শরণার্থীশিবির থেকে মার্কিন কংগ্রেসে, মুসলিম নারী ইলহান ওমরের প্রাইমারিতে ৮০% ভোটে জয়
- প্রকাশঃ ১২ অগাস্ট ২০২৬, ১১:০১
- / 2
মিনিয়াপোলিস, ১২ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে শরণার্থীশিবিরে বেড়ে ওঠা ইলহান ওমর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আরও একবার নিজের অবস্থান শক্ত করলেন। মিনেসোটার ৫ম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন তিনি। ফলে আগামী ৩ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে নিজের আসন ধরে রাখার লড়াইয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এই সোমালি-আমেরিকান কংগ্রেস সদস্য।
মিনিয়াপোলিসকেন্দ্রিক এই আসনে ওমরের নির্বাচনী ভিত্তি দীর্ঘদিনের। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে তিনি প্রতিনিধি পরিষদে শপথ নেন। এবার প্রাইমারিতে বড় ব্যবধানে জয় তাঁকে একই আসনে দলের প্রার্থী হিসেবে আবারও মনোনয়ন দিয়েছে।
তবে প্রাইমারির ফল সাধারণ নির্বাচনের ফল নিশ্চিত করে না। আগামী ৩ নভেম্বরের ভোটে আসনটি ধরে রাখতে হলে তাঁকে ভোটারদের চূড়ান্ত রায় পেতে হবে। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনেই ভোট হবে।
ওমরের রাজনৈতিক পথচলার শুরু যুক্তরাষ্ট্রে আসার বহু আগে। সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া ওমর আট বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে কেনিয়ার একটি শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নেন। সেখানে প্রায় চার বছর কাটানোর পর তাঁর পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়। ১৯৯৭ সালে পরিবারটি মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে স্থায়ী হয়।
শরণার্থী হিসেবে কাটানো শৈশব পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর তিনি স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। পরে মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় ও হামফ্রে স্কুল অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের সঙ্গে যুক্ত হন।
২০১৬ সালে মিনেসোটা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ওমর। দুই বছর পর ২০১৮ সালের নির্বাচনে মিনেসোটার ৫ম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে প্রতিনিধি পরিষদে জয় পান। ২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি শপথ নেওয়ার সময় তিনি কংগ্রেসের প্রথম সোমালি-আমেরিকান সদস্য এবং প্রথম দুই মুসলিম-আমেরিকান নারী কংগ্রেস সদস্যের একজন হন।
কংগ্রেসে যাওয়ার পর স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, শ্রমিক অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিভিন্ন বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদের বাজেট কমিটি এবং শিক্ষা ও কর্মশক্তি বিষয়ক কমিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন। কংগ্রেসনাল প্রগ্রেসিভ ককাসের ডেপুটি চেয়ার হিসেবেও দায়িত্বে রয়েছেন।
পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ইস্যুতেও ওমরের অবস্থান তাঁকে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচিত করেছে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং গাজা যুদ্ধসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বিষয়ে ইসরায়েল সরকারের নীতির সমালোচনা করে তিনি প্রগতিশীল ও ফিলিস্তিনপন্থী মহলে সমর্থন পেয়েছেন। একই অবস্থানের কারণে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠী ও রিপাবলিকান রাজনীতিকদের সমালোচনার মুখেও পড়েছেন।
২০২৩ সালে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদ ভোটের মাধ্যমে তাঁকে পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটি থেকে সরিয়ে দেয়। তাঁর অতীতের ইসরায়েলবিষয়ক মন্তব্যকে সিদ্ধান্তটির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ওমর ও তাঁর সমর্থকেরা তখন এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে এটিকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে সক্রিয় হয়েছেন ওমর। গত ১৫ জুলাই তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পূর্ণ সদস্য হওয়ার আহ্বান জানিয়ে কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। একই প্রস্তাবে আইসিসির কর্মকর্তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা ও ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়।
ওমরের এই উদ্যোগ আসে ট্রাম্প প্রশাসনের আইসিসিবিরোধী অবস্থানের মধ্যে। জুলাইয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আদালটির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেন। এর বিপরীতে ওমর আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহি জোরদারের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের আইসিসিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
শরণার্থীশিবিরে শৈশব কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে পৌঁছানোর কারণে ওমরের রাজনৈতিক যাত্রা অভিবাসী ও শরণার্থী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হয়। তাঁর অফিসের তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রথম সোমালি-আমেরিকান কংগ্রেস সদস্য এবং মিনেসোটার প্রথম বর্ণের নারী প্রতিনিধি।
তবে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বিতর্কের বাইরে ছিল না। ইসরায়েল, মধ্যপ্রাচ্য, অভিবাসন ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তাঁর বিভিন্ন বক্তব্য ও অবস্থান নিয়ে নিয়মিত রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে। একই সঙ্গে এসব অবস্থানই তাঁকে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল রাজনীতির একটি পরিচিত কণ্ঠে পরিণত করেছে।
এবারের প্রাইমারিতে ৮০ শতাংশের বেশি ভোটে জয় তাঁর নির্বাচনী ভিত্তির শক্ত অবস্থানকে সামনে এনেছে। তবে নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনেই নির্ধারিত হবে, তিনি মিনেসোটার ৫ম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে আরও এক মেয়াদে প্রতিনিধি পরিষদে ফিরতে পারবেন কি না।





























