যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর নিয়ম বদলের প্রস্তাব, প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের ওপর
- প্রকাশঃ ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:১৫
- / 4
ওয়াশিংটন, ১৪ অক্টোবর (প্রজন্ম কথা) – যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন যাচাইয়ের নিয়ম পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হলে আগের অনুমোদন পাওয়া কর্মীদের আবেদনও নতুন করে বিস্তারিত যাচাই করতে পারবেন অভিবাসন কর্মকর্তারা। এতে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত নথি জমা দেওয়া, আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্ব এবং কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ওপর এর নির্দিষ্ট প্রভাব কতটা হবে, সে বিষয়ে সরকারি প্রস্তাবে আলাদা কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৪ অক্টোবর ফেডারেল রেজিস্টারে প্রস্তাবটি প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে জনমত জানানোর শেষ তারিখ ১৩ নভেম্বর ২০২৬। প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং বিদ্যমান নিয়ম কার্যকর রয়েছে।
আগের অনুমোদনকে গুরুত্ব দেওয়ার নীতি কী
বর্তমান বিধি অনুযায়ী, একই নিয়োগকর্তা ও কর্মীর ক্ষেত্রে এবং আবেদনের মৌলিক তথ্য অপরিবর্তিত থাকলে আগের যোগ্যতা নির্ধারণের সিদ্ধান্তকে সাধারণত গুরুত্ব দেন অভিবাসন কর্মকর্তারা। তবে আগের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভুল, পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন কিংবা যোগ্যতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে এমন নতুন তথ্য পাওয়া গেলে পুনরায় যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে।
প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হলে এই বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হবে। ফলে আগের আবেদন অনুমোদিত হলেও পরবর্তী মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদনে নিয়োগকর্তাকে কর্মী ও পদের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। কর্মকর্তারা প্রতিটি আবেদন নিজস্ব তথ্য ও নথির ভিত্তিতে যাচাই করতে পারবেন।
কোন কোন ভিসায় প্রভাব পড়তে পারে
প্রস্তাবটি অস্থায়ী কর্মীদের বিভিন্ন শ্রেণির ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদনে প্রযোজ্য হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে:
- এইচ-১বি: বিশেষায়িত পেশায় কর্মরত বিদেশি কর্মী।
- এল-১: একই প্রতিষ্ঠানের বিদেশি শাখা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বদলি হয়ে আসা কর্মী।
- ও-১: অসাধারণ দক্ষতা বা অর্জনের অধিকারী ব্যক্তি।
- টিএন: যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যোগ্য পেশাজীবী।
- ই-শ্রেণি: চুক্তিভিত্তিক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী।
- এইচ-২: অস্থায়ী কর্মী।
- পি: শিল্পী ও ক্রীড়াবিদ।
- কিউ: সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী।
- আর: ধর্মীয় কর্মী।
এসব শ্রেণির সংশ্লিষ্ট আবেদন সাধারণত আই-১২৯ ফরমে জমা দেওয়া হয়। প্রস্তাবটি এই ফরমের আওতায় করা আবেদনগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার কথা।
বাংলাদেশি পেশাজীবীদের বিষয়ে সরকারি পরিসংখ্যান
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থার ২০২৪ অর্থবছরের এইচ-১বি ভিসাবিষয়ক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের জন্য চলমান কর্মসংস্থানের আওতায় ৭৬৫টি আবেদন অনুমোদনের তথ্য রয়েছে। সংশ্লিষ্ট শ্রেণিতে অনুমোদিত মোট আবেদনের প্রায় ০.৩ শতাংশ ছিল বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া আবেদনকারীদের জন্য।
এটি ২০২৪ অর্থবছরের তথ্য এবং চলমান কর্মসংস্থানসংক্রান্ত আবেদনগুলোর হিসাব। এখানে আবেদনকারীদের জন্মস্থান অনুযায়ী তথ্য দেওয়া হয়েছে, নাগরিকত্ব অনুযায়ী নয়। এ পরিসংখ্যান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকের মোট সংখ্যা, তাঁদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার কিংবা নতুন প্রস্তাবে কতজন প্রভাবিত হতে পারেন, তা নির্ধারণ করা যায় না।
বছরে ছয় হাজারের বেশি অতিরিক্ত নথি চাওয়ার আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগের অনুমোদনকে গুরুত্ব দেওয়ার নীতি বাতিল হলে সংশ্লিষ্ট আবেদনগুলোতে বছরে আনুমানিক ৬ হাজার ৪৪টি অতিরিক্ত প্রমাণ চাওয়ার নোটিশ জারি হতে পারে। নীতিটি কার্যকর না থাকা সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত নথি চাওয়ার হারে ২.৯ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধির সম্ভাবনা হিসাব করেছে।
এই হিসাব সব প্রভাবিত আবেদন মিলিয়ে করা হয়েছে, বাংলাদেশিদের জন্য আলাদা করে নয়। মন্ত্রণালয়ের বিশ্লেষণে নীতি পরিবর্তনের কারণে আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার একইভাবে বাড়বে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হলেই বাংলাদেশি কর্মীদের আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার বাড়বে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
নিয়োগকর্তা ও কর্মীদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হলে নিয়োগকর্তাদের কর্মীর দায়িত্ব, পদের প্রয়োজনীয়তা, যোগ্যতা এবং চাকরির ধারাবাহিকতার পক্ষে বিস্তারিত নথি প্রস্তুত রাখতে হতে পারে। অতিরিক্ত তথ্য চাওয়ার নোটিশ এলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তার জবাব দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিতে বলা হয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত প্রমাণ চাওয়ার নোটিশ পাওয়া আবেদনগুলোর নিষ্পত্তিতে নোটিশ না পাওয়া আবেদনের তুলনায় গড়ে ৬৪ দিন বেশি সময় লেগেছে। এটি অতীতের তথ্য; নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে প্রতিটি আবেদন ঠিক এত দিন বিলম্বিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
বাংলাদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রভাব নির্ভর করবে তাঁদের ভিসার শ্রেণি, বর্তমান অভিবাসন অবস্থা, নিয়োগকর্তার নথিপত্র এবং আবেদনের নির্দিষ্ট পরিস্থিতির ওপর। একই নিয়ম সবার ক্ষেত্রে একই ফল দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
নীতির ইতিহাস ও পরবর্তী পদক্ষেপ
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ ২০০৪ সালে আগের অনুমোদনকে গুরুত্ব দেওয়ার নীতি চালু করে। ২০১৭ সালে তা বাতিল করা হয় এবং ২০২১ সালে পুনর্বহাল করা হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এইচ-১বি-সংক্রান্ত আধুনিকায়ন বিধির মাধ্যমে নীতিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিধিমালায় যুক্ত করা হয়। বর্তমান প্রস্তাবের লক্ষ্য হলো বিধিমালা থেকে এই বাধ্যবাধকতা সরিয়ে দেওয়া।
জনমত গ্রহণের সময় শেষ হওয়ার পর সরকার প্রস্তাবটি নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। এর মধ্যে বাংলাদেশি কর্মী ও তাঁদের নিয়োগকর্তাদের বিদ্যমান নিয়ম অনুসরণ, প্রয়োজনীয় নথি হালনাগাদ রাখা এবং সরকারি ঘোষণা পর্যবেক্ষণ করা উচিত। নির্দিষ্ট আবেদনসংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিলে যোগ্য অভিবাসন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।























