‘হয় তুমি জিনিয়াস, না হয় পাগল’: ইরাসমাস মুন্ডুসে ইউরোপজয়ী খন্দকার মাইনুলের গল্প
- প্রকাশঃ ০২ অগাস্ট ২০২৬, ২১:২৩
- / 4
ইউরোপের একাধিক দেশে ঘুরে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া মর্যাদাপূর্ণ ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ খন্দকার মাইনুল ইসলাম। একই সময়ে তিনি যুক্তরাজ্যের আরেকটি সম্মানজনক চিভনিং স্কলারশিপেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে দুটি সুযোগের মধ্যে একটি বেছে নিতে গিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন ইরাসমাস মুন্ডুসের ড্রিম (DREAM) প্রোগ্রামে যাওয়ার। তাঁর এই সিদ্ধান্ত শুনে চিভনিংয়ের এক ব্রিটিশ সমন্বয়কারী মন্তব্য করেছিলেন, “হয় তুমি জিনিয়াস, না হয় পাগল।”
তবে মাইনুলের কাছে এটি ছিল নিজের স্বপ্ন ও গবেষণার প্রতি আগ্রহকে অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের (এআইইউবি) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগে পড়ার সময় থেকেই আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর।
প্রস্তুতির শুরু বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই
মাইনুল মনে করতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন, নেতৃত্বের দক্ষতা তৈরি এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাও শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই চিন্তা থেকেই তিনি আইইইই এআইইউবি স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি এআইইউবি রোবোটিকস ক্রুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, সেমিনার, কর্মশালা ও সম্মেলনে অংশ নেন।
তৃতীয় বর্ষে তিনি আইইইই এআইইউবি স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের ভাইস চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজের সুযোগ আরও বাড়ে। এআইইউবিতে আয়োজিত বাংলাদেশের প্রথম ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশনের ইরাসমাস+ রোডশোতে অংশ নিয়ে তিনি প্রথমবার ইরাসমাস মুন্ডুস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন।
চাকরি ছেড়ে নতুন যাত্রা
২০২৩-২৪ সালে আইইইই এআইইউবি স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের চেয়ারপারসন থাকাকালে মাইনুল টেকসই জ্বালানি নিয়ে কাজ শুরু করেন। এ সময় তিনি ৫৬টি সেমিনার, ওয়েবিনার ও সম্মেলন আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
একই সময়ে তাঁর সাতটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। গবেষণার প্রতি আগ্রহ আরও বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে স্নাতক শেষ করার পর ভালো ফলাফলের জন্য তিনি স্বর্ণপদক পান।
পড়াশোনা শেষে বাংলাদেশের একটি শীর্ষ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কাজের সুযোগ পান। তবে কয়েক মাস পর তিনি উপলব্ধি করেন, গবেষণার ক্ষেত্রেই তাঁর আগ্রহ বেশি।
চাকরি ছেড়ে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। তবে মায়ের উৎসাহ তাঁকে সাহস জোগায়। তাঁর মা বলেছিলেন, “তুমি আরও বড় কিছু করার জন্যই জন্মেছ। অন্তত চেষ্টা করো।”
এরপর তিনি আইইএলটিএস, বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন এবং স্কলারশিপের প্রস্তুতি শুরু করেন।
চিভনিংয়ের অভিজ্ঞতা
প্রথমে যুক্তরাজ্যের চিভনিং স্কলারশিপে আবেদন করেন মাইনুল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চিভনিংয়ের আবেদন প্রক্রিয়া তাঁকে নেতৃত্ব, সামাজিক প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
আবেদনের অংশ হিসেবে তাঁকে তিনটি প্রবন্ধ লিখতে হয়, যেখানে যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার আগ্রহ, নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের পরিকল্পনা তুলে ধরতে হয়।
তিনি ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যাম, ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্ক এবং ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডে আবেদন করেন।
শুরুতে চিভনিং নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী ছিলেন না মাইনুল। কারণ, এই বৃত্তির অনেক প্রার্থী ছিলেন অভিজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তা, করপোরেট নেতা ও নীতিনির্ধারক।
তবে ফেব্রুয়ারিতে সাক্ষাৎকারের জন্য নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়ে। ব্রিটিশ হাইকমিশনে প্রায় ৪৫ মিনিটের সাক্ষাৎকারে একাডেমিক প্রস্তুতি, নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা, পেশাগত পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশে ফিরে অবদান রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়।
ইরাসমাস মুন্ডুসের পথে
মাইনুল চারটি ইরাসমাস মুন্ডুস প্রোগ্রামে আবেদন করেছিলেন এবং চারটিতেই নির্বাচিত হন। শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নেন ইউরোপিয়ান মাস্টার ইন ডায়নামিকস অব রিনিউয়েবলস-বেজড পাওয়ার সিস্টেমস (DREAM) প্রোগ্রাম।
চিভনিংয়ের তুলনায় ইরাসমাস মুন্ডুসের নির্বাচন প্রক্রিয়া ছিল প্রযুক্তি ও একাডেমিক দক্ষতাকেন্দ্রিক। আবেদনপত্র ও স্টেটমেন্ট অব পারপাসের পাশাপাশি তাঁকে একটি প্রকল্প উপস্থাপন করতে হয়। এরপর অংশ নিতে হয় দীর্ঘ প্রযুক্তিগত সাক্ষাৎকারে।
মাইনুল জানান, তাঁর সাক্ষাৎকার হয়েছিল রোজার ঈদের দিন। বাড়িতে অতিথিরা উৎসবের পরিবেশে ছিলেন, আর তিনি একটি কক্ষে বসে অনলাইন সাক্ষাৎকারের অপেক্ষা করছিলেন।
তিনি ধারণা করেছিলেন, গবেষণা, নেতৃত্ব ও সহশিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন করা হবে। তবে পুরো সাক্ষাৎকারে করা নয়টি প্রশ্নই ছিল প্রযুক্তিগত বিষয়ে।
এরপর পয়লা বৈশাখের দিনে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত ই-মেইল। সেখানে জানানো হয়, তিনি ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন।
মাইনুল বলেন, খবরটি পাওয়ার পর কিছুক্ষণ তিনি স্থির হয়ে বসে ছিলেন। পরে মাকে জানালে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সেই মুহূর্তকে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে মনে করেন তিনি।
বর্তমানে ইরাসমাস মুন্ডুসের ড্রিম প্রোগ্রামের মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন খন্দকার মাইনুল ইসলাম। তাঁর লক্ষ্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যতে অবদান রাখা।

























