যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ যৌথ বিবৃতি: বাণিজ্যে শুল্কছাড়, বাজারসুবিধা ও বিনিয়োগে নতুন অধ্যায়
- প্রকাশঃ ১২:০২:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 44
যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে সই হওয়া সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তিতে উভয় দেশের রপ্তানিকারকেরা অভূতপূর্ব সুবিধা পাবেন বলে যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ২০১৩ সালে সই হওয়া ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফোরাম অ্যাগ্রিমেন্ট (টিকফা)-এর ধারাবাহিকতায় এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা দেবে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক দ্রব্য, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ, মোটরযান, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সরঞ্জাম, জ্বালানি, সয়াজাত ও দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, হাঁস-মুরগি, বাদাম ও বিভিন্ন ফল।
অন্যদিকে, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্কহার কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে পাল্টা শুল্ক আরোপ হবে না। তবে এ সুবিধার পরিমাণ নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত সুতা ও কৃত্রিম তন্তুর পরিমাণের ওপর।
চুক্তিতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বিদ্যমান অশুল্ক বাধা কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল মোটরযান নিরাপত্তা ও নির্গমন মানদণ্ড অনুযায়ী নির্মিত যানবাহন গ্রহণ করবে। পাশাপাশি চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও ওষুধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) প্রদত্ত সনদের স্বীকৃতি দেবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে পুনর্নির্মিত (রিম্যানুফ্যাকচার্ড) পণ্য ও যন্ত্রাংশের ওপর বিদ্যমান আমদানি নিষেধাজ্ঞা বা লাইসেন্সের শর্ত প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল বাণিজ্য ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সংস্কারেও অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ। বিশ্বস্ত দেশের সঙ্গে তথ্যের অবাধ আদান–প্রদানের অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) ইলেকট্রনিক আদান–প্রদানে স্থায়ী শুল্ক স্থগিতাদেশের উদ্যোগে সমর্থন জানাবে ঢাকা। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানিতে বিজ্ঞানভিত্তিক ও ঝুঁকিনির্ভর প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকার সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করা, শ্রমিকদের সংগঠনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং যৌথ দর-কষাকষির অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করতে শ্রম আইন সংশোধন ও কঠোর প্রয়োগ করা হবে।
পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর মানদণ্ড বজায় রাখা ও পরিবেশ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের অঙ্গীকারও করা হয়েছে। একই সঙ্গে শুল্ক ও বাণিজ্যব্যবস্থা সহজীকরণ, ভর্তুকি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কারণে বাজারে সৃষ্ট বিকৃতি দূর করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যোগদান এবং সেগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী বিধান গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমন্বয় জোরদার করার লক্ষ্যে শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ কার্যকর দুর্নীতিবিরোধী আইন শক্তিশালী ও প্রয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, যোগ্যতা সাপেক্ষে এক্সপোর্ট–ইমপোর্ট ব্যাংক অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস (এক্সিম ব্যাংক) এবং ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (ডিএফসি)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ বিবেচনা করা হবে।
যৌথ বিবৃতিতে কৃষি, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে সাম্প্রতিক ও আসন্ন বাণিজ্যিক সমঝোতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ, গম, সয়া, তুলা ও ভুট্টা আমদানির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি আগামী ১৫ বছরে আনুমানিক ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার মূল্যের জ্বালানি পণ্য কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
দুই দেশ জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিটি চূড়ান্ত করা হবে এবং কার্যকর করার আগে প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে।


















