নিউইয়র্কের কুইন্সে যেন এক টুকরো বাংলাদেশ, দেশি কাঁচাবাজারে প্রবাসীদের নস্টালজিয়ার জীবন
- প্রকাশঃ ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১৭:১৬
- / 4
নিউইয়র্ক, ২৭ আগস্ট (প্রজন্ম কথা) – রাস্তার পাশে প্লাস্টিকের কেরেটে সাজানো লাউ, শাক, বেগুন, সিম আর কাঁচা মরিচ। পাশে বসে আছেন সবজি বিক্রেতা। কেউ দরদাম করছেন, কেউ হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে নিউইয়র্কের ব্যস্ত শহরের মানুষ। দৃশ্যটি দেখে প্রথমে মনে হতে পারে, এটি বাংলাদেশের কোনো পরিচিত পাড়া-মহল্লার বাজার। কিন্তু জায়গাটি বাংলাদেশ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের কুইন্স।
কুইন্সের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ফুটপাত ঘিরে এমন দেশি কাঁচাবাজারের দেখা মেলে। শহরের আধুনিক স্থাপনা, ব্যস্ত রাস্তা আর বহুজাতিক মানুষের ভিড়ের মাঝেও এসব বাজারে পাওয়া যায় বাংলাদেশের পরিচিত সবজি, মাছ, মাংস, মসলা ও রান্নার উপকরণ। ফলে অনেক প্রবাসীর কাছে বাজার করা এখানে দৈনন্দিন প্রয়োজনের পাশাপাশি হয়ে ওঠে ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি ছুঁয়ে দেখার একটি সুযোগ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ছবিও নতুন করে সেই অনুভূতিকে সামনে এনেছে। নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশি জিশান আফিফ তাঁর ফেসবুক পাতায় কয়েকটি ছবি প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘আমার কথা বিশ্বাস করুন, এটা নিউইয়র্ক শহর।’ ছবিগুলোতে কুইন্সের জ্যামাইকার হিলসাইড অ্যাভিনিউ এলাকার রাস্তার পাশে ফুটপাতে ঝুড়ি ও প্লাস্টিকের কেরেটে দেশি সবজি সাজিয়ে বসতে দেখা যায় বিক্রেতাদের।
ছবিগুলোতে লাউ, টমেটো, শিম, কাঁচা মরিচ, শাকসহ বিভিন্ন সবজি দেখা যায়। পেছনে রয়েছে দোকানপাট ও বাংলা ভাষায় লেখা একটি ফার্মেসির সাইনবোর্ড। সবজির পসারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রবীণ বিক্রেতা, ক্রেতাদের আনাগোনা এবং রাস্তার স্বাভাবিক ব্যস্ততা মিলে দৃশ্যটি অনেকটাই বাংলাদেশের পরিচিত ফুটপাতের বাজারের কথা মনে করিয়ে দেয়।

আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, কেরেটের ওপর বসে থাকা একজন ব্যক্তি সিগারেট ফুঁকছেন। আশপাশে কয়েকজন প্রবীণ ও মধ্যবয়সী বাঙালি দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। কারও হাতে বাজারের ব্যাগ, কারও হাতে কাগজ কিংবা মুঠোফোন। দৃশ্যটি কেবল কেনাকাটার নয়, প্রবাসী জীবনের পরিচিত আড্ডা, কুশল বিনিময় ও মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের ছবিও তুলে ধরে।
ছবিগুলোর একটি সাদাকালো ফ্রেমে ধারণ করা হয়েছে। ফলে নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাস্তার পাশের সাধারণ একটি বাজারের দৃশ্যেও তৈরি হয়েছে পুরোনো দিনের আবহ। বাংলাদেশের কোনো শহর বা মফস্বলের বাজারের স্মৃতির সঙ্গে সেই দৃশ্যের মিল খুঁজে পাওয়া স্বাভাবিক।
তবে নিজের প্রকাশিত ছবিগুলোর ব্যাখ্যাও পরে স্পষ্ট করেছেন জিশান আফিফ। তিনি বলেন, রাস্তার হকারদের ছবিগুলো তিনি পরিচিত দৃশ্য ও স্মৃতির প্রতি নস্টালজিয়া থেকেই শেয়ার করেছিলেন। এর পেছনে কোনো গভীর বার্তা বা কাউকে বিচার করার উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁর যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময়কাল বা পোস্টের অর্থ নিয়েও কোনো বিতর্ক তৈরি করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না।
তিনি আরও লেখেন, কখনো কখনো কোনো ছবি কেবল একটি স্মৃতি হয়ে থাকে। সেই স্মৃতিকে উপভোগ করা, ইতিবাচক বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং জীবনকে অপ্রয়োজনে জটিল না করাই তাঁর বক্তব্যের মূল কথা।
কুইন্সের এই দৃশ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের পরিচিতির জায়গাটা মূলত খাবার ও বাজারের সংস্কৃতিতে। দেশি মাছ, শাকসবজি, মসলা কিংবা রান্নার উপকরণ প্রবাসীদের কাছে অনেক সময় শৈশব ও পারিবারিক জীবনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। বিদেশে বসে পরিচিত কোনো সবজি হাতে নেওয়া কিংবা বাংলাদেশের মতো করে বাজার করার অভিজ্ঞতা তাই অনেকের কাছে আলাদা অনুভূতির জন্ম দেয়।
জ্যাকসন হাইটসসহ কুইন্সের বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পরিচিত খাদ্যপণ্য পাওয়া যায়। মাছ, মাংস, শাকসবজি, চাল, ডাল ও মসলা থেকে শুরু করে রান্নার নানা উপকরণ এসব বাজারে বিক্রি হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারগুলো দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে।
বাংলাদেশি খাবারের উপস্থিতিও এই এলাকার পরিচিত বৈশিষ্ট্য। ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি এবং বিভিন্ন ধরনের দেশি খাবার প্রবাসীদের পাশাপাশি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেও পরিচিত হয়ে উঠেছে। ফলে বাজারের সঙ্গে খাবার এবং খাবারের সঙ্গে সংস্কৃতির একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

দেশি বাজারের এই সংস্কৃতির আরেকটি দিক হলো সামাজিক যোগাযোগ। একই বাজারে পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়া, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা বলা কিংবা দেশের খবর নেওয়া প্রবাসীদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। বিশেষ করে বয়স্ক প্রবাসীদের জন্য পরিচিত ভাষা ও পরিচিত মানুষের উপস্থিতি এসব জায়গাকে আরও আপন করে তুলতে পারে।
নতুন প্রজন্মের কাছেও এই বাজারগুলোর আলাদা ভূমিকা রয়েছে। পরিবারের রান্নাঘরে যে খাবার তারা দেখে বড় হচ্ছে, তার উপকরণ কোথা থেকে আসে, কীভাবে বাজার করা হয় এবং কোন খাবারের সঙ্গে বাংলাদেশের পারিবারিক সংস্কৃতির সম্পর্ক রয়েছে, বাজারের মধ্য দিয়েই তার সঙ্গে তাদের পরিচয় তৈরি হয়।
নিউইয়র্ক একটি বহুজাতিক শহর। এখানে বিভিন্ন দেশের মানুষ নিজেদের খাবার, ভাষা ও সংস্কৃতিকে সঙ্গে নিয়ে বসবাস করছেন। সেই বৈচিত্র্যের মধ্যেই কুইন্সের দেশি বাজারগুলো তৈরি করেছে এমন এক পরিসর, যেখানে নিউইয়র্কের শহুরে জীবন আর বাংলাদেশের পরিচিত বাজার সংস্কৃতি পাশাপাশি দেখা যায়।
ফুটপাতের কেরেটে সাজানো কয়েকটি সবজি হয়তো অর্থমূল্যে খুব সাধারণ। কিন্তু প্রবাসী জীবনের কাছে সেই লাউ, শাক, বেগুন কিংবা কাঁচা মরিচের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে গ্রামের বাড়ি, পুরোনো পাড়া, পরিবারের রান্নাঘর কিংবা ছুটির দিনের বাজারের স্মৃতি।
সেই কারণেই নিউইয়র্কের কুইন্সের এসব দেশি বাজারকে কেবল কেনাকাটার জায়গা হিসেবে দেখলে গল্পের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এগুলো প্রবাসীদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি খাবার, সংস্কৃতি, পরিচিত মানুষ এবং ফেলে আসা জীবনের সঙ্গে একটি মানসিক যোগাযোগও তৈরি করে।
হাজার মাইল দূরে থেকেও তাই কোনো এক ব্যস্ত নিউইয়র্কের রাস্তায় যখন ফুটপাতের কেরেটে দেশি সবজি সাজানো থাকে, পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন পরিচিত পোশাকের একজন প্রবীণ বিক্রেতা আর কয়েকজন বাঙালি গল্পে মেতে ওঠেন, তখন সেই দৃশ্য অনেকের চোখে হয়ে ওঠে এক টুকরো বাংলাদেশ। শহরটি নিউইয়র্ক হলেও, মুহূর্তটির অনুভূতিতে ফিরে আসে ফেলে আসা দেশের জীবন।





























