রিফর্ম ইউকে ক্ষমতায় এলে ভেঙে যেতে পারে যুক্তরাজ্য, আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে কেল্টিক দেশগুলো
- প্রকাশঃ ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪০
- / 2
যুক্তরাজ্যে রিফর্ম ইউকে দলের নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। সেই সঙ্গে দলটির নেতা নাইজেল ফারাজের উত্থান আয়ারল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের মতো কেল্টিক জাতিগুলোকে একটি বড় সাংবিধানিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের আশঙ্কা, রিফর্ম ইউকে ক্ষমতায় এলে যুক্তরাজ্যের বর্তমান কাঠামো ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এই আশঙ্কাকে সামনে রেখে আগাম রাজনৈতিক কৌশল সাজাতে শুরু করেছেন যুক্তরাজ্যকে অটুট রাখতে চাওয়া ইউনিয়নপন্থি এবং বিচ্ছিন্নতাপন্থি জাতীয়তাবাদী উভয় পক্ষের নেতারা।
আগামী নির্বাচনে রিফর্ম ইউকে জয়ী হয়ে নাইজেল ফারাজ প্রধানমন্ত্রী অথবা বিরোধীদলীয় নেতা হলে যুক্তরাজ্য সাংবিধানিক জটিলতায় পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকরা। তাদের আশঙ্কা, আয়ারল্যান্ড একত্রীকরণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দ্রুত গণভোটের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির আদলে কঠোর অভিবাসনবিরোধী অভিযান শুরু হলে কেল্টিক অঞ্চলগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের দূরত্ব আরও বাড়তে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রিফর্ম ইউকে সরকার গঠন করতে না পারলেও শক্তিশালী বিরোধী দল বা জোটসঙ্গী হিসেবে আবির্ভূত হলেও একই ধরনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।
ওয়েলসের সাবেক ফার্স্ট মিনিস্টার মার্ক ড্রেকফোর্ড মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) সংস্থার উদাহরণ টেনে বলেন, কয়েক বছরের মধ্যেই আয়ারল্যান্ড দ্বীপের মানুষ আইরিশ সাগরের ওপারে এমন একটি দেশ দেখতে পারে, যেখানে আইসের মতো বিশেষ বাহিনী রাস্তাঘাট থেকে মানুষকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যকে অটুট রাখার পক্ষে অবস্থান নেওয়া ড্রেকফোর্ড এবার নিজেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ব্রিটেনের রাজনীতি স্থায়ীভাবে বদলে গেছে। নাইজেল ফারাজ যদি ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করেন কিংবা রিফর্ম ইউকে বর্তমানের আটটি আসনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি আসন পায়, তাহলে যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আলোচনা করার সুযোগও সীমিত হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, “যুক্তরাজ্য মূলত চারটি দেশের স্বেচ্ছায় গড়া একটি জোট। এমন যেকোনো জোটের ক্ষেত্রেই মানুষের সামনে দুটি পথ খোলা থাকা উচিত। তারা চাইলে এখানে থাকতে পারে, আবার চাইলে বেরিয়েও যেতে পারে।”
গত সপ্তাহে বেলফাস্টে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যান্ড লেবার পার্টি (এসডিএলপি) আয়োজিত এক সম্মেলনে এসব মন্তব্য করেন মার্ক ড্রেকফোর্ড। সম্মেলনে যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের রাজনীতিবিদরা মত দেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণ নিয়ে গণভোট আয়োজনের চাপ সৃষ্টি হবে।
আয়ারল্যান্ডের আইনমন্ত্রী জিম ও’কালাহান বলেন, ইংরেজ জাতীয়তাবাদের উত্থানকে সামনে রেখে ডাবলিনের উচিত এখন থেকেই সম্ভাব্য একত্রীকরণের প্রস্তুতি শুরু করা।
আইরিশ নেতাদের আশঙ্কা, উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্য যুক্তরাজ্য সরকারের বার্ষিক ৬ থেকে ২০ বিলিয়ন পাউন্ডের আর্থিক বরাদ্দকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করতে পারেন নাইজেল ফারাজ। ব্রেক্সিট গণভোটের সময় যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নে সদস্যপদের আর্থিক ব্যয় নিয়ে প্রচারণা চালানো হয়েছিল, একই কৌশলে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ব্যয়ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে পারে বলে তাদের ধারণা।
এসডিএলপির নেত্রী ক্লেয়ার হানা বলেন, ইংরেজ জাতীয়তাবাদীরা যদি উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাহলে তা বড় ধরনের প্রশাসনিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি বলেন, “সাংবিধানিক পরিবর্তন কীভাবে করা উচিত নয়, ব্রেক্সিট তার বড় উদাহরণ। সেই ঘটনার পর থেকে ব্রিটেনের রাজনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। নাইজেল ফারাজের উত্থানকে এখন আর সাময়িক ঘটনা বলা যায় না। এটি ব্রিটিশ রাজনীতির একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।”
আইরিশ জাতীয়তাবাদী দল সিন ফেন দীর্ঘদিন ধরে দুই আয়ারল্যান্ডকে এক করার লক্ষ্যে গণভোটের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে দলটি গণভোটের আগে বিস্তৃত আলোচনা ও প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
সাবেক সিন ফেন অর্থমন্ত্রী এবং বর্তমান আইরিশ সিনেটর কনর মারফি বলেন, উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্য প্রকৃত বার্ষিক অনুদান ৬ বিলিয়ন পাউন্ডের কম। তবে তার আশঙ্কা, নাইজেল ফারাজ রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ২০ বিলিয়ন পাউন্ডের উচ্চ হিসাবকে সামনে আনতে পারেন।
মারফি বলেন, “এটাই তার রাজনীতির ধরন। অনেকটা ট্রাম্পের মতো। আগে থেকে অনুমান করা কঠিন।”
আয়ারল্যান্ডের ক্ষমতাসীন জোটের অন্যতম শরিক ফিন গেল জানিয়েছে, আগামী নভেম্বরের বার্ষিক সম্মেলনে তারা একটি সংযুক্ত আয়ারল্যান্ডের রূপরেখা প্রকাশ করবে।
আয়ারল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং ফিন গেল নেতা লিও ভারাদকার মনে করেন, ফারাজের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। তবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে সীমান্ত গণভোট দ্রুত বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
ভারাদকার বলেন, রিফর্মের নেতৃত্বাধীন সরকার ব্রেক্সিটকে আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশন (ইসিএইচআর) থেকেও যুক্তরাজ্যকে বের করে আনার উদ্যোগ নিতে পারে, যা পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে।
ছোট নৌকায় করে অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ইসিএইচআর থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছার কথা ইতোমধ্যে প্রকাশ করেছেন নাইজেল ফারাজ। এমনকি এই কনভেনশনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক গুড ফ্রাইডে চুক্তি নিয়েও নতুন করে আলোচনা করার আগ্রহ দেখিয়েছেন তিনি।
কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের অধ্যাপক কেটি হেওয়ার্ড ও ডেভিড ফিনিমোর পরিচালিত যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নবিষয়ক ১৫তম সমীক্ষায় দেখা গেছে, সামগ্রিক যুক্তরাজ্যে যেখানে ২৯ শতাংশ মানুষ ইসিএইচআর বাতিলের পক্ষে, সেখানে উত্তর আয়ারল্যান্ডে এ হার ৩৬ শতাংশ।




















