নীল তিমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী হলো কীভাবে?
- প্রকাশঃ ০১:৩২:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
- / 5
ছবি: আর্থ ডট কম
একবার চোখ বন্ধ করে তোমার দেখা সবচেয়ে বড় হাতিটার কথা কল্পনা করো। এবার সেই হাতিটির পাশে একই রকম আরও ৩০টি হাতি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে ভাবো। একটি পূর্ণবয়স্ক নীল তিমির আকার প্রায় এতটাই বিশাল। পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে বড় কোনো প্রাণীর অস্তিত্বের প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
সমুদ্রের এই বিশাল স্তন্যপায়ী প্রাণীর ওজন হতে পারে প্রায় ১৫০ টন। দৈর্ঘ্য ছাড়িয়ে যেতে পারে ১০০ ফুট। অর্থাৎ, একটি বোয়িং–৭৩৭ বিমানের সমান। এমনকি পৃথিবীর বুকে বিচরণ করা সবচেয়ে বড় ডাইনোসরগুলোর ওজনও ছিল প্রায় ৭৫ টনের মধ্যে, যা একটি নীল তিমির ওজনের অর্ধেকেরও কম।
প্রশ্ন হলো, কীভাবে নীল তিমি এত বিশাল আকার ধারণ করল? এর পেছনে কাজ করেছে প্রকৃতির কিছু মৌলিক নিয়ম, দীর্ঘ বিবর্তন এবং সমুদ্রের বিশেষ পরিবেশ।
ডাঙায় বসবাসকারী প্রাণীদের জন্য বড় হওয়ার সবচেয়ে বড় বাধা মহাকর্ষ শক্তি। কোনো প্রাণীর আকার যত বাড়ে, নিজের শরীরের ওজন বহনের জন্য তার হাড় ও পেশিকে তত বেশি শক্তিশালী হতে হয়। কিন্তু আকার বৃদ্ধির সঙ্গে হাড়ের শক্তি একই হারে বাড়ে না।
ফলে ডাঙায় কোনো প্রাণী যদি নীল তিমির সমান বড় হতো, তাহলে নিজের শরীরের ভারেই তার পা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত। এ কারণেই স্থলভাগে প্রাণীর আকারের একটি স্বাভাবিক সীমা রয়েছে।
কিন্তু পানিতে পরিস্থিতি ভিন্ন। পানির প্লবতা প্রাণীর ওজনের বড় অংশ বহন করে নেয়। ফলে জলজ প্রাণীরা ডাঙার প্রাণীদের তুলনায় অনেক বড় আকার ধারণ করতে পারে। নীল তিমির বিশাল দেহ গঠনের অন্যতম ভিত্তি এই প্রাকৃতিক সুবিধা।
তবে বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব লুইজিয়ানার জীববৈচিত্র্যের অধ্যাপক ক্রেইগ ম্যাকক্লেনের মতে, পানি প্রাণীকে ভাসিয়ে রাখার পাশাপাশি উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট স্তন্যপায়ীদের বড় হওয়ার দিকেও ঠেলে দেয়।
বাতাসের তুলনায় পানিতে শরীরের তাপ দ্রুত হারিয়ে যায়। ফলে শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে জলজ স্তন্যপায়ীদের তুলনামূলক বড় আকারের প্রয়োজন হয়। আবার শরীর বড় হলে তা সচল রাখতে বেশি শক্তিও দরকার হয়। এভাবে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়, যেখানে খাবার থেকে পাওয়া শক্তি এবং শরীর গরম রাখতে ব্যয় হওয়া শক্তির মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। নীল তিমির বিশাল দেহ এই ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে।
নীল তিমির প্রধান খাদ্য শুনলে অনেকেই অবাক হন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণীটির প্রধান খাবার ক্রিল নামে ক্ষুদ্র এক ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী, দেখতে অনেকটা ছোট চিংড়ির মতো।
ক্রিলের দৈর্ঘ্য সাধারণত দুই ইঞ্চির কাছাকাছি হয়। তবে এরা সমুদ্রে বিশাল ঝাঁক বেঁধে চলাচল করে। সেই ঝাঁকই নীল তিমির জন্য বিপুল খাদ্যভান্ডারে পরিণত হয়।
এই ক্ষুদ্র প্রাণী খেয়ে বিশাল শরীরের শক্তি জোগানো সম্ভব হয় তিমির বিশেষ শারীরিক গঠনের কারণে। তিমির চোয়ালের নিচ থেকে নাভি পর্যন্ত একটি ভাঁজযুক্ত প্রসারণশীল অংশ থাকে। ক্রিলের ঝাঁকের দিকে ধেয়ে গেলে এই অংশটি বিশাল বেলুনের মতো ফুলে ওঠে।
একবার মুখ খুলেই একটি নীল তিমি প্রায় ৩৬০ কেজি ক্রিল গিলে ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেরেমি গোল্ডবোজেনের হিসাব অনুযায়ী, নীল তিমি একবার খাবার গ্রহণে যে শক্তি ব্যয় করে, খাদ্য থেকে সে তার প্রায় ২০০ গুণ বেশি শক্তি ফিরে পায়। এই অসাধারণ শক্তি-দক্ষতাই তাদের বিশাল দেহ টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
আজকের নীল তিমিকে দেখে মনে হতে পারে, তারা বুঝি সব সময়ই এমন বিশাল ছিল। কিন্তু জীবাশ্মের তথ্য ভিন্ন গল্প বলে।
প্রায় চার কোটি বছর আগে পাকিকেটাস নামে তিমির পূর্বপুরুষেরা আকারে ছিল নেকড়ের মতো এবং তারা ডাঙায় বসবাস করত। পরে ধীরে ধীরে তারা জলজ জীবনে অভিযোজিত হয়। তবে সেই সময়েও তাদের আকার বর্তমান তিমিদের মতো ছিল না।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রায় ৩০ লাখ বছর আগে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন ঘটে। তখন পৃথিবীতে বরফ যুগ চলছিল। সাগরের বিভিন্ন অঞ্চলে বরফ জমতে শুরু করে। একই সময়ে শক্তিশালী বাতাস সমুদ্রের গভীর স্তর থেকে পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি ওপরে তুলে আনতে থাকে।
এই পুষ্টির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রিলের বিশাল বিশাল ঝাঁক তৈরি হয়। প্রচুর খাদ্যের সহজলভ্যতা তিমিদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে। দীর্ঘ বিবর্তন প্রক্রিয়ায় তারা ক্রমে বড় হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাণীতে পরিণত হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, নীল তিমি সম্ভবত তাদের আকারগত সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এর চেয়ে আরও বড় হওয়া তাদের জন্য কঠিন।
প্রাণীর আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃৎপিণ্ডের ওপর চাপও বাড়ে। শরীরের প্রতিটি অংশে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছে দিতে হৃৎপিণ্ডকে আরও বেশি কাজ করতে হয়।
২০১৯ সালের এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা একটি নীল তিমির হৃৎস্পন্দন পরিমাপ করেন। পানির গভীরে ডুব দিলে তিমি শ্বাস নিতে পারে না। তাই অক্সিজেন সাশ্রয়ের জন্য তারা হৃৎস্পন্দন কমিয়ে দেয়।
গবেষণায় দেখা যায়, গভীর পানিতে ডুব দেওয়ার সময় একটি নীল তিমির হৃৎপিণ্ড মিনিটে মাত্র দুইবার স্পন্দিত হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি জীবিত থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের প্রায় সর্বনিম্ন সীমা।
এর চেয়ে বড় শরীর হলে পর্যাপ্ত রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি সেই বিশাল দেহ সচল রাখতে প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগানও সমুদ্র থেকে পাওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী হিসেবে নীল তিমির অবস্থান তাই কেবল শক্তি বা আকারের গল্প নয়। এটি মহাকর্ষ, সমুদ্রের পরিবেশ, খাদ্যপ্রাপ্যতা এবং কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের এক বিস্ময়কর সমন্বয়ের ফল।
সূত্র: পপুলার সায়েন্স









