বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা, যুক্তরাষ্ট্রে পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি করছেন বি. এম. রাসেল
- প্রকাশঃ ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৫
- / 1
যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ পাওয়ার পর রাসেল বেছে নেন টুলেন ইউনিভার্সিটিকে। সেখানে তাঁর গবেষণার পাশাপাশি রয়েছে গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজের দায়িত্ব। গত ১০ আগস্ট ২০২৬ থেকে তিনি গবেষণাকাজ শুরু করেছেন।
রাসেলের এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রা, প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চতর গবেষণার প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের অভিজ্ঞতা। এর আগে ভারতের কলিঙ্গ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলজিতে (কেআইআইটি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। সে সময় ভারত সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এসআইআই বৃত্তি কর্মসূচির আওতায় তাঁর পড়াশোনার ব্যয় বহন করা হয়।
টুলেন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডির জন্য আবেদন করার পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আবেদনকারীদের মধ্য থেকে প্রাথমিকভাবে মনোনীত হন রাসেল। এরপর তাঁকে তিন দিনে তিনটি পৃথক সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে হয়। প্রথম সাক্ষাৎকারটি ছিল প্রায় ১৫ মিনিটের, যেখানে তাঁর গবেষণার অভিজ্ঞতা ও একাডেমিক প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। পরবর্তী দুটি সাক্ষাৎকারে তাঁর প্রকৌশলবিষয়ক জ্ঞান, গবেষণার সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত ধারণা যাচাই করা হয়। সাক্ষাৎকার দুটি চলে যথাক্রমে প্রায় ৪৭ ও ৫০ মিনিট।
এই তিন ধাপের প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত নির্বাচনের ইমেইল পান তিনি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা অনুমোদন হয় ২০২৬ সালের ২৪ জুন। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আগস্টে গবেষণাকাজ শুরু করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুযোগ পাওয়ার অভিজ্ঞতা রাসেলের জন্য নতুন ছিল না। স্নাতক শেষ করার আগেই চারটি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তিসহ স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চশিক্ষার প্রস্তাব আসে। তবে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার আগ্রহ এবং পিএইচডি করার লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে শেষ পর্যন্ত টুলেন ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
রাসেলের গবেষণার ক্ষেত্র প্রকৌশল, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোগস্থলে। তাঁর কাজের মধ্যে রয়েছে নদী ও উপকূলীয় প্রকৌশল, বাঁধ ও ব্যারাজের পরিকল্পনা এবং নকশা, পানি সম্পদের ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও দুর্যোগের ঝুঁকি মূল্যায়নের মতো বিষয়।
গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, বৃহৎ ভাষা মডেল, দৃষ্টি-ভাষা মডেল, যন্ত্রশিক্ষণ, গভীর শিক্ষণ এবং পরিবেশগত তথ্যবিজ্ঞানের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পদ্ধতির মাধ্যমে বন্যার ঝুঁকি নিরূপণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার উপযোগী মডেল তৈরির দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
জলবায়ুজনিত পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, নদীর পানিপ্রবাহ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকি মূল্যায়নে তথ্যনির্ভর গবেষণার গুরুত্ব বাড়ছে। এ ধরনের গবেষণায় পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ দুর্যোগের সম্ভাব্য প্রভাব বুঝতে এবং পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করতে পারে। রাসেলের গবেষণার লক্ষ্যও প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে এই ক্ষেত্রকে এগিয়ে নেওয়া।
রাসেলের উচ্চশিক্ষার পথচলা শুরু হয় ভারতের কেআইআইটিতে। ভারত সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এসআইআই বৃত্তি কর্মসূচির আওতায় তিনি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে চার বছরের স্নাতক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তাঁর একাডেমিক পড়াশোনা শেষ হয় ২০২৫ সালের মার্চে; আনুষ্ঠানিক সমাবর্তন হয় একই বছরের মে মাসে। তিনি প্রথম শ্রেণির বিশেষ কৃতিত্বসহ প্রকৌশল ডিগ্রি অর্জন করেন।
রাসেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্নাতক পর্যায়ের শেষ দুই সেমিস্টারে তাঁর ফল বাংলাদেশের চার-পয়েন্ট গ্রেডিং পদ্ধতিতে ৪.০০-এর সমতুল্য ছিল। তবে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফল ও বাংলাদেশের গ্রেডিং পদ্ধতির মধ্যে তুলনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট মূল্যায়নপদ্ধতি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি প্রকৌশল পেশার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছেন তিনি। তিনি ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের নিবন্ধিত প্রকৌশলী এবং প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী সদস্য হিসেবে পরিচিত।
টুলেন ইউনিভার্সিটিতে রাসেলের পিএইচডি কর্মসূচিতে পূর্ণ অর্থায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এতে শিক্ষাব্যয়ের ছাড়, স্বাস্থ্যবিমা এবং গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহনের পাশাপাশি গবেষণার কাজে যুক্ত থাকার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া অর্থায়নের মোট বার্ষিক মূল্য সম্পর্কে প্রকাশিত খসড়ায় দুটি ভিন্ন অঙ্ক এসেছে, প্রায় ১ কোটি ৩২ লাখ এবং ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক অর্থায়নপত্র, বার্ষিক বেতন এবং অন্যান্য সুবিধার হিসাব যাচাই ছাড়া নির্দিষ্ট অঙ্ক প্রকাশ করা সমীচীন হবে না। কারণ টিউশন ফি মওকুফ, স্বাস্থ্যবিমা ও অন্যান্য সুবিধার আর্থিক মূল্য এবং হাতে পাওয়া বেতন এক ধরনের অর্থ নয়।
যশোর থেকে শুরু করে ভারতে প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক, এরপর যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং শেষ পর্যন্ত পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি গবেষণায় যুক্ত হওয়া, রাসেলের শিক্ষাযাত্রায় প্রতিটি ধাপ নতুন অভিজ্ঞতা যোগ করেছে। এবার তাঁর লক্ষ্য প্রকৌশল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যার ঝুঁকি নিরূপণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর গবেষণায় অবদান রাখা।
টুলেন ইউনিভার্সিটিতে তাঁর গবেষণার অগ্রগতি ভবিষ্যতে পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার নতুন পদ্ধতি তৈরির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনার বাস্তব মূল্যায়ন নির্ভর করবে গবেষণার ফলাফল, প্রকাশনা এবং বাস্তব প্রয়োগের ওপর। আপাতত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা শুরু করে উচ্চতর প্রকৌশল গবেষণার পথে এগিয়ে চলেছেন বাংলাদেশের এই তরুণ প্রকৌশলী।





























