লন্ডনে আইন পড়েও বাংলাদেশের আইন শূন্য থেকে, বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে ১৭তম, বিজেএসে দ্বিতীয় সাবা ইমা
- প্রকাশঃ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৫৩
- / 3
বাংলাদেশের আইন পড়ার সুযোগ হয়নি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে। যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি শেষ করার পরও দেশের আইন, দণ্ডবিধি কিংবা বিচারব্যবস্থার পাঠ ছিল তাঁর কাছে নতুন। কিন্তু সম্মানজনক পেশাজীবনের লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে যাননি সাবা ইমা। ২০২৪ সালে একেবারে শূন্য থেকে বাংলাদেশের আইন পড়া শুরু করেন। এরপর একই সময়ে বিসিএস ও বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে অর্জন করেন দুটি বড় সাফল্য।
প্রথম বিসিএসেই পররাষ্ট্র ক্যাডারে মেধাক্রমে ১৭তম হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হন সাবা। একই সময়ে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পড়া একজন শিক্ষার্থীর জন্য বাংলাদেশের আইন নতুন করে আয়ত্ত করে এমন ফল অর্জনের পথটি ছিল দীর্ঘ ও পরিশ্রমসাধ্য।
সাবা ইমা রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের ২০১৯ সালের শিক্ষার্থী। এর আগে পড়েছেন দ্য মিলেনিয়াম স্কুল এবং দ্য মিলেনিয়াম স্টারস স্কুল অ্যান্ড কলেজে। পরে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বাংলাদেশের আইন পড়ার সুযোগ না থাকায় দেশে ফিরে আইন ও বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁকে প্রস্তুতি নিতে হয়েছে নতুন করে।
২০২৪ সাল থেকে নিজের উদ্যোগে বাংলাদেশের ৩০টির বেশি আইন পড়া শুরু করেন সাবা। একই সঙ্গে সামনে ছিল দুটি আলাদা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি। একটি বিসিএস, অন্যটি বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস। ফলে পড়াশোনার পরিধির পাশাপাশি পরীক্ষার সময়সূচিও হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ৪৭তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। এরপর ১ নভেম্বর দেন ১৮তম বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। ২৭ নভেম্বর থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা।
এরপরও থামেনি পরীক্ষার প্রস্তুতি। ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি ৫০তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেন সাবা। ৮ থেকে ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় এর লিখিত পরীক্ষা। এর পরপরই ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ১৮তম বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের টানা দশ দিনের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি।
এতগুলো পরীক্ষার ব্যস্ততার মধ্যেই আসে একের পর এক ফলাফল। ৪৭তম বিসিএসের ফলাফলে পররাষ্ট্র ক্যাডারে মেধাক্রমে ১৭তম হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হন সাবা। এটি ছিল তাঁর প্রথম বিসিএস এবং জীবনের প্রথম চাকরির পরীক্ষা। পরে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হলে সেখানে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন তিনি।
বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের প্রস্তুতিতে তাঁর পথটি ছিল প্রচলিত ধারার বাইরে। বাংলাদেশের আইন বিষয়ে একাডেমিক ভিত্তি না থাকায় অন্যদের মতো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে এই প্রস্তুতি শুরু করার সুযোগ ছিল না। নিজের উদ্যোগে একে একে দেশের আইনগুলো পড়েছেন, সেগুলো বুঝেছেন এবং পরীক্ষার উপযোগী করে প্রস্তুতি নিয়েছেন।
শূন্য থেকে শুরু করার এই অভিজ্ঞতাই তাঁর সাফল্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশি আইনের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জুডিসিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অর্জনকে তাই নিজের জীবনের স্মরণীয় অর্জন হিসেবে দেখেন সাবা।
বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষাতেও আইন বিষয়ে তাঁর প্রস্তুতির প্রতিফলন দেখা যায়। ২০২৬ সালের ৭ জুন অনুষ্ঠিত ভাইভায় বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন শাহনাজ সরকার। প্রায় ২৫ মিনিটের ওই মৌখিক পরীক্ষায় আইন, নারীর ক্ষমতায়ন, জেন্ডার উন্নয়ন, অর্থনীতি, শ্রম অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হন তিনি।
ভাইবার শুরুতেই নিজের ক্যাডার পছন্দের তালিকা জানান সাবা। সেখানে পররাষ্ট্র ক্যাডার ছিল তাঁর প্রথম পছন্দ। পরে আইনভিত্তিক বিভিন্ন প্রশ্নের পাশাপাশি প্যারোল, হোয়াইট কলার ও ব্লু কলার অপরাধ, নারীবাদ, সমতা ও ন্যায্যতার পার্থক্য এবং নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে প্রশ্ন করা হয় তাঁকে।
এক পর্যায়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, সমতা নিশ্চিত করতে সমান আচরণ বেশি প্রয়োজন, নাকি মানুষের প্রয়োজন ও প্রারম্ভিক অবস্থার পার্থক্য বিবেচনা করা বেশি জরুরি। সাবা সেখানে ন্যায্যতাভিত্তিক সমতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সমাজে সবার শুরুটা একই জায়গা থেকে হয় না। তাই সবাইকে একইভাবে বিবেচনা করলেই কাঙ্ক্ষিত সমতা নিশ্চিত হয় না।
নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্র হিসেবে তিনি রাজনীতি, শিক্ষা ও শ্রম অভিবাসনের কথা বলেন। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ অদক্ষ বা আধা-দক্ষ কর্মী হওয়ায় তাঁদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আইনি সুরক্ষা এবং কর্মপরিবেশ উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
ভাইবার শেষ দিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে প্রশ্ন করা হয় তাঁকে। বাংলাদেশ-পাকিস্তান ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার মতো বিষয় নিয়ে নিজের মতামত দিতে হয়। আইন বিষয়ে অপরাধ সংঘটনের মানসিক উপাদান এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারার প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।
নিজের ভাইবার অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ পরীক্ষার্থীদের জন্য কয়েকটি পরামর্শও দিয়েছেন সাবা। তাঁর মতে, মৌখিক পরীক্ষায় নার্ভ শক্ত রাখা, নিজের ইতিবাচক দিকগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরা এবং ইংরেজিতে কথা বলার জড়তা কাটিয়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ।
সাবা ইমার যাত্রায় তাই সাফল্যের গল্পটি কেবল দুটি পরীক্ষায় ভালো ফল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার পর বাংলাদেশের আইন সম্পর্কে একেবারে নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়া, একই সময়ে বিসিএস ও জুডিসিয়াল সার্ভিসের মতো কঠিন দুটি পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ পরীক্ষার সময়সূচির মধ্যেও ধারাবাহিকতা ধরে রাখার গল্পও এটি।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে যে দেশের আইন পড়ার সুযোগ হয়নি, সেই দেশের আইনই পরে নিজের হাতে ধরে শিখেছেন সাবা। সেই প্রস্তুতির ফল হিসেবে প্রথম বিসিএসেই পররাষ্ট্র ক্যাডারে ১৭তম স্থান এবং একই সময়ে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসে দ্বিতীয় স্থান অর্জন তাঁর অধ্যবসায়ের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।




























