ঢাকা ০২:৩৩ , Wed, ১৯ Aug ২০২৬
যুক্তরাজ্যে
লন্ডন

এক দশক পর আবারও ব্রিটেনের রাস্তায় ‘কিলার ক্লাউন’, ফিরল পুরোনো আতঙ্ক

শাহারিয়া নয়ন
  • প্রকাশঃ ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ১১:০৯
  • / 10
২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল মুখোশধারী ‘কিলার ক্লাউন’কে ঘিরে আতঙ্ক ছবি: প্রজন্ম কথা

লন্ডন, ১৯ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ছড়িয়ে পড়া ‘কিলার ক্লাউন’ আতঙ্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। মুখোশধারী ক্লাউনকে ঘিরে ভয়, শিশুদের অনুসরণ, পুলিশি তৎপরতা এবং কয়েকটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসে। এক দশক পরও বিচ্ছিন্নভাবে একই ধরনের ঘটনা সামনে আসছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে এক বয়স্ক ব্যক্তিকে প্রাণঘাতী ছুরিকাঘাতের ঘটনায় গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

এই প্রবণতার সূত্রপাত ২০১৬ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের গ্রিন বে শহরে। একটি সেতুর নিচের অন্ধকার পার্কিং এলাকায় ভোররাতে ছেঁড়া ক্লাউন পোশাক, সাদা মুখের রং এবং হাতে চারটি বেলুন নিয়ে এক ব্যক্তিকে দেখা যায়। সিসিটিভিতে ধারণ করা দৃশ্যটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সংবাদমাধ্যমগুলোও ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করে।

তখন ওই ব্যক্তিকে ‘গ্যাগস’ নামে ডাকা হচ্ছিল। কয়েক দিন পর জানা যায়, এটি ‘গ্যাগস দ্য ক্লাউন’ নামের একটি স্বল্প বাজেটের ভৌতিক চলচ্চিত্রের প্রচারণার অংশ ছিল। ২০১৮ সালে ছবিটি মুক্তির পর খুব বেশি সাড়া না পেলেও এর প্রচারণা তত দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় ‘কিলার ক্লাউন’ দেখার দাবিকে ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে।

projonmo kotha news
চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে পেনিওয়াইজ চরিত্রে বিল স্কার্সগার্ড; পেশাদার ক্লাউনদের আশঙ্কা, এর ফলে তাঁদের কাজের সুযোগ কমে যেতে পারেছবি: এপি

এরপর বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ক্লাউন সেজে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শিশুদের ভয় দেখানো কিংবা তাদের জঙ্গলের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। নর্থ ক্যারোলাইনার উইনস্টন-সালেমে এক ব্যক্তিকে ক্লাউন সেজে শিশুদের খাবার দেওয়ার প্রস্তাব দিতে দেখা যায়। পরে পুলিশ তাকে ধাওয়া করে।

তবে সব ঘটনা ভয় দেখানো বা দুষ্টুমির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পেনসিলভানিয়ায় ক্লাউন মুখোশ নিয়ে বিরোধের এক পর্যায়ে ১৬ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ান টরেস ছুরিকাঘাতে নিহত হন। এ ঘটনায় অ্যাভেরি ভ্যালেনটিন-বেইরকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকলে ‘কিলার ক্লাউন’ চরিত্রের জনপ্রিয় স্রষ্টা স্টিফেন কিংও মানুষকে আতঙ্ক না ছড়ানোর আহ্বান জানান। ২০১৬ সালের অক্টোবরে তৎকালীন টুইটারে তিনি ক্লাউন নিয়ে ভয় কমানোর কথা বলেন এবং মনে করিয়ে দেন, অধিকাংশ ক্লাউনই শিশুদের আনন্দ দেওয়ার কাজ করেন।

projonmo kothanews3456776

তত দিনে যুক্তরাজ্যেও একই ধরনের ঘটনা ছড়িয়ে পড়েছিল। অক্সফোর্ডশায়ারের কিডলিংটনে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে বেসবল ব্যাট হাতে ক্লাউন সেজে থাকা এক ব্যক্তি তাড়া করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।

ব্র্যাকনেল, মিল্টন কেইনস, অ্যাবিংডন ও চেশামে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্লাউন-সংক্রান্ত ১৪টি ঘটনায় পুলিশকে ডাকা হয়। কাউন্টি ডারহামে চার শিশুকে বাস্তবের মতো দেখতে প্লাস্টিকের ছুরি হাতে এক ক্লাউন অনুসরণ করে স্কুল পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। পরে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হ্যালোউইনে ক্লাউন পোশাক নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানায়।

সেসময় এক উদ্বিগ্ন মা বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, আতঙ্ক তাঁর মেয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ভয় তৈরি হয়েছিল। মুখোশের আড়ালে থাকা ব্যক্তির পরিচয় বোঝা কঠিন হওয়ায় উদ্বেগ আরও বাড়ে বলে তিনি জানান।

কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিষয়ক জ্যেষ্ঠ প্রভাষক সিসিলিয়া সায়াদ ভৌতিক চলচ্চিত্র ও বাস্তব জীবনের ভয়ের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, ক্লাউনের অস্বাভাবিক ও দ্ব্যর্থক চেহারা মানুষের মধ্যে অস্বস্তি তৈরির অন্যতম কারণ। সায়াদের মতে, ভৌতিক চলচ্চিত্রে ক্লাউন চরিত্রকে প্রায়ই ভয়ংকর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। শিশুদের ভয় এবং সার্কাসের পুরোনো ক্লাউনদের অতিরঞ্জিত আচরণও এই ভীতিকর ভাবমূর্তি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

projonmo kotha news 456

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ক্লাউনদের সহজে কোনো একটি শ্রেণিতে ফেলা যায় না। তাদের চেহারা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতো হলেও আচরণে শিশুসুলভ বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। মানুষের মতো শরীরের সঙ্গে অতিরঞ্জিত মুখাবয়ব এবং বড় হাসির মতো বৈশিষ্ট্যও চরিত্রটিকে একই সঙ্গে পরিচিত ও অস্বাভাবিক করে তোলে। ভৌতিক কাহিনিতে তাদের আঘাত পেলেও ব্যথা অনুভব না করার মতো বৈশিষ্ট্য দেখানো হয়। এসব বৈপরীত্য অনেকের কাছে ক্লাউনকে অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে।

২০১৬ সালের অক্টোবরে ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উক্সব্রিজ ক্যাম্পাসে ইউটিউবের একটি কৌতুক ভিডিও তৈরির সময় ১৯ বছর বয়সী কেনি ওজুদেরেরি ক্লাউন সেজে মানুষের দিকে করাতের মতো দেখতে একটি যন্ত্র নিয়ে তেড়ে যান। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং জরিমানার নোটিশ দেওয়া হয়।

এর কয়েক মাস পর ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যে ক্লাউন-সংক্রান্ত ঘটনায় কারাদণ্ডের ঘটনাও ঘটে। সাউথ শিল্ডসে ১৮ বছর বয়সী মাইকেল মার্চ হ্যালোউইনের একটি ‘দুষ্টুমি’ হিসেবে মুখোশ পরে গর্ভবতী এক নারীর দিকে প্রায় এক ফুট লম্বা কুঠার প্রদর্শন করেন। ভয় পেয়ে ওই নারী তাঁর দিকে একটি ইট ছুড়ে দেন।

মার্চকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতে তিনি নিজের কর্মকাণ্ডকে বোকামিপূর্ণ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে স্বীকার করেন। লন্ডনেও সে সময় একাধিক ‘কিলার ক্লাউন’ সংক্রান্ত অভিযোগ আসে। মেট্রোপলিটন পুলিশের কমান্ডার জুলিয়ান বেনেট জানিয়েছিলেন, কয়েকটি ঘটনার মধ্যে তিনটি ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়েছিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, সমাজবিরোধী আচরণ মানুষের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

‘কিলার ক্লাউন’ প্রবণতা পরবর্তী বছরগুলোতে পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। ২০২১ সালে স্কটল্যান্ডের প্রায় দুই হাজার জনসংখ্যার ছোট গ্রাম স্কেলমরলিতে হ্যালোউইনের সময় এক রহস্যময় ক্লাউনের আবির্ভাব ঘটে। এরপর প্রায় প্রতিবছরই ওই ক্লাউন স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্দেশে বিভিন্ন বার্তা ও সংকেত রেখে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

‘কোল ডেইমস’ নামে ফেসবুকে প্রকাশিত ভিডিওগুলোতে ওই ব্যক্তিকে পেনিওয়াইজের পোশাকে অন্ধকার রাস্তায় দেখা যায়। তিনি লাল বেলুন রেখে যান, পুলিশের উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বিভিন্ন রহস্যময় সংকেত রেখে যান।

 এসব ঘটনায় গ্রামের বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়াও একরকম ছিল না। কেউ এতে সত্যিকারের আতঙ্কিত হয়েছেন, আবার কেউ ঘটনাগুলোকে অদ্ভুত ধরনের বিনোদন হিসেবে দেখেছেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে চলতি মাসে আবারও ক্লাউন পোশাককে ঘিরে একটি প্রাণঘাতী ঘটনার কথা সামনে এসেছে। ইলিনয় স্টেট পুলিশ ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে ইস্ট সেন্ট লুইসে এক বয়স্ক ব্যক্তিকে প্রাণঘাতী ছুরিকাঘাতের ঘটনায় গ্রেপ্তার করেছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার তিন ঘণ্টারও কম সময় আগে কিশোরটিকে ঢিলেঢালা কালো ও লাল ক্লাউন পোশাক পরে কাছের একটি বাড়ির রিং ক্যামেরার সামনে যেতে দেখা যায়। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে সে বলেছিল, ‘আমি তোমাকে খুঁজছি।’

২০১৬ সালে একটি চলচ্চিত্রের প্রচারণাকে কেন্দ্র করে ‘কিলার ক্লাউন’ আতঙ্কের যে ঢেউ তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তার অনেক ঘটনাই ভয় দেখানো, দুষ্টুমি কিংবা অনলাইন বিনোদনের পর্যায়ে ছিল। তবে কিছু ঘটনায় অপরাধের অভিযোগও উঠেছে। এক দশক পর বিচ্ছিন্নভাবে একই ধরনের ঘটনা সামনে আসায় সেই পুরোনো আতঙ্কের স্মৃতিও আবার আলোচনায় এসেছে।

❤️
👏
🙂
😞

এক দশক পর আবারও ব্রিটেনের রাস্তায় ‘কিলার ক্লাউন’, ফিরল পুরোনো আতঙ্ক

প্রকাশঃ ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ১১:০৯

লন্ডন, ১৯ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ছড়িয়ে পড়া ‘কিলার ক্লাউন’ আতঙ্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। মুখোশধারী ক্লাউনকে ঘিরে ভয়, শিশুদের অনুসরণ, পুলিশি তৎপরতা এবং কয়েকটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসে। এক দশক পরও বিচ্ছিন্নভাবে একই ধরনের ঘটনা সামনে আসছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে এক বয়স্ক ব্যক্তিকে প্রাণঘাতী ছুরিকাঘাতের ঘটনায় গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

এই প্রবণতার সূত্রপাত ২০১৬ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের গ্রিন বে শহরে। একটি সেতুর নিচের অন্ধকার পার্কিং এলাকায় ভোররাতে ছেঁড়া ক্লাউন পোশাক, সাদা মুখের রং এবং হাতে চারটি বেলুন নিয়ে এক ব্যক্তিকে দেখা যায়। সিসিটিভিতে ধারণ করা দৃশ্যটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সংবাদমাধ্যমগুলোও ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করে।

তখন ওই ব্যক্তিকে ‘গ্যাগস’ নামে ডাকা হচ্ছিল। কয়েক দিন পর জানা যায়, এটি ‘গ্যাগস দ্য ক্লাউন’ নামের একটি স্বল্প বাজেটের ভৌতিক চলচ্চিত্রের প্রচারণার অংশ ছিল। ২০১৮ সালে ছবিটি মুক্তির পর খুব বেশি সাড়া না পেলেও এর প্রচারণা তত দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় ‘কিলার ক্লাউন’ দেখার দাবিকে ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে।

projonmo kotha news
চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে পেনিওয়াইজ চরিত্রে বিল স্কার্সগার্ড; পেশাদার ক্লাউনদের আশঙ্কা, এর ফলে তাঁদের কাজের সুযোগ কমে যেতে পারেছবি: এপি

এরপর বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ক্লাউন সেজে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শিশুদের ভয় দেখানো কিংবা তাদের জঙ্গলের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। নর্থ ক্যারোলাইনার উইনস্টন-সালেমে এক ব্যক্তিকে ক্লাউন সেজে শিশুদের খাবার দেওয়ার প্রস্তাব দিতে দেখা যায়। পরে পুলিশ তাকে ধাওয়া করে।

তবে সব ঘটনা ভয় দেখানো বা দুষ্টুমির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পেনসিলভানিয়ায় ক্লাউন মুখোশ নিয়ে বিরোধের এক পর্যায়ে ১৬ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ান টরেস ছুরিকাঘাতে নিহত হন। এ ঘটনায় অ্যাভেরি ভ্যালেনটিন-বেইরকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকলে ‘কিলার ক্লাউন’ চরিত্রের জনপ্রিয় স্রষ্টা স্টিফেন কিংও মানুষকে আতঙ্ক না ছড়ানোর আহ্বান জানান। ২০১৬ সালের অক্টোবরে তৎকালীন টুইটারে তিনি ক্লাউন নিয়ে ভয় কমানোর কথা বলেন এবং মনে করিয়ে দেন, অধিকাংশ ক্লাউনই শিশুদের আনন্দ দেওয়ার কাজ করেন।

projonmo kothanews3456776

তত দিনে যুক্তরাজ্যেও একই ধরনের ঘটনা ছড়িয়ে পড়েছিল। অক্সফোর্ডশায়ারের কিডলিংটনে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে বেসবল ব্যাট হাতে ক্লাউন সেজে থাকা এক ব্যক্তি তাড়া করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।

ব্র্যাকনেল, মিল্টন কেইনস, অ্যাবিংডন ও চেশামে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্লাউন-সংক্রান্ত ১৪টি ঘটনায় পুলিশকে ডাকা হয়। কাউন্টি ডারহামে চার শিশুকে বাস্তবের মতো দেখতে প্লাস্টিকের ছুরি হাতে এক ক্লাউন অনুসরণ করে স্কুল পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। পরে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হ্যালোউইনে ক্লাউন পোশাক নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানায়।

সেসময় এক উদ্বিগ্ন মা বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, আতঙ্ক তাঁর মেয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ভয় তৈরি হয়েছিল। মুখোশের আড়ালে থাকা ব্যক্তির পরিচয় বোঝা কঠিন হওয়ায় উদ্বেগ আরও বাড়ে বলে তিনি জানান।

কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিষয়ক জ্যেষ্ঠ প্রভাষক সিসিলিয়া সায়াদ ভৌতিক চলচ্চিত্র ও বাস্তব জীবনের ভয়ের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, ক্লাউনের অস্বাভাবিক ও দ্ব্যর্থক চেহারা মানুষের মধ্যে অস্বস্তি তৈরির অন্যতম কারণ। সায়াদের মতে, ভৌতিক চলচ্চিত্রে ক্লাউন চরিত্রকে প্রায়ই ভয়ংকর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। শিশুদের ভয় এবং সার্কাসের পুরোনো ক্লাউনদের অতিরঞ্জিত আচরণও এই ভীতিকর ভাবমূর্তি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

projonmo kotha news 456

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ক্লাউনদের সহজে কোনো একটি শ্রেণিতে ফেলা যায় না। তাদের চেহারা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতো হলেও আচরণে শিশুসুলভ বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। মানুষের মতো শরীরের সঙ্গে অতিরঞ্জিত মুখাবয়ব এবং বড় হাসির মতো বৈশিষ্ট্যও চরিত্রটিকে একই সঙ্গে পরিচিত ও অস্বাভাবিক করে তোলে। ভৌতিক কাহিনিতে তাদের আঘাত পেলেও ব্যথা অনুভব না করার মতো বৈশিষ্ট্য দেখানো হয়। এসব বৈপরীত্য অনেকের কাছে ক্লাউনকে অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে।

২০১৬ সালের অক্টোবরে ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উক্সব্রিজ ক্যাম্পাসে ইউটিউবের একটি কৌতুক ভিডিও তৈরির সময় ১৯ বছর বয়সী কেনি ওজুদেরেরি ক্লাউন সেজে মানুষের দিকে করাতের মতো দেখতে একটি যন্ত্র নিয়ে তেড়ে যান। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং জরিমানার নোটিশ দেওয়া হয়।

এর কয়েক মাস পর ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যে ক্লাউন-সংক্রান্ত ঘটনায় কারাদণ্ডের ঘটনাও ঘটে। সাউথ শিল্ডসে ১৮ বছর বয়সী মাইকেল মার্চ হ্যালোউইনের একটি ‘দুষ্টুমি’ হিসেবে মুখোশ পরে গর্ভবতী এক নারীর দিকে প্রায় এক ফুট লম্বা কুঠার প্রদর্শন করেন। ভয় পেয়ে ওই নারী তাঁর দিকে একটি ইট ছুড়ে দেন।

মার্চকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতে তিনি নিজের কর্মকাণ্ডকে বোকামিপূর্ণ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে স্বীকার করেন। লন্ডনেও সে সময় একাধিক ‘কিলার ক্লাউন’ সংক্রান্ত অভিযোগ আসে। মেট্রোপলিটন পুলিশের কমান্ডার জুলিয়ান বেনেট জানিয়েছিলেন, কয়েকটি ঘটনার মধ্যে তিনটি ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়েছিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, সমাজবিরোধী আচরণ মানুষের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

‘কিলার ক্লাউন’ প্রবণতা পরবর্তী বছরগুলোতে পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। ২০২১ সালে স্কটল্যান্ডের প্রায় দুই হাজার জনসংখ্যার ছোট গ্রাম স্কেলমরলিতে হ্যালোউইনের সময় এক রহস্যময় ক্লাউনের আবির্ভাব ঘটে। এরপর প্রায় প্রতিবছরই ওই ক্লাউন স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্দেশে বিভিন্ন বার্তা ও সংকেত রেখে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

‘কোল ডেইমস’ নামে ফেসবুকে প্রকাশিত ভিডিওগুলোতে ওই ব্যক্তিকে পেনিওয়াইজের পোশাকে অন্ধকার রাস্তায় দেখা যায়। তিনি লাল বেলুন রেখে যান, পুলিশের উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বিভিন্ন রহস্যময় সংকেত রেখে যান।

 এসব ঘটনায় গ্রামের বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়াও একরকম ছিল না। কেউ এতে সত্যিকারের আতঙ্কিত হয়েছেন, আবার কেউ ঘটনাগুলোকে অদ্ভুত ধরনের বিনোদন হিসেবে দেখেছেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে চলতি মাসে আবারও ক্লাউন পোশাককে ঘিরে একটি প্রাণঘাতী ঘটনার কথা সামনে এসেছে। ইলিনয় স্টেট পুলিশ ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে ইস্ট সেন্ট লুইসে এক বয়স্ক ব্যক্তিকে প্রাণঘাতী ছুরিকাঘাতের ঘটনায় গ্রেপ্তার করেছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার তিন ঘণ্টারও কম সময় আগে কিশোরটিকে ঢিলেঢালা কালো ও লাল ক্লাউন পোশাক পরে কাছের একটি বাড়ির রিং ক্যামেরার সামনে যেতে দেখা যায়। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে সে বলেছিল, ‘আমি তোমাকে খুঁজছি।’

২০১৬ সালে একটি চলচ্চিত্রের প্রচারণাকে কেন্দ্র করে ‘কিলার ক্লাউন’ আতঙ্কের যে ঢেউ তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তার অনেক ঘটনাই ভয় দেখানো, দুষ্টুমি কিংবা অনলাইন বিনোদনের পর্যায়ে ছিল। তবে কিছু ঘটনায় অপরাধের অভিযোগও উঠেছে। এক দশক পর বিচ্ছিন্নভাবে একই ধরনের ঘটনা সামনে আসায় সেই পুরোনো আতঙ্কের স্মৃতিও আবার আলোচনায় এসেছে।