১৮ বছর বয়সে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে, বেসমেন্টের ছোট ব্যবসা থেকে বিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠান
- প্রকাশঃ ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২২:৫০
- / 2
ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, (প্রজন্ম কথা) – ১৯৮৯ সাল। বয়স মাত্র ১৮। পড়াশোনার স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমালেন এক তরুণ। পেছনে রয়ে গেল পরিবার, পরিচিত পরিবেশ, বন্ধুবান্ধব আর বেড়ে ওঠার চেনা জগৎ। সামনে সম্পূর্ণ নতুন একটি দেশ, নতুন শিক্ষাব্যবস্থা, নতুন সংস্কৃতি এবং নিজের জায়গা তৈরি করার কঠিন চ্যালেঞ্জ।
তখন ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। ছিল স্বপ্ন, পরিশ্রম করার মানসিকতা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা।
সেই তরুণের নাম মাহফুজ আহমেদ। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এই উদ্যোক্তা শিক্ষার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এসে ভর্তি হন ভার্জিনিয়ার জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটিতে। থাকার খরচ কমাতে থাকতেন গ্রেট ফলসে মামার বাড়িতে। পড়াশোনার খরচের একটি অংশ দিতেন তাঁর মা। বাকি অর্থের জন্য আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও ধার করতে হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি কাজও করেছেন তিনি। ডাইনিং হল, মনোবিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে নিজের খরচ সামলানোর চেষ্টা করেছেন। জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুযায়ী, তাঁর প্রথম চাকরিগুলোর একটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবে।
সেই সময়ের সংগ্রামই ধীরে ধীরে তৈরি করে দেয় তাঁর পরবর্তী পথের ভিত্তি।
জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হওয়ার পর প্রযুক্তি খাতে কর্মজীবন শুরু করেন মাহফুজ। পরে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলেও পড়াশোনা করেন। কর্মজীবনে নর্থরপ গ্রুম্যানে পরামর্শক এবং মবিল অয়েলে জ্যেষ্ঠ প্রযুক্তি ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করার সময় বড় প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত চাহিদা এবং দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান তিনি।
সেখান থেকেই তৈরি হয় নতুন ব্যবসার ভাবনা। ১৯৯৪ সালে সেই ভাবনা থেকেই মাহফুজ আহমেদ প্রতিষ্ঠা করেন ডিজিটাল ইন্টেলিজেন্স সিস্টেমস, সংক্ষেপে ডিসিস। বড় কোনো অফিসে নয়, উত্তর ভার্জিনিয়ার একটি বাড়ির বেসমেন্টে শুরু হয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম।
ডেক্সিয়ানের নিজস্ব ইতিহাসেও এই বেসমেন্টের কথা উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, প্রকৌশলী মাহফুজ কোনো পূর্বনির্ধারিত ব্যবসায়িক কাঠামো ছাড়াই কর্মী সরবরাহ খাতে প্রবেশ করেছিলেন এবং ধীরে ধীরে প্রযুক্তি ও জনশক্তির চাহিদাকে কেন্দ্র করে ব্যবসা গড়ে তোলেন।
দিনের চাকরি শেষ করে রাতে নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করতেন মাহফুজ। সপ্তাহান্তেও চলত ব্যবসার পরিকল্পনা, গ্রাহক খোঁজা এবং নতুন কাজের চেষ্টা। প্রথম দুই বছর ব্যবসা থেকে নিজেদের জন্য কোনো অর্থ নেননি। আয় যা হতো, সেটিই আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করতেন।
কখনো দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেছেন তিনি।
একটি বাড়ির বেসমেন্টে শুরু হওয়া সেই ছোট উদ্যোগের সঙ্গে আজকের ডেক্সিয়ানের তুলনা করলে পথটির ব্যাপ্তি বোঝা যায়। কয়েক দশক পর প্রতিষ্ঠানটি পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জনশক্তি ও প্রযুক্তি সেবা প্রতিষ্ঠানে।
মাহফুজের এই যাত্রায় পরে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠেন তাঁর ভাই মারুফ আহমেদ। তিনিও প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা ছিলেন।
১৯৯৯ সালে মারুফের সহপ্রতিষ্ঠিত একটি তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী সরবরাহ ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডিসিসের সঙ্গে একীভূত হয়। এরপর মারুফ অংশীদার ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। দুই ভাই একসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কৌশল, প্রযুক্তি এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে কাজ শুরু করেন।
এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ব্যবসার পরিধি।
নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে বিশ্বজুড়ে ২০০০ সাল বা ওয়াই-টু-কে নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কম্পিউটার ব্যবস্থা পরীক্ষা ও হালনাগাদ করতে শুরু করে। ফলে দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী ও প্রযুক্তিসেবার চাহিদা বাড়ে। এই সময় ডিসিসও বড় গ্রাহক পেতে শুরু করে এবং ব্যবসার গতি দ্রুত বদলে যায়।
পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে কার্যক্রম বাড়ায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করে। কর্মী সরবরাহের পাশাপাশি প্রযুক্তি পরামর্শ ও প্রযুক্তি সমাধান দেওয়ার কাজও বিস্তৃত হতে থাকে।
ডিসিসের বড় পরিবর্তনগুলোর একটি আসে ২০২১ সালে। প্রতিষ্ঠানটি ফ্লোরিডাভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিগনেচার কনসালট্যান্টস অধিগ্রহণ করে।
এরপর ২০২৩ সালে ডিসিস, সিগনেচার কনসালট্যান্টস এবং অন্যান্য অধিগ্রহণের মাধ্যমে গড়ে ওঠা ব্যবসাগুলোকে একত্র করে চালু করা হয় নতুন ব্র্যান্ড ডেক্সিয়ান।
আজ ডেক্সিয়ান উত্তর ও লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ, ভারত এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির ৭০টির বেশি স্থানে কার্যক্রম এবং প্রায় ১২ হাজার কর্মী রয়েছে বলে সাম্প্রতিক তথ্য জানিয়েছে ভার্জিনিয়া বিজনেস। বিশ্বের ফরচুন ৫০০ তালিকাভুক্ত বহু প্রতিষ্ঠানও এর গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে।
২০২৪ সালে ডেক্সিয়ানের রাজস্ব ছিল ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সে সময় ওয়াশিংটন ডিসি অঞ্চলের সংখ্যালঘু মালিকানাধীন বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায়ও ডেক্সিয়ান শীর্ষে ছিল।
অর্থাৎ, বাংলাদেশ থেকে ১৮ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসা সেই শিক্ষার্থীর ব্যবসা কয়েক দশকের ব্যবধানে বিলিয়ন ডলারের রাজস্বের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই ভাইয়ের দায়িত্বও বদলেছে।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে মাহফুজ আহমেদ প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব ভাই মারুফ আহমেদের হাতে তুলে দেন। এর আগে মারুফ প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ছিলেন। মাহফুজ দায়িত্ব নেন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে।
ডেক্সিয়ানের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, চেয়ারম্যান হিসেবে মাহফুজ দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, আর্থিক পরিকল্পনা এবং প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমের তদারকির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
অর্থাৎ, প্রায় তিন দশক ধরে নিজের হাতে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন পরিচালনার দায়িত্ব ভাইয়ের হাতে দিয়ে তিনি এখন প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা ও কৌশলগত পরিকল্পনায় মনোযোগ দিচ্ছেন।
মাহফুজ আহমেদের উদ্যোক্তা হিসেবে সাফল্য বিভিন্ন পর্যায়ে স্বীকৃতিও পেয়েছে। ২০১৩ সালে তিনি বৃহত্তর ওয়াশিংটন অঞ্চলে আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের বর্ষসেরা উদ্যোক্তা পুরস্কার পান। ডেক্সিয়ানের নেতৃত্বের পাশাপাশি তিনি জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত ছিলেন।
২০২২ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ও কম্পিউটিং কলেজে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার দান করেন। এই অর্থ দিয়ে ডিনস টেকনোলজি ইনোভেশন ফান্ড গড়ে তোলা হয়।
পরের বছর মাহফুজ ও মারুফ দুই ভাইকে তাঁদের সাফল্য ও অবদানের জন্য সম্মান জানায় জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটি। দুই ভাইয়ের যাত্রাকে বিশ্ববিদ্যালয়টি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসে একটি বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা গড়ে তোলার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে।
দুই ভাইকে সম্মান জানানোর অনুষ্ঠানের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বিষয়গুলোর একটি ছিল একটি ময়লার ঝুড়ি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মারুফ আহমেদ পড়াশোনার খরচ চালাতে বিভিন্ন কাজ করতেন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ ও প্রাঙ্গণ পরিচর্যার কাজও ছিল। ফেনউইক লাইব্রেরির সামনে ময়লার ঝুড়ি পরিষ্কার করাও তাঁর দায়িত্বের অংশ ছিল।
বহু বছর পর সফল উদ্যোক্তা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে দুই ভাই নিজেদের নামে কোনো জমকালো স্থাপনা চাননি। বরং লাইব্রেরির কাছের একটি ময়লার ঝুড়ি তাঁদের নামে উৎসর্গ করার অনুরোধ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সেই অনুরোধ গ্রহণ করে।
দেখতে সাধারণ একটি ময়লার ঝুড়ি হলেও দুই ভাইয়ের কাছে এটি হয়ে ওঠে তাঁদের শুরুর দিনের প্রতীক। যে জায়গায় একসময় মারুফ কাজ করতেন, সেখানেই পরে তাঁদের সাফল্যের স্মৃতি যুক্ত হয়।
মাহফুজ আহমেদের গল্প কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বড় হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি বিদেশে গিয়ে একজন তরুণের নিজের জায়গা তৈরি করার দীর্ঘ যাত্রার গল্পও।
১৮ বছর বয়সে শিক্ষার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা, থাকার খরচ বাঁচাতে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকা, পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করা, প্রয়োজনে আত্মীয়দের কাছ থেকে অর্থ ধার করা, চাকরির পাশাপাশি নিজের ব্যবসা শুরু করা এবং বেসমেন্টে বসে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, প্রতিটি ধাপের সঙ্গে যুক্ত ছিল অনিশ্চয়তা।
সেই ছোট উদ্যোগই পরে ডিসিস এবং শেষ পর্যন্ত ডেক্সিয়ানে রূপ নেয়। আজ প্রতিষ্ঠানটির কর্মী হাজার হাজার, কার্যক্রম ছড়িয়ে আছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং বার্ষিক রাজস্ব এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি।
মাহফুজ আহমেদের পথচলায় তাই সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি আছে শুরুটা ছোট হলেও লক্ষ্য বড় রাখার একটি বার্তা। যে তরুণ একসময় পড়াশোনার খরচ চালাতে কাজ করতেন, তিনিই কয়েক দশক পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও জনশক্তি সেবা খাতের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হয়ে দাঁড়িয়েছেন।


























