ফিলিস্তিন থেকে ইয়েমেন, লাইবেরিয়া থেকে সিরিয়া: যুদ্ধের অদৃশ্য ক্ষত বয়ে বেড়ানো মানুষের পাশে এক বাংলাদেশি মনোবিজ্ঞানী
- প্রকাশঃ ১১:১৭:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
- / 6
ছবি: এআই / প্রজন্ম কথা
যুদ্ধের ক্ষত সব সময় ধ্বংসস্তূপে দেখা যায় না। অনেক সময় তা মানুষের মনে, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নে, ভেঙে পড়া সম্পর্কের মধ্যে কিংবা প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রামে লুকিয়ে থাকে। সেই অদৃশ্য ক্ষতগুলোর সাক্ষী হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন সংকটপূর্ণ অঞ্চলে কাজ করে চলেছেন বাংলাদেশি মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এস এম ফজলে এলাহী।
বর্তমানে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে কর্মরত ফজলে এলাহী গত আট বছরেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ)-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও সহিংসতার শিকার মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করছেন। তার কর্মক্ষেত্রের তালিকায় রয়েছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির, ইয়েমেন, লাইবেরিয়া, ফিলিস্তিন এবং সিরিয়া।
মৌলভীবাজারে জন্ম নেওয়া ফজলে এলাহী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পেশাজীবনের শুরুতে কাউন্সেলর হিসেবে কাজ করলেও ২০১৮ সালে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মানবিক সহায়তার আন্তর্জাতিক পরিসরে যুক্ত হন।
একপর্যায়ে তিনি বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি চাকরির সুযোগও পেয়েছিলেন। পরিবার থেকেও সেই চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরামর্শ ছিল। কিন্তু তিনি অন্য পথ বেছে নেন। তার ভাষায়, মানবিক সহায়তার কাজই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
তার প্রথম আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ছিল ইয়েমেনে। দীর্ঘ সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে দেশটির লাখো মানুষ তখন চরম সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করছিল।
সেখানে তিনি এমন বহু বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন, যারা নিজেদের সন্তানদের ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। একজন বাবা তাকে বলেছিলেন, তিনি আর সন্তানদের অনাহার দেখতে পারছেন না। তার সামনে দুটি পথ খোলা আছে, হয় পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া, নয়তো পরিবারকে রেখে কোথাও গিয়ে জীবিকার সন্ধান করা।
একই সময়ে তিনি এমন নারীদেরও দেখেছেন, যাদের স্বামীরা জীবিকার খোঁজে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন এবং আর ফিরে আসেননি। কারও কাছে এটি ছিল পরিত্যাগ, আবার কারও কাছে ছিল বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা। কিন্তু যন্ত্রণার ভাগ থেকে কেউই মুক্ত ছিলেন না।
ফজলে এলাহীর মতে, মানসিক স্বাস্থ্য শুধু খাদ্য বা অর্থনৈতিক সংকটের বিষয় নয়। এটি মানুষের পরিবার, সম্পর্ক, সামাজিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ইয়েমেনের পর তিনি কাজ করেন পশ্চিম আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়ায়। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ এবং ইবোলা মহামারির ধাক্কা সামলাতে থাকা দেশটিতে তিনি একটি বৃহৎ মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচির অংশ ছিলেন। সেখানে প্রতি মাসে হাজার হাজার মানুষকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হতো।
তবে লাইবেরিয়ায় তার মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল, দীর্ঘ দুই দশকের সংঘাতের পর নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাবে কে? ফিলিস্তিনে গিয়ে তিনি যুদ্ধের আরেকটি ভিন্ন রূপ দেখেন। অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রায় ১০ মাস কাজ করার অভিজ্ঞতা তার কাছে ছিল গভীরভাবে নাড়া দেওয়া।
তার মতে, ফিলিস্তিনিদের জীবন অনেকটা খাঁচাবন্দি পাখির মতো। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও বাস্তবে বহু মানুষ প্রতিদিন ভয়, অনিশ্চয়তা, অপমান এবং স্বাধীনতা হারানোর অনুভূতি নিয়ে বেঁচে আছেন। কেউ জানেন না পরদিন তার ব্যবসা থাকবে কি না, পরিবারের সদস্য নিরাপদে ফিরবেন কি না, কিংবা নিজেদের জমি ও ঘর হারাতে হবে কি না। বহু মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা শুধু নিরাপত্তাহীনতা নয়, বরং প্রতিনিয়ত অপমানিত হওয়ার অনুভূতি।
তিনি এমন সাবেক বন্দিদের সঙ্গে কাজ করেছেন, যারা দীর্ঘ কারাভোগের পর মুক্তি পেলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। একজন ব্যক্তি ২৬ বছর কারাগারে কাটানোর পর মুক্ত হয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক পৃথিবীতে আবিষ্কার করেছিলেন। তার পুরোনো সম্পর্ক, পরিচিত পরিবেশ এবং জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ সবকিছুই বদলে গিয়েছিল।
ফজলে এলাহীর ভাষায়, দীর্ঘ নির্যাতন একজন মানুষের ভেতরের মানুষটিকেও ধ্বংস করে দিতে পারে। বর্তমানে সিরিয়ায় তার কাজ শুধু রোগীদের সেবা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং টেকসই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজেও যুক্ত আছেন।
বহু বছর ধরে বাস্তুচ্যুতি, নির্যাতন, ক্ষুধা, মৃত্যু এবং শোকের গল্প শুনেও তিনি আশাবাদ হারাননি। তার বিশ্বাস, মানুষের ভেতরে প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আবার উঠে দাঁড়ানোর অসাধারণ শক্তি রয়েছে। ইয়েমেনের পাহাড়ি অঞ্চলে কর্মরত অবস্থায় প্রতিদিন তিনি একজন রাখালকে দেখতেন। লোকটি পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে পানি বা খাবারের সন্ধান করতেন, তারপর আবার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উপরে ফিরে যেতেন। ফজলে এলাহীর কাছে সেই রাখালের গল্প শুধু একজন মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতীক নয়। এটি যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও সংকটের মধ্যেও টিকে থাকার জন্য প্রতিদিন লড়ে যাওয়া লাখো মানুষের গল্প।





















