ঢাকা ০৩:৩২ , Mon, ২৪ Aug ২০২৬

‘মাতৃত্ব কোনো বাধা নয়’, সন্তানকে কোলে রেখে ছাত্রীর পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

শাহারিয়া নয়ন
  • প্রকাশঃ ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ১৩:৩৪
  • / 5
সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট, শিক্ষকের পোস্ট ছবি: কোলাজ- প্রজন্ম কথা

নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সম্মানিত লেকচারার ও কোঅর্ডিনেটর আব্দুর রহমান রাহাদ। নির্ধারিত ক্লাস টেস্ট চলাকালে এক ছাত্রীর শিশুকে নিজের কোলে সামলে রেখে তাকে সহপাঠীদের সঙ্গে একই সময়ে নিশ্চিন্তে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটির বিবরণ ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষক আব্দুর রহমান রাহাদের এই উদ্যোগ প্রশংসা পায়। ঘটনাটি সামনে আসে তাঁর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একটি পোস্টের মাধ্যমে।

ঘটনার দিন ১৭ আগষ্ট সোমবার সকাল সাড়ে নয়টায় নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ক্লাসে থাকার কথা ছিল শিক্ষক আব্দুর রহমান রাহাদের। তবে সেদিন ক্লাস টেস্ট নেওয়ার প্রস্তুতি থাকায় তিনি কিছুটা দেরিতে ক্লাসে যাচ্ছিলেন। লিফট থেকে নেমে কুইজের খাতা সংগ্রহ করতে যাওয়ার সময় কোলের শিশুকে নিয়ে এক ছাত্রী তাঁর কাছে আসেন। সালাম দিয়ে ওই ছাত্রী নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা দিতে না পারার বিষয়টি জানান এবং কিছুক্ষণ পরে পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি চান।

শিক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি চূড়ান্ত বা মধ্যবর্তী পরীক্ষা ছিল না। ছাত্রীটিকে কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় মনে হওয়ায় তিনি জানতে চান, নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা দিতে পারছেন না কেন।

ওই ছাত্রী জানান, পরীক্ষার সময়টুকুতে তাঁর শিশুকে দেখভাল করার মতো আপাতত কেউ নেই। তাঁর স্বামীও অফিসের কাজ থেকে ছুটি নেওয়ার চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি। তাই তিনি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর এক সহপাঠীর কাছে শিশুটিকে রেখে পরীক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। তবে এর জন্য শিক্ষকের অনুমতি প্রয়োজন ছিল।

ছাত্রীর কথা শুনে শিক্ষক আব্দুর রহমান রাহাদের মনে হয়, আমাদের সমাজে একজন নারীকে সফল হতে গেলে সমাজ, পরিবার, স্বামী, সংসার ও সন্তান সামলে নিজের জন্য এগিয়ে যাওয়ার কিংবা নিজের স্বপ্ন পূরণের সময় বের করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে তিনি চাইলে ওই ছাত্রীর পরীক্ষা পরবর্তী সময়ে নিতে পারতেন। তবে তাঁর মনে হয়, এতে ছাত্রীটির কাছে একটি ভুল বার্তা যেতে পারে।

একই পরীক্ষায় সহপাঠীরা নির্ধারিত সময়ে অংশ নেবেন আর সন্তান থাকার কারণে ওই ছাত্রী আলাদা সময়ে পরীক্ষা দেবেন, এতে তিনি সহপাঠীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার অনুভূতি পেতে পারেন বলে মনে করেন শিক্ষক। তাই তিনি বিষয়টি অন্যভাবে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেন।

শিক্ষক ওই ছাত্রীকে বলেন, শিশুটি যদি তাঁর কাছে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, তাহলে পরীক্ষা চলাকালে তিনি নিজেই তাকে সামলাবেন। শিক্ষক হয়ে পরীক্ষার সময় শিশুকে কোলে নেওয়ার প্রস্তাবে ছাত্রীটি কিছুটা ইতস্তত বোধ করলেও আব্দুর রহমান রাহাদ তাকে আশ্বস্ত করেন। তিনি জানান, একজন মানুষ হিসেবে এটি তাঁর দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

এরপর পুরো পরীক্ষা চলাকালে শিশুটি শিক্ষকের কোলেই ছিল। আর শিশুটির মা তাঁর সহপাঠীদের সঙ্গে একই শ্রেণিকক্ষে বসে নির্ধারিত সময়েই পরীক্ষায় অংশ নেন।

পরীক্ষা শেষে ওই ছাত্রী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শিক্ষককে ধন্যবাদ জানান। জবাবে শিক্ষক তাকে বলেন, ‘মাতৃত্ব কোনো বাধা নয়, বরং এটি আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। সন্তানদের সঙ্গে নিয়েই নিজের মেধার প্রমাণ দিয়ে আপনি সফলভাবে এগিয়ে যাবেন। আপনার জন্য শুভকামনা রইল।’

নিজের ফেসবুক পোস্টে শিক্ষক আরও লেখেন, তাঁর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ ওই ছাত্রী পুরোপুরি বুঝতে পেরেছেন কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে তাঁর নারী শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর বার্তা স্পষ্ট, মাতৃত্বকে বোঝা হিসেবে দেখা উচিত নয়; একজন নারীর জীবনে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে ধারণ করা উচিত এবং মাতৃত্ব নিয়ে গর্বিত হওয়া উচিত।

ঘটনার একটি ছবিও পরে শিক্ষকের কাছে পৌঁছায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষা শেষ করে ফোন হাতে নেওয়ার সময় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে এজাজ নামে এক ব্যক্তি হোয়াটসঅ্যাপে ছবিটি পাঠান।

একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে একজন শিক্ষকের এমন ব্যক্তিগত উদ্যোগের ঘটনাটি তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা পেয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পারিবারিক দায়িত্ব, বিশেষ করে মাতৃত্বের সঙ্গে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মানবিক সহযোগিতার গুরুত্বও সামনে এনেছে।

❤️
👏
🙂
😞

‘মাতৃত্ব কোনো বাধা নয়’, সন্তানকে কোলে রেখে ছাত্রীর পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

প্রকাশঃ ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ১৩:৩৪

নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সম্মানিত লেকচারার ও কোঅর্ডিনেটর আব্দুর রহমান রাহাদ। নির্ধারিত ক্লাস টেস্ট চলাকালে এক ছাত্রীর শিশুকে নিজের কোলে সামলে রেখে তাকে সহপাঠীদের সঙ্গে একই সময়ে নিশ্চিন্তে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটির বিবরণ ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষক আব্দুর রহমান রাহাদের এই উদ্যোগ প্রশংসা পায়। ঘটনাটি সামনে আসে তাঁর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একটি পোস্টের মাধ্যমে।

ঘটনার দিন ১৭ আগষ্ট সোমবার সকাল সাড়ে নয়টায় নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ক্লাসে থাকার কথা ছিল শিক্ষক আব্দুর রহমান রাহাদের। তবে সেদিন ক্লাস টেস্ট নেওয়ার প্রস্তুতি থাকায় তিনি কিছুটা দেরিতে ক্লাসে যাচ্ছিলেন। লিফট থেকে নেমে কুইজের খাতা সংগ্রহ করতে যাওয়ার সময় কোলের শিশুকে নিয়ে এক ছাত্রী তাঁর কাছে আসেন। সালাম দিয়ে ওই ছাত্রী নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা দিতে না পারার বিষয়টি জানান এবং কিছুক্ষণ পরে পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি চান।

শিক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি চূড়ান্ত বা মধ্যবর্তী পরীক্ষা ছিল না। ছাত্রীটিকে কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় মনে হওয়ায় তিনি জানতে চান, নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা দিতে পারছেন না কেন।

ওই ছাত্রী জানান, পরীক্ষার সময়টুকুতে তাঁর শিশুকে দেখভাল করার মতো আপাতত কেউ নেই। তাঁর স্বামীও অফিসের কাজ থেকে ছুটি নেওয়ার চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি। তাই তিনি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর এক সহপাঠীর কাছে শিশুটিকে রেখে পরীক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। তবে এর জন্য শিক্ষকের অনুমতি প্রয়োজন ছিল।

ছাত্রীর কথা শুনে শিক্ষক আব্দুর রহমান রাহাদের মনে হয়, আমাদের সমাজে একজন নারীকে সফল হতে গেলে সমাজ, পরিবার, স্বামী, সংসার ও সন্তান সামলে নিজের জন্য এগিয়ে যাওয়ার কিংবা নিজের স্বপ্ন পূরণের সময় বের করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে তিনি চাইলে ওই ছাত্রীর পরীক্ষা পরবর্তী সময়ে নিতে পারতেন। তবে তাঁর মনে হয়, এতে ছাত্রীটির কাছে একটি ভুল বার্তা যেতে পারে।

একই পরীক্ষায় সহপাঠীরা নির্ধারিত সময়ে অংশ নেবেন আর সন্তান থাকার কারণে ওই ছাত্রী আলাদা সময়ে পরীক্ষা দেবেন, এতে তিনি সহপাঠীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার অনুভূতি পেতে পারেন বলে মনে করেন শিক্ষক। তাই তিনি বিষয়টি অন্যভাবে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেন।

শিক্ষক ওই ছাত্রীকে বলেন, শিশুটি যদি তাঁর কাছে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, তাহলে পরীক্ষা চলাকালে তিনি নিজেই তাকে সামলাবেন। শিক্ষক হয়ে পরীক্ষার সময় শিশুকে কোলে নেওয়ার প্রস্তাবে ছাত্রীটি কিছুটা ইতস্তত বোধ করলেও আব্দুর রহমান রাহাদ তাকে আশ্বস্ত করেন। তিনি জানান, একজন মানুষ হিসেবে এটি তাঁর দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

এরপর পুরো পরীক্ষা চলাকালে শিশুটি শিক্ষকের কোলেই ছিল। আর শিশুটির মা তাঁর সহপাঠীদের সঙ্গে একই শ্রেণিকক্ষে বসে নির্ধারিত সময়েই পরীক্ষায় অংশ নেন।

পরীক্ষা শেষে ওই ছাত্রী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শিক্ষককে ধন্যবাদ জানান। জবাবে শিক্ষক তাকে বলেন, ‘মাতৃত্ব কোনো বাধা নয়, বরং এটি আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। সন্তানদের সঙ্গে নিয়েই নিজের মেধার প্রমাণ দিয়ে আপনি সফলভাবে এগিয়ে যাবেন। আপনার জন্য শুভকামনা রইল।’

নিজের ফেসবুক পোস্টে শিক্ষক আরও লেখেন, তাঁর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ ওই ছাত্রী পুরোপুরি বুঝতে পেরেছেন কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে তাঁর নারী শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর বার্তা স্পষ্ট, মাতৃত্বকে বোঝা হিসেবে দেখা উচিত নয়; একজন নারীর জীবনে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে ধারণ করা উচিত এবং মাতৃত্ব নিয়ে গর্বিত হওয়া উচিত।

ঘটনার একটি ছবিও পরে শিক্ষকের কাছে পৌঁছায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষা শেষ করে ফোন হাতে নেওয়ার সময় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে এজাজ নামে এক ব্যক্তি হোয়াটসঅ্যাপে ছবিটি পাঠান।

একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে একজন শিক্ষকের এমন ব্যক্তিগত উদ্যোগের ঘটনাটি তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা পেয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পারিবারিক দায়িত্ব, বিশেষ করে মাতৃত্বের সঙ্গে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মানবিক সহযোগিতার গুরুত্বও সামনে এনেছে।