চারবার ভিসা প্রত্যাখ্যান, তারপরও থামেননি—রুয়েট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রফেসর রেজওয়ানুল
- প্রকাশঃ ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ১৩:৪২
- / 8
প্রতিকূলতা, দারিদ্র্য, উপহাস ও বারবার ব্যর্থতা—এসব বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েছেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সাবেক শিক্ষার্থী রেজওয়ানুল। চারবার যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর পঞ্চমবার সফল হওয়া এই প্রকৌশলীর জীবনসংগ্রাম এখন অনেক শিক্ষার্থীর জন্য অনুপ্রেরণার গল্প।
রেজওয়ানুলের শৈশব কেটেছে দিনাজপুরে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে বাবার মৃত্যু হলে পরিবারের ওপর নেমে আসে আর্থিক সংকট। পরে বাবার ঋণ পরিশোধ করতে পরিবারের সম্পদ বিক্রি করতে হয়। স্বচ্ছল পরিবার থেকে তারা চলে যায় অনিশ্চয়তার জীবনে।
অর্থকষ্টের মধ্যেও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান। আর্থিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে অনেক শিক্ষক তাঁর কাছ থেকে প্রাইভেট টিউশনের পারিশ্রমিক নেননি। সবার সহযোগিতায় তিনি এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ+ অর্জন করেন।
বাবার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তিনি ভর্তি হন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজে। তবে সেই সময় নিয়মিত তিন বেলা খাবার জোটানোও ছিল কঠিন। অনেক দিন দুই বেলা খাবার খেয়ে দিন পার করতে হয়েছে। কলেজে যাতায়াতের ভাড়ার টাকাও না থাকায় অনেক সময় প্রয়োজন ছাড়া ক্লাসে যেতে পারেননি।
উচ্চশিক্ষার ভর্তি পরীক্ষায় তিনি বুয়েট ছাড়া রুয়েট, কুয়েট ও চুয়েটে ভর্তির সুযোগ পান। পরে বাসার কাছাকাছি হওয়ায় রুয়েটে ভর্তি হন। হলে আসন না পাওয়ায় একটি হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যান। স্বজনদের সীমিত আর্থিক সহায়তা ও পরবর্তীতে একটি টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতেন। অনেক সময় খাবারের পরিবর্তে মাত্র পাঁচ টাকার একটি লাড্ডু খেয়েই রাত কাটাতে হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে গবেষণার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। একটি গবেষণাপত্র নিয়ে উপহাসের শিকার হলেও পরে সেই গবেষণার জন্য ঢাকায় আয়োজিত একটি সম্মেলনে ‘বেস্ট পেপার অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন। ওই স্বীকৃতি তাঁকে গবেষণায় আরও উৎসাহিত করে।
রুয়েট থেকে ৩.৪৬ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করার সময় তাঁর তিনটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স পেপার ও দুটি জার্নাল পেপার প্রকাশিত হয়। একই সঙ্গে তিনি জিআরই পরীক্ষায় ৩০১ এবং টোয়েফলে ৮৪ নম্বর অর্জূূন করেন।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন শুরু করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা চারবার প্রত্যাখ্যাত হয়। একাধিকবার প্রয়োজনীয় একাডেমিক কাগজপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের নিরুৎসাহমূলক মন্তব্যেরও মুখোমুখি হন। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি।
অবশেষে পঞ্চম প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পান এবং টেক্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করেন। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন (NSF) অর্থায়িত “ME-Green: Manufacturing for Environment by Generating Renewable Energy in Enterprise Networks“ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পান।
বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নিজের দীর্ঘ সংগ্রামের পথচলার দিকে ফিরে তাকিয়ে তিনি বলেন, জীবনের নানা প্রতিকূলতা, অপমান ও ব্যর্থতাই তাঁকে আরও দৃঢ় হতে শিখিয়েছে।
রেজওয়ানুলের এই জীবনগল্প দেখিয়ে দেয়, সীমিত সুযোগ, আর্থিক সংকট কিংবা বারবার ব্যর্থতা কোনো মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করে না। অধ্যবসায়, পরিশ্রম এবং লক্ষ্যপূরণে অটল থাকার মধ্য দিয়েই অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়।
দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি রেজওয়ানুলের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।
























