব দোকানে ইতিহাস, সাহিত্য ও নানা বিষয়ের পুরোনো বই খুঁজে পাওয়া যায়। শহরটির পর্যটনকেন্দ্রের বাইরের সাংস্কৃতিক পরিবেশ বোঝার জন্য এমন জায়গাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর হাঁটতে হাঁটতে যাওয়া যায় কভেন্ট গার্ডেনের দিকে। বাজার, দোকান, রেস্তোরাঁ ও ব্যস্ত পথঘাটের কারণে এলাকাটি দিনের বিভিন্ন সময়ে প্রাণবন্ত থাকে। কাছেই ডেনমার্ক স্ট্রিট, যা সংগীতের যন্ত্র ও সংগীত-সংশ্লিষ্ট দোকানের জন্য পরিচিত।
ডেনমার্ক স্ট্রিট থেকে লেস্টার স্কোয়ারেও হেঁটে যাওয়া যায়। বড় সিনেমা হল, পার্ক ও বিভিন্ন ভাস্কর্যের পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় রয়েছে লন্ডনের চিনেপাড়া। সেখানে বিভিন্ন ধরনের এশীয় খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁ পাওয়া যায়।
লেস্টার স্কোয়ার থেকে পরবর্তী গন্তব্য হতে পারে ট্র্যাফলগার স্কোয়ার। এর পাশেই ন্যাশনাল গ্যালারি, যেখানে ইউরোপীয় চিত্রকলার বড় সংগ্রহ রয়েছে। ভ্যান গঘ, সেজান, মনে ও লিওনার্দো দা ভিঞ্চিসহ বিখ্যাত শিল্পীদের কাজ দেখার সুযোগ পাওয়া যায় সেখানে।
ট্র্যাফলগার স্কোয়ার থেকে টেমস নদীর দিকে এগিয়ে সাউথ ব্যাংকের পথে হাঁটা যেতে পারে। নদীর এক পাশে টেমসের প্রবাহ, অন্য পাশে লন্ডনের পরিচিত স্থাপনাগুলোর দৃশ্য হাঁটার পথটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
সাউথ ব্যাংকে রয়েছে ন্যাশনাল থিয়েটার, ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও কুইন এলিজাবেথ হল। নদীর অপর পাড় থেকে লন্ডন আই, বিগ বেন ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টের স্থাপনাও দেখা যায়। শহরের ব্যস্ততার মধ্যেও নদীর পাড় ধরে হাঁটা লন্ডনের একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা দিতে পারে।
ওয়াটারলু ব্রিজের আশপাশে পুরোনো বই, ছবি ও পোস্টারের বাজার পাওয়া যায়। হাঁটার পথে দেয়াল ও ভবনজুড়ে থাকা স্ট্রিট আর্ট ও গ্রাফিতিও নজরে পড়ে। সাউথ ব্যাংক ধরে আরও এগোলে পৌঁছানো যায় গ্লোব থিয়েটারে, যার ইতিহাস শেক্সপিয়রের নাট্যজগতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সময় হাতে থাকলে হাঁটার তালিকায় রাখা যেতে পারে হাইড পার্ক ও সার্পেন্টাইন গ্যালারি। বিশেষ করে সমকালীন শিল্পে আগ্রহী পর্যটকদের জন্য সার্পেন্টাইন গ্যালারি একটি উল্লেখযোগ্য গন্তব্য হতে পারে।
এই হাঁটার যাত্রার শেষ গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া যেতে পারে পূর্ব লন্ডনের ব্রিক লেন। বাংলাদেশি ও অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের দীর্ঘদিনের বসবাস ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকাটি লন্ডনের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ব্রিক লেনের কাছেই রয়েছে আলতাব আলি পার্ক। সেখানে থাকা শহীদ মিনারের প্রতিকৃতি ব্রিটেনের বাঙালি সম্প্রদায়ের ইতিহাস এবং বাংলাদেশের সঙ্গে এই এলাকার সম্পর্কের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। অভিবাসন, বর্ণবাদ ও বৈষম্যের ইতিহাসের সঙ্গেও ব্রিক লেনের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে।
এলাকার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একটি ভবন একসময় চার্চ, পরে সিনাগগ এবং পরবর্তী সময়ে মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ব্রিক লেনের দেয়ালজুড়ে থাকা গ্রাফিতিতেও বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা ফুটে ওঠে।
হাঁটার পথে ক্ষুধা লাগলে ব্রিক লেনের বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় খাবারের দোকানগুলোতে থামা যেতে পারে। মাছের ভর্তা, চিতল মাছ, কাচ্চি বিরিয়ানি ও মিষ্টি দইসহ নানা ধরনের দেশীয় খাবার পাওয়া যায় এসব দোকানে।
লন্ডনকে পায়ে হেঁটে দেখার বিশেষত্ব হলো, এতে পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি শহরের দৈনন্দিন জীবন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও কাছ থেকে দেখা যায়। একটি দিনের হাঁটার পরিকল্পনাতেই সাহিত্য, ইতিহাস, শিল্প, টেমস নদীর তীর, স্ট্রিট আর্ট এবং ব্রিক লেনের বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তাই লন্ডন ভ্রমণের পরিকল্পনায় একটি দিন শহরটিকে পায়ে হেঁটে দেখার জন্য রাখা যেতে পারে। কোনো পুরোনো ভবনের নীল ফলক, ছোট বইয়ের দোকান, টেমসের তীর কিংবা ব্রিক লেনের একটি বাংলাদেশি খাবারের দোকানই হয়ে উঠতে পারে ভ্রমণের স্মরণীয় অংশ।
সূত্রঃ ন্যাশনাল গ্যালারি \ ব্রিটিশ মিউজিয়াম




























