ঢাকা ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘সাবঅলটার্ন’ কে? ক্ষমতায় পৌঁছালে কি হারিয়ে যায় প্রান্তিকের পরিচয়

এস এম রেজাউল করিম
  • প্রকাশঃ ০১:২১:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
  • / 3

গ্রাফিক্স: প্রজন্ম কথা


মানুষের জীবনকে ব্যাখ্যা করার জন্য বিভিন্ন সংস্কৃতিতে নানা রকম রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। এমনই একটি প্রবাদ বলে, বেঁচে থাকা মানেই ধীরে ধীরে সেদ্ধ হওয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীর যেমন পরিবর্তিত হয়, তেমনি পরিবর্তিত হয় মানুষের সামাজিক অবস্থান, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং পরিচয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষের প্রান্তিকতা বা ‘সাবঅলটার্ন’ পরিচয়ও কি একইভাবে মাপা যায়? একজন মানুষ কতটা দরিদ্র, কতটা বঞ্চিত, কিংবা কতটা প্রান্তিক, তার কি কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড আছে?

এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় সাবঅলটার্ন তত্ত্বের অন্যতম জটিল বিতর্ক। ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছে যাওয়ার পরও কি কেউ প্রান্তিক থাকে, নাকি সেই মুহূর্তেই সে ক্ষমতার কাঠামোর অংশ হয়ে যায়?

প্রান্তিকতা থেকে ক্ষমতায়

বাংলা চলচ্চিত্রে বহুদিন ধরেই একটি পরিচিত গল্প দেখা যায়। দরিদ্র বাবা, যিনি হয়তো ভ্যানচালক বা কুলি, নিজের সন্তানের পড়াশোনার জন্য জীবনভর সংগ্রাম করেন। সন্তান উচ্চশিক্ষিত হয়ে সমাজের উঁচু স্তরে প্রবেশ করে, ধনী পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং একসময় নিজের শিকড়কেই অস্বীকার করতে শুরু করে।

বাহ্যিকভাবে এটি পিতৃভক্তির সংকট মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সামাজিক গতিশীলতার একটি নির্মম বাস্তবতা। দরিদ্র পিতার স্বপ্ন ছিল তার সন্তান এমন অবস্থানে পৌঁছাবে, যেখানে সমাজের ক্ষমতাবানদের কাতারে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু সেই অবস্থানে পৌঁছানোর জন্যই হয়তো তাকে নিজের অতীত থেকে দূরে সরে যেতে হয়। প্রশ্ন হলো, এই মানুষটি তখন কে? সে কি এখনও প্রান্তিক সমাজের প্রতিনিধি, নাকি সে ক্ষমতার নতুন মুখ?

পরিচয়ের দ্বন্দ্ব

সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন কেউ নিজের প্রান্তিক পরিচয়কে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তিনি হয়তো ক্ষমতার কেন্দ্রের অংশ, কিন্তু প্রয়োজন হলে নিজের শ্রমজীবী বা দরিদ্র পটভূমির কথা তুলে ধরে সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায় করেন।

এমন ব্যক্তিরা এক ধরনের দ্বৈত অবস্থানে থাকেন। অভিজাত সমাজে তারা পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নন, আবার প্রান্তিক মানুষের বাস্তব জীবন থেকেও অনেক দূরে সরে গেছেন। ফলে তাদের পরিচয় হয়ে ওঠে এক ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক ধূসর অঞ্চল।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে এমন রাজনৈতিক নেতা, আমলা কিংবা ব্যবসায়ী দেখা যায়, যারা নিজেদের দরিদ্র অতীতের গল্প নিয়মিত তুলে ধরেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সেই অতীতের স্মৃতি কি সত্যিই তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করে, নাকি সেটি কেবল জনমত তৈরির কৌশল?

সাবঅলটার্ন তত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, “প্রান্তিক মানুষ কি নিজের কথা নিজে বলতে পারে?” ভারতীয় বুদ্ধিজীবী গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক এই প্রশ্নকে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন। তার যুক্তি ছিল, যখনই কোনো প্রান্তিক মানুষ ক্ষমতার ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন, তখন তিনি আর আগের অর্থে সাবঅলটার্ন থাকেন না। কারণ ক্ষমতার কাঠামোতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তার কণ্ঠস্বরও পরিবর্তিত হয়।

তবে এই যুক্তিরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদি একজন দরিদ্র কৃষকের সন্তান সংসদ সদস্য হন, কিংবা একজন গৃহকর্মীর মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন, তাহলে কি তাদের অতীতের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যায়? নাকি সেই অভিজ্ঞতা নতুনভাবে সমাজকে বোঝার সুযোগ তৈরি করে?

শোষণ কেবল ক্ষমতাবানদের হাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ইতিহাস দেখায়, বহু সময় প্রান্তিক মানুষের পক্ষের রাজনীতি করা ব্যক্তিরাও পরবর্তীতে শোষণের অংশ হয়ে উঠেছেন।

শ্রমিকদের দুর্বলতা, ভয় এবং সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে ভালো বোঝেন অনেক সময় সেই মানুষরাই, যারা একসময় শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে ক্ষমতার কাঠামো তাদের ব্যবহার করে আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

এখানেই সাবঅলটার্ন রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট। প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে অনেকেই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতারই প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন।

শ্রেণি প্রশ্নের মতোই নারীর অধিকারও বহু সময় রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ইতিহাস বলে, নারীর মৌলিক অধিকার কোনো সমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেয়নি। ভোটাধিকার থেকে শুরু করে সম্পত্তির অধিকার পর্যন্ত প্রতিটি অর্জনের পেছনে দীর্ঘ সংগ্রাম রয়েছে।

বাংলাদেশের সমাজেও নারীরা এখনও নানা ধরনের বৈষম্যের মুখোমুখি হন। আইনগতভাবে সম্পত্তির অধিকার থাকলেও বাস্তবে অনেক নারী উত্তরাধিকার দাবি করলে সামাজিক চাপে পড়েন। বিধবা নারীর পুনর্বিবাহ, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কিংবা অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিয়ে এখনও নানা ধরনের সামাজিক বাধা বিদ্যমান।

এই বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক স্লোগান বা জাতীয়তাবাদী বক্তব্য সবসময় প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি সবচেয়ে নীরব এবং অদৃশ্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা বলা হয়, তাহলে গৃহশ্রমিক শিশুদের নাম সামনে আসে।

তাদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবার থেকে আসে। তারা অন্যের বাড়িতে কাজ করে, দীর্ঘ সময় শ্রম দেয়, কিন্তু তাদের জীবন সম্পর্কে খুব কমই আলোচনা হয়। শ্রমিক সংগঠন নেই, সামাজিক প্রভাব নেই, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নেই।

তাদের অনেকেই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, নির্যাতনের শিকার হয় এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগও পায় না। সাবঅলটার্ন তত্ত্বের ভাষায় বলতে গেলে, তারা এমন একটি শ্রেণি, যাদের কণ্ঠস্বর সমাজের মূলধারায় পৌঁছায় না।

প্রশ্ন হলো, একজন মানুষ ক্ষমতায় গেলে কি তার প্রান্তিক পরিচয় শেষ হয়ে যায়? এর সহজ উত্তর নেই। ইতিহাসে এমন মানুষ আছেন, যারা ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের শিকড় ভুলে গেছেন। আবার এমন মানুষও আছেন, যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কাজ করেছেন।

তাই কাউকে বিচার করার একমাত্র উপায় তার জন্মপরিচয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি ক্ষমতা পাওয়ার পর কাদের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন, কার কথা বলছেন এবং কাদের স্বার্থ রক্ষা করছেন। সাবঅলটার্ন পরিচয় কোনো স্থির অবস্থা নয়; এটি একটি চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। একজন মানুষ দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েও ক্ষমতার অংশ হতে পারেন, আবার ক্ষমতার ভেতরে থেকেও প্রান্তিক মানুষের পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন।

প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কার কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে এবং কার কণ্ঠস্বর এখনও চাপা পড়ে আছে। বাংলাদেশের গৃহশ্রমিক শিশু, অভিবাসী শ্রমিক, নির্যাতিত নারী কিংবা সমাজের অন্যান্য প্রান্তিক মানুষদের বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিনিধিত্বের বিতর্কের বাইরে এখনও এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের কথা কেউ শোনে না। সাবঅলটার্নকে বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় তাই তত্ত্ব নয়, বরং সেই মানুষদের দিকে তাকানো, যাদের জীবন এখনও ক্ষমতার আলো থেকে অনেক দূরে রয়ে গেছে।

শেয়ার করুন

‘সাবঅলটার্ন’ কে? ক্ষমতায় পৌঁছালে কি হারিয়ে যায় প্রান্তিকের পরিচয়

প্রকাশঃ ০১:২১:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

গ্রাফিক্স: প্রজন্ম কথা


মানুষের জীবনকে ব্যাখ্যা করার জন্য বিভিন্ন সংস্কৃতিতে নানা রকম রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। এমনই একটি প্রবাদ বলে, বেঁচে থাকা মানেই ধীরে ধীরে সেদ্ধ হওয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীর যেমন পরিবর্তিত হয়, তেমনি পরিবর্তিত হয় মানুষের সামাজিক অবস্থান, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং পরিচয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষের প্রান্তিকতা বা ‘সাবঅলটার্ন’ পরিচয়ও কি একইভাবে মাপা যায়? একজন মানুষ কতটা দরিদ্র, কতটা বঞ্চিত, কিংবা কতটা প্রান্তিক, তার কি কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড আছে?

এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় সাবঅলটার্ন তত্ত্বের অন্যতম জটিল বিতর্ক। ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছে যাওয়ার পরও কি কেউ প্রান্তিক থাকে, নাকি সেই মুহূর্তেই সে ক্ষমতার কাঠামোর অংশ হয়ে যায়?

প্রান্তিকতা থেকে ক্ষমতায়

বাংলা চলচ্চিত্রে বহুদিন ধরেই একটি পরিচিত গল্প দেখা যায়। দরিদ্র বাবা, যিনি হয়তো ভ্যানচালক বা কুলি, নিজের সন্তানের পড়াশোনার জন্য জীবনভর সংগ্রাম করেন। সন্তান উচ্চশিক্ষিত হয়ে সমাজের উঁচু স্তরে প্রবেশ করে, ধনী পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং একসময় নিজের শিকড়কেই অস্বীকার করতে শুরু করে।

বাহ্যিকভাবে এটি পিতৃভক্তির সংকট মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সামাজিক গতিশীলতার একটি নির্মম বাস্তবতা। দরিদ্র পিতার স্বপ্ন ছিল তার সন্তান এমন অবস্থানে পৌঁছাবে, যেখানে সমাজের ক্ষমতাবানদের কাতারে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু সেই অবস্থানে পৌঁছানোর জন্যই হয়তো তাকে নিজের অতীত থেকে দূরে সরে যেতে হয়। প্রশ্ন হলো, এই মানুষটি তখন কে? সে কি এখনও প্রান্তিক সমাজের প্রতিনিধি, নাকি সে ক্ষমতার নতুন মুখ?

পরিচয়ের দ্বন্দ্ব

সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন কেউ নিজের প্রান্তিক পরিচয়কে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তিনি হয়তো ক্ষমতার কেন্দ্রের অংশ, কিন্তু প্রয়োজন হলে নিজের শ্রমজীবী বা দরিদ্র পটভূমির কথা তুলে ধরে সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায় করেন।

এমন ব্যক্তিরা এক ধরনের দ্বৈত অবস্থানে থাকেন। অভিজাত সমাজে তারা পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নন, আবার প্রান্তিক মানুষের বাস্তব জীবন থেকেও অনেক দূরে সরে গেছেন। ফলে তাদের পরিচয় হয়ে ওঠে এক ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক ধূসর অঞ্চল।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে এমন রাজনৈতিক নেতা, আমলা কিংবা ব্যবসায়ী দেখা যায়, যারা নিজেদের দরিদ্র অতীতের গল্প নিয়মিত তুলে ধরেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সেই অতীতের স্মৃতি কি সত্যিই তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করে, নাকি সেটি কেবল জনমত তৈরির কৌশল?

সাবঅলটার্ন তত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, “প্রান্তিক মানুষ কি নিজের কথা নিজে বলতে পারে?” ভারতীয় বুদ্ধিজীবী গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক এই প্রশ্নকে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন। তার যুক্তি ছিল, যখনই কোনো প্রান্তিক মানুষ ক্ষমতার ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন, তখন তিনি আর আগের অর্থে সাবঅলটার্ন থাকেন না। কারণ ক্ষমতার কাঠামোতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তার কণ্ঠস্বরও পরিবর্তিত হয়।

তবে এই যুক্তিরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদি একজন দরিদ্র কৃষকের সন্তান সংসদ সদস্য হন, কিংবা একজন গৃহকর্মীর মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন, তাহলে কি তাদের অতীতের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যায়? নাকি সেই অভিজ্ঞতা নতুনভাবে সমাজকে বোঝার সুযোগ তৈরি করে?

শোষণ কেবল ক্ষমতাবানদের হাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ইতিহাস দেখায়, বহু সময় প্রান্তিক মানুষের পক্ষের রাজনীতি করা ব্যক্তিরাও পরবর্তীতে শোষণের অংশ হয়ে উঠেছেন।

শ্রমিকদের দুর্বলতা, ভয় এবং সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে ভালো বোঝেন অনেক সময় সেই মানুষরাই, যারা একসময় শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে ক্ষমতার কাঠামো তাদের ব্যবহার করে আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

এখানেই সাবঅলটার্ন রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট। প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে অনেকেই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতারই প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন।

শ্রেণি প্রশ্নের মতোই নারীর অধিকারও বহু সময় রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ইতিহাস বলে, নারীর মৌলিক অধিকার কোনো সমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেয়নি। ভোটাধিকার থেকে শুরু করে সম্পত্তির অধিকার পর্যন্ত প্রতিটি অর্জনের পেছনে দীর্ঘ সংগ্রাম রয়েছে।

বাংলাদেশের সমাজেও নারীরা এখনও নানা ধরনের বৈষম্যের মুখোমুখি হন। আইনগতভাবে সম্পত্তির অধিকার থাকলেও বাস্তবে অনেক নারী উত্তরাধিকার দাবি করলে সামাজিক চাপে পড়েন। বিধবা নারীর পুনর্বিবাহ, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কিংবা অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিয়ে এখনও নানা ধরনের সামাজিক বাধা বিদ্যমান।

এই বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক স্লোগান বা জাতীয়তাবাদী বক্তব্য সবসময় প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি সবচেয়ে নীরব এবং অদৃশ্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা বলা হয়, তাহলে গৃহশ্রমিক শিশুদের নাম সামনে আসে।

তাদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবার থেকে আসে। তারা অন্যের বাড়িতে কাজ করে, দীর্ঘ সময় শ্রম দেয়, কিন্তু তাদের জীবন সম্পর্কে খুব কমই আলোচনা হয়। শ্রমিক সংগঠন নেই, সামাজিক প্রভাব নেই, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নেই।

তাদের অনেকেই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, নির্যাতনের শিকার হয় এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগও পায় না। সাবঅলটার্ন তত্ত্বের ভাষায় বলতে গেলে, তারা এমন একটি শ্রেণি, যাদের কণ্ঠস্বর সমাজের মূলধারায় পৌঁছায় না।

প্রশ্ন হলো, একজন মানুষ ক্ষমতায় গেলে কি তার প্রান্তিক পরিচয় শেষ হয়ে যায়? এর সহজ উত্তর নেই। ইতিহাসে এমন মানুষ আছেন, যারা ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের শিকড় ভুলে গেছেন। আবার এমন মানুষও আছেন, যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কাজ করেছেন।

তাই কাউকে বিচার করার একমাত্র উপায় তার জন্মপরিচয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি ক্ষমতা পাওয়ার পর কাদের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন, কার কথা বলছেন এবং কাদের স্বার্থ রক্ষা করছেন। সাবঅলটার্ন পরিচয় কোনো স্থির অবস্থা নয়; এটি একটি চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। একজন মানুষ দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েও ক্ষমতার অংশ হতে পারেন, আবার ক্ষমতার ভেতরে থেকেও প্রান্তিক মানুষের পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন।

প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কার কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে এবং কার কণ্ঠস্বর এখনও চাপা পড়ে আছে। বাংলাদেশের গৃহশ্রমিক শিশু, অভিবাসী শ্রমিক, নির্যাতিত নারী কিংবা সমাজের অন্যান্য প্রান্তিক মানুষদের বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিনিধিত্বের বিতর্কের বাইরে এখনও এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের কথা কেউ শোনে না। সাবঅলটার্নকে বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় তাই তত্ত্ব নয়, বরং সেই মানুষদের দিকে তাকানো, যাদের জীবন এখনও ক্ষমতার আলো থেকে অনেক দূরে রয়ে গেছে।