ঢাকা ০৬:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ওসমান হাদি হত্যা: ভাইরাল ভিডিও এআই-নির্মিত নয়, তবে বক্তব্যে রয়েছে বিভ্রান্তি—দ্য ডিসেন্টের বিশ্লেষণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশঃ ০১:০৪:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 59

ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদের বক্তব্য হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে ভিডিওটির সত্যতা এবং এতে উত্থাপিত দাবিগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করেছে অনুসন্ধানী প্ল্যাটফর্ম দ্য ডিসেন্ট।

দ্য ডিসেন্টের বিশ্লেষণে প্রথমেই স্পষ্ট করা হয়েছে, আলোচিত ভিডিওটি এআই-জেনারেটেড নয়। ভিডিওতে ফয়সাল করিম মাসুদের মুখভঙ্গি, অভিব্যক্তি ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য তার বাস্তব উপস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাশাপাশি ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ বিশ্লেষণ করেও কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। অন্তত চারটি নির্ভরযোগ্য এআই যাচাই টুলে পরীক্ষা চালিয়ে সবগুলোতেই একই সিদ্ধান্ত এসেছে—ভিডিওটি এআই দ্বারা নির্মিত নয়।

তবে ভিডিওটির কিছু অংশে একটি বিভ্রান্তিকর বিষয় লক্ষ্য করা গেছে। নির্দিষ্ট কয়েকটি ফ্রেমে ফয়সালের থুতনিতে থাকা দাড়ি অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখা যায়। এ বিষয়ে দ্য ডিসেন্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি ভিডিও ধারণের সময় কোনো ফিল্টার সক্রিয় থাকার কারণে সৃষ্ট ভিজ্যুয়াল গ্লিচ হতে পারে। বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত অনেক ফিল্টারেই এআই প্রযুক্তির সংযোজন থাকায় এমন ত্রুটি দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে এই একটি কারণে পুরো ভিডিওকে কৃত্রিম বা সাজানো বলে দাবি করার সুযোগ নেই বলে মত দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ভিডিওতে ফয়সাল করিম মাসুদ দাবি করেছেন, তিনি বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। তবে দ্য ডিসেন্ট জানায়, কেবল ভিডিও বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে তার অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ভিডিওতে বা অন্য কোনো মাধ্যমে তিনি দুবাইয়ে থাকার পক্ষে দৃশ্যমান কিংবা প্রামাণ্য কোনো তথ্য উপস্থাপন করেননি।

বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, ভিডিওতে ফয়সাল অন্তত একটি প্রমাণিত মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ওসমান হাদিকে হত্যার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। অথচ দ্য ডিসেন্টের আগের অনুসন্ধান এবং পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে স্পষ্টভাবে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে গুলিবর্ষণকারী ব্যক্তি ছিলেন ফয়সাল করিম মাসুদ এবং বাইকটি চালাচ্ছিলেন তার সহযোগী আলমগীর শেখ। এই তথ্য দেশের শীর্ষস্থানীয় একাধিক গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।

এ ছাড়া ভিডিওতে ফয়সাল অভিযোগ করেন, অর্থ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দুটি কাজ তদবিরের মাধ্যমে পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওসমান হাদি তার কাছ থেকে আগাম পাঁচ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে দ্য ডিসেন্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, হাদির মৃত্যুর পর এ ধরনের অভিযোগ যাচাই বা প্রমাণ করা কার্যত অসম্ভব। তাছাড়া, তার বিরুদ্ধে এর আগে কখনো তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠেনি। বরং তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনিয়মের বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার ছিলেন। সে কারণে মৃত্যুর পর উত্থাপিত এমন অভিযোগকে সন্দেহের চোখে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

সবশেষে দ্য ডিসেন্ট জানায়, ভাইরাল ভিডিওটি বাস্তব হলেও এতে উত্থাপিত সব দাবি যে সত্য—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং কিছু বক্তব্য ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত তথ্য ও চলমান তদন্তের ফলাফলের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন ভিডিও দেখার ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বরং যাচাইকৃত তথ্য ও প্রমাণের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

প্রাসঙ্গিক

শেয়ার করুন

ওসমান হাদি হত্যা: ভাইরাল ভিডিও এআই-নির্মিত নয়, তবে বক্তব্যে রয়েছে বিভ্রান্তি—দ্য ডিসেন্টের বিশ্লেষণ

প্রকাশঃ ০১:০৪:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫

ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদের বক্তব্য হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে ভিডিওটির সত্যতা এবং এতে উত্থাপিত দাবিগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করেছে অনুসন্ধানী প্ল্যাটফর্ম দ্য ডিসেন্ট।

দ্য ডিসেন্টের বিশ্লেষণে প্রথমেই স্পষ্ট করা হয়েছে, আলোচিত ভিডিওটি এআই-জেনারেটেড নয়। ভিডিওতে ফয়সাল করিম মাসুদের মুখভঙ্গি, অভিব্যক্তি ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য তার বাস্তব উপস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাশাপাশি ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ বিশ্লেষণ করেও কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। অন্তত চারটি নির্ভরযোগ্য এআই যাচাই টুলে পরীক্ষা চালিয়ে সবগুলোতেই একই সিদ্ধান্ত এসেছে—ভিডিওটি এআই দ্বারা নির্মিত নয়।

তবে ভিডিওটির কিছু অংশে একটি বিভ্রান্তিকর বিষয় লক্ষ্য করা গেছে। নির্দিষ্ট কয়েকটি ফ্রেমে ফয়সালের থুতনিতে থাকা দাড়ি অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখা যায়। এ বিষয়ে দ্য ডিসেন্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি ভিডিও ধারণের সময় কোনো ফিল্টার সক্রিয় থাকার কারণে সৃষ্ট ভিজ্যুয়াল গ্লিচ হতে পারে। বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত অনেক ফিল্টারেই এআই প্রযুক্তির সংযোজন থাকায় এমন ত্রুটি দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে এই একটি কারণে পুরো ভিডিওকে কৃত্রিম বা সাজানো বলে দাবি করার সুযোগ নেই বলে মত দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ভিডিওতে ফয়সাল করিম মাসুদ দাবি করেছেন, তিনি বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। তবে দ্য ডিসেন্ট জানায়, কেবল ভিডিও বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে তার অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ভিডিওতে বা অন্য কোনো মাধ্যমে তিনি দুবাইয়ে থাকার পক্ষে দৃশ্যমান কিংবা প্রামাণ্য কোনো তথ্য উপস্থাপন করেননি।

বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, ভিডিওতে ফয়সাল অন্তত একটি প্রমাণিত মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ওসমান হাদিকে হত্যার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। অথচ দ্য ডিসেন্টের আগের অনুসন্ধান এবং পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে স্পষ্টভাবে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে গুলিবর্ষণকারী ব্যক্তি ছিলেন ফয়সাল করিম মাসুদ এবং বাইকটি চালাচ্ছিলেন তার সহযোগী আলমগীর শেখ। এই তথ্য দেশের শীর্ষস্থানীয় একাধিক গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।

এ ছাড়া ভিডিওতে ফয়সাল অভিযোগ করেন, অর্থ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দুটি কাজ তদবিরের মাধ্যমে পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওসমান হাদি তার কাছ থেকে আগাম পাঁচ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে দ্য ডিসেন্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, হাদির মৃত্যুর পর এ ধরনের অভিযোগ যাচাই বা প্রমাণ করা কার্যত অসম্ভব। তাছাড়া, তার বিরুদ্ধে এর আগে কখনো তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠেনি। বরং তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনিয়মের বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার ছিলেন। সে কারণে মৃত্যুর পর উত্থাপিত এমন অভিযোগকে সন্দেহের চোখে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

সবশেষে দ্য ডিসেন্ট জানায়, ভাইরাল ভিডিওটি বাস্তব হলেও এতে উত্থাপিত সব দাবি যে সত্য—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং কিছু বক্তব্য ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত তথ্য ও চলমান তদন্তের ফলাফলের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন ভিডিও দেখার ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বরং যাচাইকৃত তথ্য ও প্রমাণের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”