জন্মহার হ্রাস ও কর্মী সংকট: অস্তিত্ব রক্ষায় অভিবাসনের দিকে ঝুঁকছে যুক্তরাজ্যের এক শহর
- প্রকাশঃ ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৩৪
- / 14
গ্রিনক, স্কটল্যান্ড, ২৩ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির পতন, জন্মহার কমে যাওয়া, তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষের অন্যত্র চলে যাওয়া এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্কটল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের বন্দরনগরী গ্রিনক দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যা সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইনভারক্লাইড কাউন্সিল নতুন বাসিন্দা হিসেবে অভিবাসী ও শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
গ্রিনক ইনভারক্লাইড কাউন্সিল এলাকার প্রধান শহর। একসময় জাহাজ নির্মাণ, বন্দর কার্যক্রম, চিনি শিল্পসহ বিভিন্ন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখানে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করত। শিল্পায়নের সময়ে এসব কর্মসংস্থানের টানে স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চল এবং দেশের বাইরের অনেক মানুষ গ্রিনক ও আশপাশের এলাকায় এসে বসতি গড়েন। পরে শিল্পের পতনের সঙ্গে সঙ্গে সেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারাও বদলে যায়।
ইনভারক্লাইড কাউন্সিলের সাম্প্রতিক নথি অনুযায়ী, ১৯৫১ সালে অঞ্চলটির জনসংখ্যা সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজারে পৌঁছেছিল। এরপর কয়েক দশকে তা দ্রুত কমে আসে। ১৯৫১ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে জনসংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ কমে প্রায় ৮০ হাজারে নেমে যায়। এর মধ্যে ১৯৮১ থেকে ২০০৯ সালেই জনসংখ্যা কমেছে প্রায় ২১ হাজার।
জনসংখ্যা কমার পেছনে মানুষের অন্যত্র চলে যাওয়ার পাশাপাশি জন্মহার কমে যাওয়াও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাউন্সিলের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইনভারক্লাইডে বছরে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা ১৯৯১ সালের ১ হাজার ১৮৫ থেকে ২০২৪ সালে ৫৯৪-এ নেমেছে। অর্থাৎ তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে জন্মের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
জন্ম ও মৃত্যুর ব্যবধানও জনসংখ্যা সংকটকে আরও গভীর করছে। ২০২০-২১ সালে ইনভারক্লাইডে ৫৭০টি জন্মের বিপরীতে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ১৩টি। এতে স্বাভাবিক জনসংখ্যা পরিবর্তনের হিসাবে ৪৪৩ জনের ঘাটতি তৈরি হয়। ওই বছর অবশ্য অভিবাসনের কারণে বাইরে থেকে আসা মানুষের সংখ্যা এলাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষের তুলনায় কিছুটা বেশি ছিল।
২০২২-২৩ সালের তথ্যেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ওই সময়ে ৬২৬টি জন্মের বিপরীতে মৃত্যু হয় ১ হাজার ১৭৪টি, ফলে স্বাভাবিক জনসংখ্যা পরিবর্তনে ৫৪৮ জন কমে যায়। তবে অভিবাসনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল ইতিবাচক। প্রায় ১ হাজার ৯৪০ জন ইনভারক্লাইডে এসেছিলেন এবং ১ হাজার ৪৪০ জন চলে গিয়েছিলেন। ফলে নিট অভিবাসন দাঁড়ায় প্রায় ৫০০ জনে। নতুন আসা মানুষের মধ্যে ৬২০ জন ছিলেন আন্তর্জাতিক অভিবাসী।
এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, বিদেশ থেকে মানুষের আগমন ইতোমধ্যে জনসংখ্যা কমার একটি অংশ সামাল দিতে ভূমিকা রাখছে। কাউন্সিলের নিজস্ব বিশ্লেষণেও ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা ধরে রাখা এবং অর্থনৈতিক পতনের প্রভাব মোকাবিলায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী আকর্ষণ ও ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
গ্রিনক ও বৃহত্তর ইনভারক্লাইডের অর্থনৈতিক দুর্বলতাও জনসংখ্যা সংকটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। শিল্পায়নের সময় বড় নিয়োগদাতাদের ওপর নির্ভরশীল থাকা অঞ্চলটি পরবর্তী সময়ে একের পর এক কর্মসংস্থানের ধাক্কা সামলেছে। কাউন্সিলের সাম্প্রতিক নথি অনুযায়ী, আইবিএম ২০২৩ সালে গ্রিনকে তাদের শেষ অবশিষ্ট স্থাপনাটিও বন্ধ করে দেয়। প্রতিষ্ঠানটি ২০০০ সালের শুরুতে ওই এলাকায় প্রায় ৫ হাজার ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছিল। অন্যান্য বড় নিয়োগদাতার সরে যাওয়ার কারণে অঞ্চলটি আরও প্রায় ১ হাজার ৩০০ কর্মসংস্থান হারিয়েছে।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ইনভারক্লাইড পিছিয়ে রয়েছে। কাউন্সিলের হিসাবে, এখানে সক্রিয় ব্যবসা এবং নতুন ব্যবসা শুরুর হার স্কটল্যান্ডের গড়ের তুলনায় কম। জাতীয় ও আঞ্চলিক গড়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবসার সংখ্যা বিবেচনায় নিলে ইনভারক্লাইডে প্রায় ৭৫০টি ব্যবসা কম রয়েছে।
জনসংখ্যার পাশাপাশি অঞ্চলটির বয়স কাঠামোও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ২০২২ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে ইনভারক্লাইডের কর্মক্ষম বয়সী জনগোষ্ঠী প্রায় ১৫ শতাংশ কমে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। একই সময়ে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে কম সংখ্যক কর্মক্ষম মানুষকে বেশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য, পরিচর্যা ও সামাজিক সেবার চাহিদা সামলাতে হতে পারে।
কাউন্সিলের আবাসন কৌশল অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইনভারক্লাইডের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭৬ হাজার ৩১৩। ২০৩২ সালে তা প্রায় ৭১ হাজার ৪১৩-এ নেমে যেতে পারে, যা প্রায় ৬ শতাংশ হ্রাস। একই সময়ে স্কটল্যান্ডের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসেও সংকটের চিত্র স্পষ্ট। ইনভারক্লাইড কাউন্সিল জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০৪৩ সালের মধ্যে অঞ্চলটির জনসংখ্যা প্রায় ১৫ শতাংশ কমতে পারে। একই সময়ে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ৬৫ থেকে ৮৪ বছর বয়সীদের সংখ্যা প্রায় ১৫ শতাংশ এবং ৮৫ বছরের বেশি বয়সীদের সংখ্যা প্রায় ৪৮ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
জনসংখ্যা কমার প্রভাব আবাসন ও জনসংখ্যার পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা নেই। মানুষের সংখ্যা কমলে স্থানীয় দোকান, ব্যবসা, বিদ্যালয়, পরিবহন এবং অন্যান্য জনসেবার ওপর চাপ ও চাহিদার ধরন বদলে যেতে পারে। একই সঙ্গে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে শ্রমিকের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিচর্যার চাহিদা বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন অভিবাসী ও শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর নীতিকে ইনভারক্লাইডে কেবল অভিবাসন নীতি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি জনসংখ্যা ধরে রাখা এবং স্থানীয় অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। বিদেশ থেকে কর্মক্ষম মানুষ এসে বসতি স্থাপন করলে তারা স্থানীয় শ্রমবাজার, ব্যবসা, ভোক্তা চাহিদা এবং জনজীবনে নতুন গতি আনতে পারেন।
তবে উদ্যোগটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ভিন্নমতও রয়েছে। কিছু বাসিন্দার ধারণা, নতুন মানুষ ও নতুন পরিবার আসলে শহরের জনজীবন এবং অর্থনীতিতে গতি ফিরতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, জীবনযাত্রার মান, আবাসন এবং স্থানীয় পরিষেবার ওপর সম্ভাব্য চাপ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
তবে ইনভারক্লাইডের দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যার প্রবণতা বলছে, অভিবাসন এককভাবে এই সংকটের সমাধান করতে পারবে না। জন্মহার বাড়ানো, তরুণদের ধরে রাখার মতো কর্মসংস্থান তৈরি, নতুন ব্যবসা আকর্ষণ, আবাসন উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতির পুনর্গঠনসহ একাধিক ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ইনভারক্লাইডে অভিবাসন ইতোমধ্যে জনসংখ্যা কমার গতি কিছুটা সামাল দিতে ভূমিকা রাখছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, নতুন অভিবাসী ও শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর পাশাপাশি গ্রিনক এমন একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে পারবে কি না, যেখানে নতুন বাসিন্দারা স্থায়ীভাবে বসতি গড়বেন এবং তরুণ স্থানীয় বাসিন্দারাও ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য শহরটিতে থেকে যেতে আগ্রহী হবেন।



























