বাংলাদেশি স্বাদের রান্নায় সাফল্য, যুক্তরাজ্যের মাস্টারশেফের সেমিফাইনালে সাবিনা
- প্রকাশঃ ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১২:১৩
- / 2
২৫ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – মানিকগঞ্জের মেয়ে ও ব্রিটিশ-বাংলাদেশি রন্ধনশিল্পী সাবিনা খান যুক্তরাজ্যের মাস্টারশেফ ইউকের সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে বাংলাদেশি খাবারকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুনভাবে তুলে ধরার স্বপ্ন দেখছেন। তাঁর লক্ষ্য, একদিন মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলবে, ‘চল, আজ বাংলাদেশি খাবার খেতে যাই।’
সম্প্রতি বাংলাদেশে এসে হাল ফ্যাশনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজের রান্নার জগতে আসার গল্প, মাস্টারশেফ ইউকের অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশি খাবারের আন্তর্জাতিক সম্ভাবনা, নারীদের নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং জীবনের নতুন করে শুরু করার বিষয়ে কথা বলেছেন সাবিনা।
মানিকগঞ্জে বেড়ে ওঠা সাবিনার রান্নার হাতেখড়ি মা ও দাদির কাছ থেকে। ছোটবেলা থেকেই মায়ের রান্না দেখেই তাঁর বড় হওয়া। তাঁর মা বাঙালি খাবারের পাশাপাশি পিৎজা, বার্গার, কাবাব, বিরিয়ানি, পেস্ট্রি, কেক, কুকিজ ও ডোনাটসহ নানা ধরনের খাবার তৈরি করতেন।
সাবিনার কাছে রান্না কেবল খাবার তৈরির একটি প্রক্রিয়া নয়। খাবারের সঙ্গে ভালোবাসা, যত্ন এবং পারিবারিক স্মৃতি জড়িয়ে থাকে বলে মনে করেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে বসে খাওয়ার অভিজ্ঞতাই রান্নার প্রতি তাঁর আগ্রহকে আরও গভীর করেছে।
প্রায় ৫০ বছর বয়সে এসে রান্নাকে পেশাগত জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন সাবিনা। এর আগে কনসালট্যান্ট, গবেষক ও সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। তবে প্রায় দুই দশক ধরে পরিবার ও বন্ধুদের জন্য নিয়মিত রান্না করে আসছিলেন।
জীবনের কোনো একটি সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে না বলে মনে করেন সাবিনা। নিজের পছন্দ ও আগ্রহ খুঁজে পেলে জীবনের অনেক পরেও পেশা পরিবর্তন করা সম্ভব বলে তাঁর বিশ্বাস।
তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আসে মাস্টারশেফ ইউকে-তে অংশ নেওয়ার পর। প্রতিযোগিতার শুরুতে নিজের সামর্থ্য নিয়ে খুব বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না সাবিনা। প্রথম দিকেই বাদ পড়ে যেতে পারেন বলে ধারণা করেছিলেন। তবে এক ধাপ করে এগিয়ে শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালে জায়গা করে নেন তিনি।
মাস্টারশেফের রান্নাঘরে গবেষণা, যোগাযোগ, চাপের মধ্যে কাজ করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রান্না শেষ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রতিযোগিতায় সহায়তা করেছে। তাঁর কাছে এই প্রতিযোগিতা রান্নার দক্ষতার পাশাপাশি নিজের সামর্থ্য ও আত্মবিশ্বাস যাচাইয়েরও একটি সুযোগ ছিল।
ফাইনালে উঠতে না পারলেও বিষয়টি নিয়ে হতাশ নন সাবিনা। মাস্টারশেফের অভিজ্ঞতাকে তিনি জীবনের অন্যতম বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখেন। প্রতিযোগিতার পর এক বছরের মধ্যে তাঁর জীবন, কাজ ও চিন্তাভাবনায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে বলে জানান তিনি।
মাস্টারশেফ ইউকে-তে সাবিনার মুড়ি-পেঁয়াজু পরিবেশনও দর্শকদের নজরে আসে। তবে তিনি খাবারটিকে প্রচলিত রূপে পরিবেশন করেননি। ঝালমুড়ির সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের খাবারের প্রভাব, ফালাফেল এবং পাঁচফোড়ন ও রসুনের কনফি দিয়ে তৈরি বিশেষ সস ব্যবহার করে খাবারটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন।
বাংলাদেশি খাবারকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে জনপ্রিয় করতে হলে খাবারের মূল স্বাদ ও পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে নতুন সংস্কৃতির মানুষের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সাবিনা।
বাংলাদেশি খাবারকে তিনি ‘জটিল’ বলে বর্ণনা করেন ইতিবাচক অর্থে। তাঁর মতে, ভর্তা, পোলাও, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে বিভিন্ন আঞ্চলিক খাবারের স্বাদ, রান্নার পদ্ধতি, মসলা ও ইতিহাসে রয়েছে ব্যাপক বৈচিত্র্য।
পাঁচফোড়ন, সরিষার তেল, মাছের বৈচিত্র্যসহ বাংলাদেশের নিজস্ব উপকরণ ও রান্নার ঐতিহ্য আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। খাবারের সঙ্গে গল্প ও সংস্কৃতিকে যুক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন এই রন্ধনশিল্পী।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশি খাবার নিয়ে একটি রেস্তোরাঁ করার স্বপ্ন রয়েছে সাবিনার। তবে আপাতত রেস্তোরাঁ খোলার পরিকল্পনা নেই। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে সাপার ক্লাব আয়োজন করছেন তিনি। লন্ডনে এমন আয়োজনের পাশাপাশি জেনেভাতেও আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
ক্যাটারিং, লেখালেখি এবং খাদ্য ইতিহাস নিয়েও কাজ করতে চান সাবিনা। খাবার কীভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং মানুষের চলাচলের সঙ্গে খাবারের স্বাদ ও সংস্কৃতিতে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, এসব বিষয় তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
বাংলাদেশি নারীদের নিয়েও ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। সাবিনার মতে, বাংলাদেশে অনেক নারী অসাধারণ রান্না করলেও নিজেদের দক্ষতাকে ব্যবসায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস ও প্রয়োজনীয় জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে।
ভবিষ্যতে নারীদের রান্নার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ক্যাটারিং ব্যবসা শুরু, নিজেদের খাবারের প্রচার এবং রান্নার দক্ষতাকে আয়ের উৎসে পরিণত করার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে চান তিনি। একজন নারী নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারলে তাঁর নিজের পাশাপাশি পরিবারের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করেন সাবিনা।
রান্নার পাশাপাশি শরীর ও মানসিক সুস্থতার জন্য ব্যায়ামকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি। ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে নয়, মানসিকভাবে ভালো থাকার জন্য ব্যায়াম করেন বলে জানান সাবিনা। দৌড়ানো বা ট্রেডমিলে ব্যায়ামের সময় নিজের জন্য সময় পান, চিন্তা করতে পারেন এবং নতুন রান্নার ধারণাও আসে বলে জানান তিনি।
৫০ বছর বয়সেও সক্রিয় জীবনযাপন নিয়ে সাবিনার পরামর্শ, বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরকে শক্তিশালী রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ। দৌড়ানো সম্ভব না হলে হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার বা ওজন নিয়ে ব্যায়ামের মতো যেকোনো উপায়ে শরীরকে সচল রাখার কথা বলেন তিনি।
জীবনের এই পর্যায়ে সাবিনার সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হলো, নিজের পছন্দ ও আগ্রহকে কখনো ছোট করে দেখা উচিত নয়। তাঁর মতে, জীবনের যেকোনো বয়সে নতুন কিছু শেখা এবং নতুন করে শুরু করার সুযোগ রয়েছে।
মাস্টারশেফ ইউকে-তে অংশ নিতে আগ্রহীদেরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছেন সাবিনা। ফল কী হবে, তা আগে থেকে চিন্তা না করে এক ধাপ করে এগিয়ে যাওয়াকে গুরুত্ব দেন তিনি। নিজের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করলে জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যেতে পারে বলে মনে করেন এই রন্ধনশিল্পী।
বর্তমানে রান্না, সাপার ক্লাব, ক্যাটারিং ও লেখালেখিসহ বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন সাবিনা খান। তাঁর স্বপ্ন নিজের রান্নার পরিচিতি তৈরির পাশাপাশি বাংলাদেশের খাবার ও খাদ্যসংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক মানুষের কাছে এমনভাবে তুলে ধরা, যাতে বাংলাদেশি খাবারও বিশ্বজুড়ে আলাদা পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করে।


























