ঢাকা ০৯:৪৩ , Tue, ০৬ Oct ২০২৬

ঢাকার ফার্মেসি থেকে হার্ভার্ডে ক্যানসার গবেষণা, মিনা আক্তারের গবেষণার পথচলা

মিরাজ রহমান
  • প্রকাশঃ ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১:৩৮
  • / 2
ফার্মেসি থেকে ক্যানসার ও রেডিয়েশন গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী গবেষক মিনা আক্তার। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি পড়ার সময় মিনা আক্তার হয়তো ভাবেননি, একদিন তাঁর গবেষণার পথ পৌঁছে যাবে ক্যানসার চিকিৎসা ও রেডিয়েশন বিজ্ঞানের জটিল এক পরিসরে। তখন বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ ছিল, কিন্তু ভবিষ্যতের পথ ছিল অনির্দিষ্ট। গবেষণার সঙ্গে পরিচয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে সেই ভাবনাও।

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিয়ে সাউথ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসে সম্পূর্ণ অর্থায়িত মাস্টার্স। এরপর জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটিতে রেডিয়েশন অনকোলজি ও মলিকিউলার রেডিয়েশন সায়েন্সেস নিয়ে গবেষণা। আর এখন হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল থেরাপি নিয়ে গবেষণার নতুন অধ্যায়ে মিনা।

মিনা আক্তারের একাডেমিক যাত্রা শুরু ঢাকার প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগে। স্নাতক পর্যায়ে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ থাকলেও গবেষণাকে পেশাগত ভবিষ্যতের কেন্দ্র হিসেবে তখনও নির্দিষ্ট করে ভাবেননি তিনি।

গবেষণার সঙ্গে পরিচয় বাড়ার পর বিষয়টি বদলে যায়। এমন প্রশ্ন, যার উত্তর সহজে পাওয়া যায় না, সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সুযোগই তাঁকে গবেষণার দিকে টেনে নেয়। এই কৌতূহল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার পরবর্তী অধ্যায়ের শুরু।

সাউথ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসে সম্পূর্ণ অর্থায়িত মাস্টার্সে ভর্তি হন মিনা। সেখানে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ফল ও সবজিতে পাওয়া একটি প্রাকৃতিক যৌগ, ২,৩,৪-ট্রাইহাইড্রক্সিবেনজোয়িক অ্যাসিড। কোলন ও স্তন ক্যানসারের কোষে এই যৌগের প্রভাব নিয়ে কাজ করেন তিনি।

গবেষণার মাধ্যমে ক্যানসার কোষের অনিয়ন্ত্রিত বিভাজন ও বৃদ্ধির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করা হয়। দীর্ঘ সময় গবেষণাগারে কাজ করতে গিয়ে পরীক্ষামূলক গবেষণার দক্ষতার পাশাপাশি নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, যোগাযোগ তৈরি করা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।

মাস্টার্স শেষ করার পর মিনা আক্তারের গবেষণার ক্ষেত্র আরও নির্দিষ্ট হয়ে আসে। তিনি কাজের সুযোগ পান জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির রেডিয়েশন অনকোলজি ও মলিকিউলার রেডিয়েশন সায়েন্সেস বিভাগে।

সেখানে তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল প্রোটন ফ্ল্যাশ রেডিওথেরাপি। এটি অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার গতিতে রেডিয়েশন প্রয়োগের একটি গবেষণাধর্মী পদ্ধতি, যার অন্যতম লক্ষ্য ক্যানসার কোষে চিকিৎসার প্রভাব বজায় রেখে সুস্থ টিস্যুর ক্ষতি কমানোর সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা।

বিশেষ করে শিশুদের মস্তিষ্কের ক্যানসারের ক্ষেত্রে রেডিয়েশন চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে কাজ করেন মিনা। প্রাক-ক্লিনিক্যাল মাউস মডেলে পুরো মস্তিষ্কে রেডিয়েশন প্রয়োগ করে স্মৃতি ও শেখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়। একই সঙ্গে মস্তিষ্কের রোগ প্রতিরোধী কোষ মাইক্রোগ্লিয়ার প্রতিক্রিয়াও বিশ্লেষণ করা হয়।

২০২৬ সালে প্রকাশিত জনস হপকিন্সের একটি গবেষণা-সারাংশে মিনা আক্তারসহ গবেষকদের কাজের ফল তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের প্রোটন ফ্ল্যাশ রেডিওথেরাপি প্রয়োগের পর স্মৃতি ও মাইক্রোগ্লিয়ার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়।

এই গবেষণার আরেকটি সংস্করণ প্রিপ্রিন্ট হিসেবেও প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে গবেষকেরা শিশুদের মস্তিষ্কের টিউমারের চিকিৎসায় প্রোটন ফ্ল্যাশ রেডিওথেরাপির সম্ভাব্য প্রয়োগ এবং স্বাভাবিক মস্তিষ্কের টিস্যু রক্ষার বিষয়টি নিয়ে গবেষণার ফল উপস্থাপন করেছেন। প্রিপ্রিন্টটি এখনো সমকক্ষ বিশেষজ্ঞদের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যায়নি।

জনস হপকিন্সে থাকাকালে নিজের গবেষণা উপস্থাপনের সুযোগও পান মিনা। তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক পেডিয়াট্রিক নিউরো-অনকোলজি গবেষণার পরিসরেও স্থান পেয়েছে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত তাঁর নাম প্রকাশিত হয়েছে Neuro-Oncology Pediatrics জার্নালের ২০২৬ সালের একটি গবেষণা-সারাংশে।

জনস হপকিন্সের অভিজ্ঞতার পর রেডিয়েশন বায়োলজি নিয়ে তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়। ২০২৬ সালের আগস্টে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে বার্টোলেট ল্যাবে গবেষণা প্রযুক্তিবিদ হিসেবে নতুন দায়িত্ব শুরু করেন মিনা।

বর্তমান গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল থেরাপি। এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বহনকারী ওষুধ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষকে লক্ষ্য করার চেষ্টা করা হয়। গবেষণার ক্ষেত্রে তাই শুধু ওষুধের পরিমাণ নয়, শরীরের কোন অংশে কতটা রেডিয়েশন পৌঁছাচ্ছে এবং ক্যানসার কোষ ও সুস্থ টিস্যু সেই রেডিয়েশনের প্রতি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

এই ধরনের গবেষণার বড় লক্ষ্যগুলোর একটি হলো চিকিৎসাকে আরও নির্দিষ্ট করে তোলা। একই মাত্রার রেডিয়েশন সবার শরীরে একই ধরনের প্রভাব ফেলবে না। ফলে রেডিয়েশনের মাত্রা, শরীরে তার বণ্টন এবং কোষের জৈবিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সম্পর্ক বোঝা ভবিষ্যতের আরও লক্ষ্যভিত্তিক ক্যানসার চিকিৎসার গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

মিনার যাত্রাপথের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তাঁর ক্যারিয়ার কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসরণ করে তৈরি হয়নি। ফার্মেসির শিক্ষার্থী হিসেবে শুরু করা যাত্রা তাঁকে প্রথমে ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে রেডিয়েশন অনকোলজি, এরপর রেডিয়েশন বায়োলজি এবং এখন রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল থেরাপি।

প্রতিটি ধাপ পরের ধাপের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। গবেষণার বিষয় বদলেছে, কিন্তু মূল আগ্রহটি থেকে গেছে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যে।

নিজের এই পথচলায় পরিবার, শিক্ষক, পরামর্শদাতা ও সহকর্মীদের অবদানকে গুরুত্ব দেন মিনা। বিশেষ করে বাবা-মা, মামা এবং গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে যাঁরা তাঁকে সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি। প্রয়াত মা ও বোনকেও স্মরণ করেন গভীর ভালোবাসায়।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগারে কাজ করলেও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কটি তাঁর কাছে আলাদা। সামনে ক্যানসার ও রেডিয়েশন বায়োলজিতে আরও গভীরভাবে কাজ করার পাশাপাশি দেশে বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ বাড়াতে অবদান রাখার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।

একজন ফার্মেসি শিক্ষার্থীর গবেষণার প্রতি তৈরি হওয়া কৌতূহল ধীরে ধীরে তাঁকে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে। প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটির শ্রেণিকক্ষ থেকে সাউথ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণাগার, সেখান থেকে জনস হপকিন্স এবং এখন হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতাল।

মিনার গল্প কোনো একদিনের সাফল্যের গল্প নয়। এটি কৌতূহল থেকে গবেষণা, গবেষণা থেকে দক্ষতা এবং এক অভিজ্ঞতা থেকে পরবর্তী সুযোগ তৈরির ধারাবাহিক পথচলা। সেই পথেই বাংলাদেশের একজন ফার্মেসি শিক্ষার্থী এখন ক্যানসার চিকিৎসা ও রেডিয়েশন গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের পেশাগত পরিচয় তৈরি করছেন।

❤️
👏
🙂
😞

ঢাকার ফার্মেসি থেকে হার্ভার্ডে ক্যানসার গবেষণা, মিনা আক্তারের গবেষণার পথচলা

প্রকাশঃ ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১:৩৮

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি পড়ার সময় মিনা আক্তার হয়তো ভাবেননি, একদিন তাঁর গবেষণার পথ পৌঁছে যাবে ক্যানসার চিকিৎসা ও রেডিয়েশন বিজ্ঞানের জটিল এক পরিসরে। তখন বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ ছিল, কিন্তু ভবিষ্যতের পথ ছিল অনির্দিষ্ট। গবেষণার সঙ্গে পরিচয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে সেই ভাবনাও।

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিয়ে সাউথ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসে সম্পূর্ণ অর্থায়িত মাস্টার্স। এরপর জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটিতে রেডিয়েশন অনকোলজি ও মলিকিউলার রেডিয়েশন সায়েন্সেস নিয়ে গবেষণা। আর এখন হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল থেরাপি নিয়ে গবেষণার নতুন অধ্যায়ে মিনা।

মিনা আক্তারের একাডেমিক যাত্রা শুরু ঢাকার প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগে। স্নাতক পর্যায়ে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ থাকলেও গবেষণাকে পেশাগত ভবিষ্যতের কেন্দ্র হিসেবে তখনও নির্দিষ্ট করে ভাবেননি তিনি।

গবেষণার সঙ্গে পরিচয় বাড়ার পর বিষয়টি বদলে যায়। এমন প্রশ্ন, যার উত্তর সহজে পাওয়া যায় না, সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সুযোগই তাঁকে গবেষণার দিকে টেনে নেয়। এই কৌতূহল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার পরবর্তী অধ্যায়ের শুরু।

সাউথ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসে সম্পূর্ণ অর্থায়িত মাস্টার্সে ভর্তি হন মিনা। সেখানে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ফল ও সবজিতে পাওয়া একটি প্রাকৃতিক যৌগ, ২,৩,৪-ট্রাইহাইড্রক্সিবেনজোয়িক অ্যাসিড। কোলন ও স্তন ক্যানসারের কোষে এই যৌগের প্রভাব নিয়ে কাজ করেন তিনি।

গবেষণার মাধ্যমে ক্যানসার কোষের অনিয়ন্ত্রিত বিভাজন ও বৃদ্ধির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করা হয়। দীর্ঘ সময় গবেষণাগারে কাজ করতে গিয়ে পরীক্ষামূলক গবেষণার দক্ষতার পাশাপাশি নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, যোগাযোগ তৈরি করা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।

মাস্টার্স শেষ করার পর মিনা আক্তারের গবেষণার ক্ষেত্র আরও নির্দিষ্ট হয়ে আসে। তিনি কাজের সুযোগ পান জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির রেডিয়েশন অনকোলজি ও মলিকিউলার রেডিয়েশন সায়েন্সেস বিভাগে।

সেখানে তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল প্রোটন ফ্ল্যাশ রেডিওথেরাপি। এটি অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার গতিতে রেডিয়েশন প্রয়োগের একটি গবেষণাধর্মী পদ্ধতি, যার অন্যতম লক্ষ্য ক্যানসার কোষে চিকিৎসার প্রভাব বজায় রেখে সুস্থ টিস্যুর ক্ষতি কমানোর সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা।

বিশেষ করে শিশুদের মস্তিষ্কের ক্যানসারের ক্ষেত্রে রেডিয়েশন চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে কাজ করেন মিনা। প্রাক-ক্লিনিক্যাল মাউস মডেলে পুরো মস্তিষ্কে রেডিয়েশন প্রয়োগ করে স্মৃতি ও শেখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়। একই সঙ্গে মস্তিষ্কের রোগ প্রতিরোধী কোষ মাইক্রোগ্লিয়ার প্রতিক্রিয়াও বিশ্লেষণ করা হয়।

২০২৬ সালে প্রকাশিত জনস হপকিন্সের একটি গবেষণা-সারাংশে মিনা আক্তারসহ গবেষকদের কাজের ফল তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের প্রোটন ফ্ল্যাশ রেডিওথেরাপি প্রয়োগের পর স্মৃতি ও মাইক্রোগ্লিয়ার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়।

এই গবেষণার আরেকটি সংস্করণ প্রিপ্রিন্ট হিসেবেও প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে গবেষকেরা শিশুদের মস্তিষ্কের টিউমারের চিকিৎসায় প্রোটন ফ্ল্যাশ রেডিওথেরাপির সম্ভাব্য প্রয়োগ এবং স্বাভাবিক মস্তিষ্কের টিস্যু রক্ষার বিষয়টি নিয়ে গবেষণার ফল উপস্থাপন করেছেন। প্রিপ্রিন্টটি এখনো সমকক্ষ বিশেষজ্ঞদের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যায়নি।

জনস হপকিন্সে থাকাকালে নিজের গবেষণা উপস্থাপনের সুযোগও পান মিনা। তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক পেডিয়াট্রিক নিউরো-অনকোলজি গবেষণার পরিসরেও স্থান পেয়েছে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত তাঁর নাম প্রকাশিত হয়েছে Neuro-Oncology Pediatrics জার্নালের ২০২৬ সালের একটি গবেষণা-সারাংশে।

জনস হপকিন্সের অভিজ্ঞতার পর রেডিয়েশন বায়োলজি নিয়ে তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়। ২০২৬ সালের আগস্টে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে বার্টোলেট ল্যাবে গবেষণা প্রযুক্তিবিদ হিসেবে নতুন দায়িত্ব শুরু করেন মিনা।

বর্তমান গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল থেরাপি। এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বহনকারী ওষুধ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষকে লক্ষ্য করার চেষ্টা করা হয়। গবেষণার ক্ষেত্রে তাই শুধু ওষুধের পরিমাণ নয়, শরীরের কোন অংশে কতটা রেডিয়েশন পৌঁছাচ্ছে এবং ক্যানসার কোষ ও সুস্থ টিস্যু সেই রেডিয়েশনের প্রতি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

এই ধরনের গবেষণার বড় লক্ষ্যগুলোর একটি হলো চিকিৎসাকে আরও নির্দিষ্ট করে তোলা। একই মাত্রার রেডিয়েশন সবার শরীরে একই ধরনের প্রভাব ফেলবে না। ফলে রেডিয়েশনের মাত্রা, শরীরে তার বণ্টন এবং কোষের জৈবিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সম্পর্ক বোঝা ভবিষ্যতের আরও লক্ষ্যভিত্তিক ক্যানসার চিকিৎসার গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

মিনার যাত্রাপথের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তাঁর ক্যারিয়ার কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসরণ করে তৈরি হয়নি। ফার্মেসির শিক্ষার্থী হিসেবে শুরু করা যাত্রা তাঁকে প্রথমে ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে রেডিয়েশন অনকোলজি, এরপর রেডিয়েশন বায়োলজি এবং এখন রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল থেরাপি।

প্রতিটি ধাপ পরের ধাপের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। গবেষণার বিষয় বদলেছে, কিন্তু মূল আগ্রহটি থেকে গেছে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যে।

নিজের এই পথচলায় পরিবার, শিক্ষক, পরামর্শদাতা ও সহকর্মীদের অবদানকে গুরুত্ব দেন মিনা। বিশেষ করে বাবা-মা, মামা এবং গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে যাঁরা তাঁকে সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি। প্রয়াত মা ও বোনকেও স্মরণ করেন গভীর ভালোবাসায়।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগারে কাজ করলেও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কটি তাঁর কাছে আলাদা। সামনে ক্যানসার ও রেডিয়েশন বায়োলজিতে আরও গভীরভাবে কাজ করার পাশাপাশি দেশে বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ বাড়াতে অবদান রাখার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।

একজন ফার্মেসি শিক্ষার্থীর গবেষণার প্রতি তৈরি হওয়া কৌতূহল ধীরে ধীরে তাঁকে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে। প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটির শ্রেণিকক্ষ থেকে সাউথ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণাগার, সেখান থেকে জনস হপকিন্স এবং এখন হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতাল।

মিনার গল্প কোনো একদিনের সাফল্যের গল্প নয়। এটি কৌতূহল থেকে গবেষণা, গবেষণা থেকে দক্ষতা এবং এক অভিজ্ঞতা থেকে পরবর্তী সুযোগ তৈরির ধারাবাহিক পথচলা। সেই পথেই বাংলাদেশের একজন ফার্মেসি শিক্ষার্থী এখন ক্যানসার চিকিৎসা ও রেডিয়েশন গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের পেশাগত পরিচয় তৈরি করছেন।