যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের ৮০–৯০ শতাংশই সিলেটি বংশোদ্ভূত, সংখ্যায় ৬ লাখের বেশি
- প্রকাশঃ ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ২০:১২
- / 4
যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠই সিলেটি বংশোদ্ভূত। সরকারি আদমশুমারির তথ্য ও বিভিন্ন গবেষণার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষের পারিবারিক শিকড় সিলেট অঞ্চলে। সেই হিসাবে বর্তমানে দেশটিতে সিলেটি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ৫ থেকে ৬ লাখ।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশি জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার। স্কটল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী যুক্ত করলে এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। অভিবাসন গবেষকদের মতে, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের অধিকাংশের পূর্বপুরুষ কয়েক দশক আগে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা থেকে সেখানে অভিবাসন করেন।
গবেষণা অনুযায়ী, উনিশ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ জাহাজে কর্মরত সিলেটি নাবিকদের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে সিলেটিদের আগমন শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় অভিবাসনের ধারা দ্রুত বাড়ে। পরে পরিবার পুনর্মিলন কর্মসূচির আওতায় স্ত্রী-সন্তানদের যুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে সেখানে একটি স্থায়ী সিলেটি কমিউনিটির বিকাশ ঘটে, যা বর্তমানে ব্রিটিশ বাংলাদেশি সমাজের সবচেয়ে বড় অংশ।
যুক্তরাজ্যে সিলেটিদের সবচেয়ে বড় আবাসস্থল পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস। ব্রিক লেন, হোয়াইটচ্যাপেল, বেথনাল গ্রিনসহ আশপাশের এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এছাড়া নিউহ্যাম, রেডব্রিজ, লুটন, বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার, ওল্ডহ্যাম, লিডস, গ্লাসগোসহ বিভিন্ন শহরেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সিলেটি পরিবার বসবাস করছে।
জনসংখ্যার পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতেও সিলেটি বংশোদ্ভূতদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশটির কারি শিল্প গড়ে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন সিলেটি উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশি মালিকানাধীন অধিকাংশ রেস্তোরাঁ পরিচালনা করেন সিলেটি ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি খুচরা ব্যবসা, পরিবহন, নির্মাণ, সম্পত্তি, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতেও তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে।
রাজনীতিতেও সিলেটি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। স্থানীয় কাউন্সিল, মেয়র পদ, স্কুল গভর্নিং বডি এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্ট পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তারা প্রতিনিধিত্ব করছেন। একই সঙ্গে আইন, চিকিৎসা, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, ব্যাংকিং এবং সরকারি প্রশাসনেও নতুন প্রজন্মের সিলেটিরা নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সিলেটি ভাষা ও সংস্কৃতি এখনও যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। শতাধিক মসজিদ, বাংলা স্কুল, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও আঞ্চলিক সমিতির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে সিলেটি সম্প্রদায়ের ব্যাপক অংশগ্রহণ ব্রিটেনের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে বাংলাদেশি পরিচিতিকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় শ্রমনির্ভর অভিবাসী হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে সিলেটি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি, ব্যবসা, রাজনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছেন। উচ্চশিক্ষা, পেশাগত সাফল্য এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মে এই প্রভাব আরও বিস্তৃত হবে বলেও তারা মনে করেন।



























