ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই: অনিশ্চয়তায় দেশের লাখো তরুণ
- প্রকাশঃ ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৪৬
- / 8
‘পাঁচ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান?’ ইন্টারভিউ বোর্ডের এই প্রশ্নের উত্তরে এক চাকরিপ্রার্থীর জবাব, ‘স্যার, আপাতত আগামী মাসের মেসভাড়াটা দিতে পারলেই খুশি।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই কৌতুকের আড়ালে ফুটে উঠেছে দেশের লাখো উচ্চশিক্ষিত তরুণের কর্মসংস্থান সংকট। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনের পর দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনার পরিবর্তে অনেকের প্রধান চিন্তা হয়ে উঠেছে মাসিক খরচ সামলানো এবং একটি চাকরি খুঁজে পাওয়া।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা সব শিক্ষাস্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার গ্র্যাজুয়েট চাকরির বাইরে রয়েছেন। অন্যদিকে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার মাত্র ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ শিক্ষাগত যোগ্যতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বাড়ছে না।
এই সংকটের প্রতিফলন দেখা যায় রাজধানীর বিভিন্ন মেসে থাকা তরুণদের জীবনেও। পুরান ঢাকার নারিন্দায় থাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আসিফ স্নাতক শেষ করার দুই বছর পরও চাকরির অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁর প্রতিদিনের চিন্তার বড় অংশজুড়ে রয়েছে চাকরির আবেদন এবং মেসভাড়া। একইভাবে রাজাবাজারের মেসে থাকা তানভীরের সংগ্রাম যাতায়াত খরচ ও দৈনন্দিন ব্যয় সামলানো নিয়ে। রংপুর থেকে ঢাকায় এসে পরীক্ষা দেওয়া রনির দুই মাসের মেসভাড়া বাকি পড়ে আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তিন তরুণ দেশের লাখো বেকার যুবকের প্রতিনিধিত্ব করছেন। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গড়ে প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েশন শেষ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে বিপুলসংখ্যক তরুণ দীর্ঘ সময় চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন।
সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও দীর্ঘ নিয়োগ প্রক্রিয়া এই সংকটকে আরও গভীর করছে। সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিসিএস কিংবা বড় ধরনের নিয়োগ পরীক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে একজন প্রার্থীর তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। দীর্ঘ এই অপেক্ষার কারণে অনেক তরুণ বেসরকারি খাতেও প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়স ও অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছেন।
শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার অসামঞ্জস্যকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের ফলে প্রচলিত অনেক চাকরির ধরন পরিবর্তিত হবে। তবে প্রযুক্তিগত ও কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের চাহিদা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। তাই আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা উন্নয়ন এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, দেশের অনেক শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করে নির্দিষ্ট কিছু সরকারি বা বড় করপোরেট চাকরির প্রস্তুতিতে কয়েক বছর ব্যয় করছেন। এর পরিবর্তে শিক্ষাজীবন থেকেই দক্ষতা অর্জন, ইন্টার্নশিপ, প্রশিক্ষণ, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এতে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ সহজ হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গঠনের সুযোগও বাড়বে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তরুণদের কর্মসংস্থান সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপযুক্ত দক্ষতার ঘাটতির কারণে দেশের উল্লেখযোগ্য মানবসম্পদ কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এর ফলে বাংলাদেশের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশের সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নীতিগত সংস্কার, শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। তবে বর্তমানে দেশের হাজারো তরুণের দিন কাটছে মেসভাড়ার হিসাব, চাকরির আবেদন ফি এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চাপ সামলে। উচ্চশিক্ষিত এই প্রজন্মের দক্ষতা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্টরা।



























