গ্রামসির হেজেমনি তত্ত্ব: ক্ষমতা কীভাবে মানুষের ‘সাধারণ বোধ’ হয়ে ওঠে
- প্রকাশঃ ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ১৭:০৭
- / 2
বিশ শতকের প্রথমার্ধের ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসি (Antonio Gramsci, ১৮৯১–১৯৩৭) আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনে ক্ষমতা, সংস্কৃতি ও মতাদর্শের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেন। কারাবন্দি অবস্থায় রচিত তাঁর বিখ্যাত Selections from the Prison Notebooks গ্রন্থে রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, সংস্কৃতি, মতাদর্শ এবং বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নিয়ে তাঁর বিস্তৃত চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়।
গ্রামসির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোর একটি হলো হেজেমনি (Hegemony)। তাঁর মতে, কোনো শাসক শ্রেণি কেবল রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ বা দমন-পীড়নের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে না; জনগণের সম্মতি অর্জন এবং নিজেদের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গিকে সমাজে গ্রহণযোগ্য ও স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, সাহিত্য এবং বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই গ্রামসির চিন্তা শুধু মার্কসবাদী রাজনৈতিক তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক গণতন্ত্র, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক যোগাযোগ, সংস্কৃতি এবং সামাজিক মতামত কীভাবে গড়ে ওঠে—এসব প্রশ্ন বিশ্লেষণেও তাঁর ধারণা গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কসীয় ঐতিহ্য ও গ্রামসির নতুনত্ব
গ্রামসি নিঃসন্দেহে মার্কসীয় চিন্তার উত্তরসূরি। তবে তাঁর বিশ্লেষণে অর্থনৈতিক কাঠামোর পাশাপাশি সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সামাজিক চেতনার স্বায়ত্তশাসিত ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মার্কসীয় ঐতিহ্যে অর্থনৈতিক ভিত্তি ও উপরিকাঠামোর সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও গ্রামসি দেখান, কোনো সামাজিক ব্যবস্থা শুধু অর্থনৈতিক শক্তির কারণে দীর্ঘদিন টিকে থাকে না। বিদ্যমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্মতি। মানুষ যখন কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক ব্যবস্থা, মূল্যবোধ বা রাজনৈতিক ধারণাকে ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অবধারিত’ বলে গ্রহণ করতে শুরু করে, তখন ক্ষমতা আরও গভীর ও স্থায়ী রূপ নেয়।
এখানেই গ্রামসির চিন্তার সঙ্গে গ্যর্গ লুকাচের History and Class Consciousness গ্রন্থে আলোচিত শ্রেণিচেতনার ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ দেখা যায়। লুকাচ শ্রেণির নিজস্ব সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। গ্রামসি দেখান, এই চেতনা কেবল অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয় না; রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডও চেতনা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ফলে গ্রামসি অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদের সরল ব্যাখ্যার পরিবর্তে ক্ষমতার একটি বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ হাজির করেন। অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সমাজে ক্ষমতার বণ্টন ও স্থায়িত্ব ব্যাখ্যা করতে সংস্কৃতি, শিক্ষা, ধর্ম, রাজনীতি ও গণমাধ্যমকেও বিবেচনায় নিতে হয়।
হেজেমনি: সম্মতি ও নেতৃত্বের রাজনীতি
গ্রামসির হেজেমনি তত্ত্বের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো সম্মতি এবং বৌদ্ধিক-নৈতিক নেতৃত্ব। কোনো প্রভাবশালী সামাজিক শ্রেণি যখন নিজেদের স্বার্থ ও বিশ্বদৃষ্টিকে বৃহত্তর সমাজের সাধারণ স্বার্থ ও স্বাভাবিক মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, তখন তার আধিপত্য শুধু দমনমূলক থাকে না; তা সামাজিক সম্মতির ওপরও নির্ভরশীল হয়ে ওঠে।
তবে হেজেমনি বলতে শুধু ‘মানুষকে ভুল বুঝিয়ে শাসন করা’ বোঝায় না। এটি এমন একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে নির্দিষ্ট মূল্যবোধ, ধারণা ও সামাজিক লক্ষ্যকে সাধারণ বোধ বা common sense-এর অংশে পরিণত করা হয়।
এই জায়গায় লুই আলথুসারের Ideological State Apparatuses ধারণার সঙ্গে তুলনা করা যায়। আলথুসার দেখিয়েছেন, শিক্ষা, ধর্ম, পরিবার ও গণমাধ্যমের মতো প্রতিষ্ঠান কীভাবে বিদ্যমান সামাজিক সম্পর্ক ও মতাদর্শ পুনরুৎপাদনে ভূমিকা রাখতে পারে। গ্রামসির বিশ্লেষণে নাগরিক সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলোও সম্মতি নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
তবে গ্রামসির ধারণায় মানুষ নিছক নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়। সমাজের ভেতরে প্রতিদ্বন্দ্বী ধারণা, মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক প্রকল্পও গড়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ হেজেমনি স্থির কোনো অবস্থা নয়; এটি একটি চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের ক্ষেত্র।
এই কারণেই গ্রামসির তত্ত্ব শুধু আধিপত্য বোঝার জন্য নয়, বিকল্প বা পাল্টা হেজেমনি (counter-hegemony) কীভাবে গড়ে উঠতে পারে, সেটিও বোঝার সুযোগ দেয়।
রাষ্ট্র, রাজনৈতিক সমাজ ও নাগরিক সমাজ
গ্রামসির রাষ্ট্রচিন্তায় রাজনৈতিক সমাজ ও নাগরিক সমাজের পার্থক্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক সমাজ (Political Society) বলতে তিনি মূলত রাষ্ট্রের সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বোঝান, যেগুলোর মাধ্যমে আইন, প্রশাসন, নিরাপত্তা ও দমনমূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়।
অন্যদিকে নাগরিক সমাজ (Civil Society) গড়ে ওঠে এমন সব প্রতিষ্ঠান, সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের সমন্বয়ে, যেখানে সামাজিক সম্মতি ও বিশ্বদৃষ্টির নির্মাণ ঘটে। পরিবার, শিক্ষা, ধর্ম, সংবাদমাধ্যম, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান এর অংশ হতে পারে।
গ্রামসির বিশ্লেষণে আধুনিক রাষ্ট্র কেবল পুলিশ, সেনাবাহিনী বা আইনের মাধ্যমে সমাজকে পরিচালনা করে না। সামাজিক সম্মতি অর্জনের ক্ষেত্রটিও রাষ্ট্র ও ক্ষমতার স্থায়িত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে মিশেল ফুকোর ক্ষমতা-বিশ্লেষণের সঙ্গে একটি তুলনামূলক সম্পর্ক তৈরি করা যায়। ফুকো দেখিয়েছেন, আধুনিক ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, জ্ঞানব্যবস্থা, সামাজিক অনুশীলন ও শৃঙ্খলাবোধের মধ্য দিয়েও ক্ষমতা কাজ করে। গ্রামসি ও ফুকোর পদ্ধতি এক নয়, কিন্তু উভয়ের চিন্তাতেই ক্ষমতার দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উভয় মাত্রা বিশ্লেষণের গুরুত্ব রয়েছে।
সাংস্কৃতিক হেজেমনি ও গণমাধ্যম
গ্রামসির হেজেমনি তত্ত্বের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম।
একটি সংবাদমাধ্যম কী খবরকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করবে, কোন ভাষায় কোনো ঘটনা ব্যাখ্যা করবে, কোন ধারণাকে গ্রহণযোগ্য এবং কোনটিকে অস্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করবে—এসব সিদ্ধান্ত জনমত গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে গণমাধ্যমের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সচেতনভাবে কোনো শাসক শ্রেণির নির্দেশ পালন করে। বরং বৃহত্তর সামাজিক মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং পেশাগত রীতিনীতির মধ্য দিয়েও নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেতে পারে।
এই জায়গাতেই গ্রামসির হেজেমনি ধারণা সমকালীন গণমাধ্যম বিশ্লেষণে কার্যকর। কারণ ক্ষমতা কেবল কী বলা হচ্ছে, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; কোন বিষয়কে বলা হচ্ছে, কোন বিষয়কে বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং কোন ভাষায় বলা হচ্ছে—সেটিও ক্ষমতার অংশ।
ডিজিটাল যুগে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অ্যালগরিদম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার এবং ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম মানুষের তথ্য গ্রহণের ধরন বদলে দিয়েছে। ফলে মতাদর্শ ও সামাজিক ‘কমন সেন্স’ নির্মাণের ক্ষেত্রও আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত হয়েছে।
বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা
গ্রামসির রাজনৈতিক দর্শনে বুদ্ধিজীবী (Intellectual) একটি কেন্দ্রীয় ধারণা। তিনি মনে করতেন, সমাজের প্রতিটি শ্রেণি ও সামাজিক গোষ্ঠী নিজেদের অভিজ্ঞতা, স্বার্থ ও বিশ্বদৃষ্টিকে সংগঠিত ও প্রকাশ করার জন্য বুদ্ধিজীবী তৈরি করে।
গ্রামসি সাধারণত দুই ধরনের বুদ্ধিজীবীর কথা বলেন—
প্রচলিত বুদ্ধিজীবী (Traditional Intellectuals): যারা নিজেদেরকে সমাজের নির্দিষ্ট শ্রেণি বা সামাজিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে ও স্বাধীন হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন।
জৈব বুদ্ধিজীবী (Organic Intellectuals): যারা কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণি বা গোষ্ঠীর জীবন, অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং সেই গোষ্ঠীর চিন্তা, ভাষা ও রাজনৈতিক চেতনাকে সংগঠিত করতে ভূমিকা রাখেন।
গ্রামসির বহুল উদ্ধৃত বক্তব্যটি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ:
“All men are intellectuals, but not all men have in society the function of intellectuals.”
অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু সমাজে প্রত্যেকেই বুদ্ধিজীবীর সামাজিক ভূমিকা পালন করেন না।
জৈব বুদ্ধিজীবীর কাজ শুধু কোনো মতাদর্শ প্রচার করা নয়। তিনি একটি সামাজিক গোষ্ঠীর বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতাগুলোকে সংগঠিত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনায় রূপ দিতে পারেন। এ কারণে বুদ্ধিজীবী শুধু জ্ঞান উৎপাদনকারী নন; তিনি সামাজিক চেতনা ও রাজনৈতিক সংগঠনেরও অংশ।
প্রতিরোধ ও বিকল্প হেজেমনি
গ্রামসির রাজনৈতিক চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো War of Position বা অবস্থানের যুদ্ধ। বিশেষ করে পশ্চিমা সমাজে সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের গুরুত্ব তিনি তুলে ধরেন।
এই সংগ্রামের লক্ষ্য শুধু সরকার পরিবর্তন নয়; বরং সমাজের চিন্তা, মূল্যবোধ ও ‘কমন সেন্স’-এর কাঠামোতে পরিবর্তন আনা।
এখানে জৈব বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাকে ভাষা দিতে পারেন, প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে পারেন এবং বিকল্প সামাজিক কল্পনা তৈরি করতে পারেন।
গ্রামসির ১৯১৭ সালের প্রবন্ধ I Hate the Indifferent-এ রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র অবস্থানও দেখা যায়। প্রবন্ধটি La Città Futura-তে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯১৭ প্রকাশিত হয়েছিল।
তিনি সেখানে লিখেছিলেন:
“I hate the indifferent. I believe that living means being partisan.”
এই বক্তব্যকে অবশ্য পরবর্তী সময়ের হেজেমনি তত্ত্বের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা উচিত নয়। এটি ছিল গ্রামসির প্রারম্ভিক রাজনৈতিক লেখার একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান। তবে এতে নাগরিক জীবনে নিষ্ক্রিয়তার পরিবর্তে সক্রিয় অংশগ্রহণের যে গুরুত্ব তিনি দিয়েছিলেন, তা তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগ তৈরি করে।
আজকের ডিজিটাল সমাজে গ্রামসি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গ্রামসির হেজেমনি তত্ত্ব আজ নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারণ বর্তমান সমাজে ক্ষমতা শুধু সংসদ, সরকার বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তথ্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও সামাজিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে, কোন বক্তব্য বেশি দৃশ্যমান হবে, কোন মতামত বারবার পুনরুৎপাদিত হবে এবং কোন বক্তব্য প্রান্তিক হয়ে থাকবে—এসব প্রক্রিয়া মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক উপলব্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে এখানেও একটি সতর্কতা জরুরি। ডিজিটাল মিডিয়াকে কেবল ‘মানুষের চিন্তা নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র’ হিসেবে দেখলে গ্রামসির ধারণার জটিলতা হারিয়ে যায়। একই প্ল্যাটফর্ম যেমন প্রচলিত মতাদর্শকে শক্তিশালী করতে পারে, তেমনি বিকল্প মত, প্রতিবাদ, নতুন সামাজিক পরিচয় এবং পাল্টা হেজেমনি নির্মাণের ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ ডিজিটাল সমাজে হেজেমনি একমুখী নয়। এটি প্রতিনিয়ত নির্মিত, পুনর্নির্মিত এবং চ্যালেঞ্জপ্রাপ্ত হয়।
গ্রামসির হেজেমনি তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে ক্ষমতাকে শুধু রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ, আইন বা অর্থনৈতিক সম্পদের মাধ্যমে বোঝা যথেষ্ট নয়। ক্ষমতা মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ, ভাষা, সংস্কৃতি এবং দৈনন্দিন ‘স্বাভাবিক’ ধারণার মধ্যেও কাজ করে।
এই কারণেই গণমাধ্যম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সমাজে একটি নির্দিষ্ট ধারণা যখন এতটাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে যে সেটিকে আর প্রশ্ন করার প্রয়োজন মনে হয় না, তখন হেজেমনির শক্তি সবচেয়ে গভীরভাবে কাজ করতে পারে।
একই সঙ্গে গ্রামসি আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেন—হেজেমনি অপরিবর্তনীয় নয়। সমাজের ভেতর থেকেই বিকল্প ধারণা, নতুন রাজনৈতিক ভাষা এবং নতুন সামাজিক জোট তৈরি হতে পারে। সেই প্রক্রিয়ায় জৈব বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে তাই গ্রামসিকে পড়ার অর্থ শুধু একটি পুরোনো মার্কসবাদী তত্ত্ব বোঝা নয়। বরং প্রশ্ন তোলা—আমরা যে ধারণাগুলোকে ‘স্বাভাবিক’, ‘সাধারণ বোধ’ বা ‘এটাই বাস্তবতা’ বলে মেনে নিচ্ছি, সেগুলো কীভাবে তৈরি হচ্ছে? কারা সেগুলো তৈরি করছে? কোন প্রতিষ্ঠান সেগুলো পুনরুৎপাদন করছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার মতো বিকল্প চিন্তার ক্ষেত্র আমরা কীভাবে তৈরি করতে পারি?
এই প্রশ্নগুলোই গ্রামসির হেজেমনি তত্ত্বকে সমকালীন সমাজ, রাজনীতি ও গণমাধ্যম বিশ্লেষণে এখনো প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।
- লেখক: ড. সাজিয়া আফরিন, সহকারী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব
























