ঢাকা ০৮:৩২ , Sat, ১৫ Aug ২০২৬
যুক্তরাজ্যে
লন্ডন

ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে লন্ডনের মেট্রোরেল প্রশিক্ষক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মারওয়া খায়ের

এ্যানী রহমান
  • প্রকাশঃ ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ১১:১৭
  • / 9
প্যারালিম্পিক মশাল হাতে মারওয়া খায়ের ছবি: মারওয়া খায়েরের সৌজন্যে

লন্ডন, ১৫ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – ব্যাংকের চাকরি থেকে লন্ডনের ডকল্যান্ডস লাইট রেলওয়ের (ডিএলআর) ট্রেন অপারেটর, সেখান থেকে অপারেটরদের প্রশিক্ষক। কর্মজীবনে একের পর এক দায়িত্ব বদলেছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মারওয়া খায়েরের। বর্তমানে ডিএলআরের একজন অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক হিসেবে নতুন অপারেটরদের ট্রেন পরিচালনা ও যাত্রীসেবা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেন তিনি। তাঁর পারিবারিক শিকড় সিলেটের গোলাপগঞ্জে।

মারওয়ার জন্ম সৌদি আরবে, বেড়ে ওঠা যুক্তরাজ্যে। সাবলীল বাংলায় কথা বলার পাশাপাশি গিটার বাজিয়ে বাংলা গানও করেন তিনি। তবে তাঁর কর্মজীবনের গল্পের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে লন্ডনের রেলওয়ে।

২০১০ সালের দিকে ন্যাটওয়েস্ট ব্যাংকে কাজ করছিলেন মারওয়া। এর আগে ওষুধের দোকান ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানেও কাজ করেছেন। ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পর সেখানেই স্থায়ীভাবে কাজ করার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু ২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে ব্যাংকিং খাতেও চাকরির অনিশ্চয়তা তৈরি হলে নতুন পেশার কথা ভাবতে শুরু করেন তিনি।

সেই সময় ডিএলআরে কাজ করতেন তাঁর এক বন্ধু। বন্ধুর পরামর্শে রেলওয়ের চাকরির বিষয়ে খোঁজ নেন মারওয়া। তুলনামূলক ভালো বেতন ও দীর্ঘমেয়াদি চাকরির সম্ভাবনা তাঁকে এই পেশায় আসতে আগ্রহী করে। লন্ডনের পরিবহনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ডিএলআর। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের বিভিন্ন এলাকা ৪৫টি স্টেশনের মাধ্যমে যুক্ত করেছে এই স্বয়ংক্রিয় রেল নেটওয়ার্ক।

ডিএলআরের ট্রেনে প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্ট বা পিএসএ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরা সনদধারী ট্রেন অপারেটর হিসেবেও কাজ করেন। স্টেশনে ট্রেন থামার পর দরজা নিরাপদে বন্ধ করা, পরবর্তী যাত্রার জন্য ট্রেন প্রস্তুত করা এবং যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া তাঁদের দায়িত্বের অংশ।

ট্রেনে নিয়মিত ঘোষণা দেওয়া, যাত্রীদের গন্তব্য খুঁজে পেতে সহায়তা করা এবং লন্ডনের ম্যাপ বুঝিয়ে দেওয়ার কাজও করতে হয়। বিশেষ করে ইস্ট লন্ডনে বিভিন্ন দেশের মানুষ বসবাস করায় ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ নন বা শহরের পরিবহনব্যবস্থা সম্পর্কে অপরিচিত এমন যাত্রীদের সহায়তা করতে হয়।

মারওয়ার ভাষ্য, ডিএলআরে কাজ করার জন্য টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড বাধ্যতামূলক নয়। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখানো হয়। প্রায় চার মাসের প্রশিক্ষণের পর আরও দুই সপ্তাহ প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন করতে হয়। লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ট্রেন পরিচালনার লাইসেন্স পাওয়া যায়। ২০১১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিএলআরে ট্রেন অপারেটর হিসেবে যোগ দেন মারওয়া।

রেলওয়েতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে শুরুতে পরিবারের আপত্তি ছিল। পরিবারের ধারণা ছিল, এ ধরনের কাজ পুরুষদের জন্য এবং মেয়েদের এ পেশায় যাওয়া উচিত নয়। পরে সেই মনোভাব বদলে যায়। বর্তমানে তাঁর পরিবারই তাঁর কাজের অন্যতম বড় সমর্থক।

চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরের বছরই মারওয়ার কর্মজীবনে আসে একটি বিশেষ দায়িত্ব। ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিকের সময় ক্যানারি ওয়ার্ফ থেকে প্যারালিম্পিক মশাল স্ট্র্যাটফোর্ডে নিয়ে যাওয়া ডিএলআর ট্রেনটির অপারেটর হিসেবে তাঁকে বেছে নেওয়া হয়।

অনেক পিএসএর মধ্য থেকে তাঁকে বেছে নেওয়ার একটি কারণ ছিল ট্রেনে তাঁর ঘোষণার ধরন। তত দিনে তাঁর কণ্ঠস্বর যাত্রীদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। প্যারালিম্পিক মশাল বহনের সেই বিশেষ যাত্রায় বিবিসিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম উপস্থিত ছিল। মারওয়ার সেই কণ্ঠ পরে ডিএলআরের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণেও ব্যবহার করা হয়। ট্রেন অপারেটরদের জন্য তৈরি প্রশিক্ষণ ভিডিওতে পরিচালন পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনার বর্ণনা তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়েছে।

পিএসএ হিসেবে কাজ করার সময় মারওয়ার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সিগন্যালিং ব্যবস্থার ত্রুটি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকের আগে ডিএলআরের সিগন্যালিং ব্যবস্থা অনেক সময় সমস্যায় পড়ত। এমন পরিস্থিতিতে দিনে পাঁচ-ছয়বার পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে ম্যানুয়ালি ট্রেন চালাতে হয়েছে।

অলিম্পিকের সময় সিগন্যালিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিনিয়োগের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয় বলে জানান তিনি। ম্যানুয়াল মোডে ট্রেন চালানোর জন্য নির্দিষ্ট অনুমতি ও নির্দেশনা প্রয়োজন হতো। নির্দিষ্ট স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট স্টেশন পর্যন্ত ট্রেন চালানোর সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল যাত্রীদের সামলানো।

ডিএলআর ট্রেনে চালকের জন্য আলাদা কোনো কেবিন নেই। ফলে যাত্রীরা সরাসরি চালকের কাছে যেতে পারেন। কিন্তু ম্যানুয়াল ড্রাইভিংয়ের সময় সামনের দিকে পূর্ণ মনোযোগ রাখা প্রয়োজন। এ কারণে আগে থেকেই যাত্রীদের জানানো হতো যে ট্রেনটি ম্যানুয়াল মোডে চলছে এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার তুলনায় এর গতি কম থাকবে। তারপরও অনেক যাত্রী ট্রেন ধীরে চলার কারণ জানতে চাইতেন। মারওয়ার ভাষ্য, যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া থাকলেও তখন চালকের কাছে নিরাপত্তাই ছিল প্রধান বিষয়।

রেলওয়ের কাজে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। কখনো কেউ ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে ট্রেন সরিয়ে নেওয়া বা রিভার্স করার দায়িত্বও পিএসএকে পালন করতে হয়। মারওয়া জানান, এমন ঘটনার পর কয়েকজন সহকর্মী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁকে গিয়ে ট্রেনটি সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।

ডিএলআরে চার বছর ট্রেন পরিচালনার পর নতুন দায়িত্ব পান মারওয়া। এবার তাঁকে অপারেটরদের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতে হয়। নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের শেখানো এবং নতুন কর্মীদের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত করা হয়ে ওঠে তাঁর কাজের অংশ। মারওয়া জানান, প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তাঁকে আরও কর্তৃত্বপূর্ণ হতে হয়েছে। বিশেষ করে বয়স ও নারী হওয়ার কারণে কর্মক্ষেত্রে নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে ধরে রাখতে হয়েছে।

পুরুষ-প্রধান কর্মপরিবেশে কখনো সরাসরি প্রতিরোধের মুখেও পড়েছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একজন নারীর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে, এই কারণে দুজন প্রশিক্ষণার্থী কোর্স ছেড়ে দিয়েছিলেন। আরেকজন তাঁকে বলেছিলেন, তিনি এমন পরিস্থিতি চান না যেখানে কোনো নারী তাঁকে কী করতে হবে তা বলবেন।

এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে কষ্ট দিলেও নিজের অবস্থানে আরও দৃঢ় হতে সাহায্য করেছে বলে জানান মারওয়া। তাঁর দাবি, বর্তমানে তাঁর বিভাগে কর্মরত প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অপারেটর কোনো না কোনো সময়ে তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। মারওয়ার দাদাবাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। সুযোগ পেলেই বাংলাদেশে যান। সর্বশেষ গত অক্টোবরে দেশে এসেছিলেন তিনি। তবে বাংলাদেশের মেট্রোরেলে এখনো চড়ার সুযোগ হয়নি, যা নিয়ে তাঁর আক্ষেপ রয়েছে।

তাঁর বাবা প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবনের বড় সময় সৌদি আরবে কাটিয়েছেন। মারওয়া খুব অল্প বয়সে লেখাপড়ার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। দক্ষিণ লন্ডনের বিভিন্ন স্কুল ও সিক্সথ ফর্ম কলেজে পড়াশোনা করেছেন তিনি। পরে নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা শুরু করেন। চাকরির পাশাপাশি সেই পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছেন। এর ব্যয় তাঁর প্রতিষ্ঠান বহন করছে বলে জানান তিনি।

চার বোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা মারওয়া তাঁর বর্তমান অবস্থানের পেছনে মা-বাবার অবদানের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, মেয়েদের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে মা-বাবা কখনো ছেলে-মেয়ের মধ্যে পার্থক্য করেননি। পড়াশোনার পাশাপাশি গান, বাদ্যযন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহী হওয়ার সুযোগও পেয়েছেন তিনি।

নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মেয়েরা যেন প্রচলিত কয়েকটি পেশার মধ্যে নিজেদের ভবিষ্যৎ সীমাবদ্ধ না রাখে, সেটাই চান মারওয়া। তাঁর মতে, চিকিৎসা বা শিক্ষকতার পাশাপাশি রেলওয়ে, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন পেশাতেও মেয়েদের জন্য সুযোগ রয়েছে।

❤️
👏
🙂
😞

ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে লন্ডনের মেট্রোরেল প্রশিক্ষক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মারওয়া খায়ের

প্রকাশঃ ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ১১:১৭

লন্ডন, ১৫ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – ব্যাংকের চাকরি থেকে লন্ডনের ডকল্যান্ডস লাইট রেলওয়ের (ডিএলআর) ট্রেন অপারেটর, সেখান থেকে অপারেটরদের প্রশিক্ষক। কর্মজীবনে একের পর এক দায়িত্ব বদলেছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মারওয়া খায়েরের। বর্তমানে ডিএলআরের একজন অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক হিসেবে নতুন অপারেটরদের ট্রেন পরিচালনা ও যাত্রীসেবা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেন তিনি। তাঁর পারিবারিক শিকড় সিলেটের গোলাপগঞ্জে।

মারওয়ার জন্ম সৌদি আরবে, বেড়ে ওঠা যুক্তরাজ্যে। সাবলীল বাংলায় কথা বলার পাশাপাশি গিটার বাজিয়ে বাংলা গানও করেন তিনি। তবে তাঁর কর্মজীবনের গল্পের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে লন্ডনের রেলওয়ে।

২০১০ সালের দিকে ন্যাটওয়েস্ট ব্যাংকে কাজ করছিলেন মারওয়া। এর আগে ওষুধের দোকান ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানেও কাজ করেছেন। ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পর সেখানেই স্থায়ীভাবে কাজ করার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু ২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে ব্যাংকিং খাতেও চাকরির অনিশ্চয়তা তৈরি হলে নতুন পেশার কথা ভাবতে শুরু করেন তিনি।

সেই সময় ডিএলআরে কাজ করতেন তাঁর এক বন্ধু। বন্ধুর পরামর্শে রেলওয়ের চাকরির বিষয়ে খোঁজ নেন মারওয়া। তুলনামূলক ভালো বেতন ও দীর্ঘমেয়াদি চাকরির সম্ভাবনা তাঁকে এই পেশায় আসতে আগ্রহী করে। লন্ডনের পরিবহনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ডিএলআর। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের বিভিন্ন এলাকা ৪৫টি স্টেশনের মাধ্যমে যুক্ত করেছে এই স্বয়ংক্রিয় রেল নেটওয়ার্ক।

ডিএলআরের ট্রেনে প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্ট বা পিএসএ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরা সনদধারী ট্রেন অপারেটর হিসেবেও কাজ করেন। স্টেশনে ট্রেন থামার পর দরজা নিরাপদে বন্ধ করা, পরবর্তী যাত্রার জন্য ট্রেন প্রস্তুত করা এবং যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া তাঁদের দায়িত্বের অংশ।

ট্রেনে নিয়মিত ঘোষণা দেওয়া, যাত্রীদের গন্তব্য খুঁজে পেতে সহায়তা করা এবং লন্ডনের ম্যাপ বুঝিয়ে দেওয়ার কাজও করতে হয়। বিশেষ করে ইস্ট লন্ডনে বিভিন্ন দেশের মানুষ বসবাস করায় ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ নন বা শহরের পরিবহনব্যবস্থা সম্পর্কে অপরিচিত এমন যাত্রীদের সহায়তা করতে হয়।

মারওয়ার ভাষ্য, ডিএলআরে কাজ করার জন্য টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড বাধ্যতামূলক নয়। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখানো হয়। প্রায় চার মাসের প্রশিক্ষণের পর আরও দুই সপ্তাহ প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন করতে হয়। লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ট্রেন পরিচালনার লাইসেন্স পাওয়া যায়। ২০১১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিএলআরে ট্রেন অপারেটর হিসেবে যোগ দেন মারওয়া।

রেলওয়েতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে শুরুতে পরিবারের আপত্তি ছিল। পরিবারের ধারণা ছিল, এ ধরনের কাজ পুরুষদের জন্য এবং মেয়েদের এ পেশায় যাওয়া উচিত নয়। পরে সেই মনোভাব বদলে যায়। বর্তমানে তাঁর পরিবারই তাঁর কাজের অন্যতম বড় সমর্থক।

চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরের বছরই মারওয়ার কর্মজীবনে আসে একটি বিশেষ দায়িত্ব। ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিকের সময় ক্যানারি ওয়ার্ফ থেকে প্যারালিম্পিক মশাল স্ট্র্যাটফোর্ডে নিয়ে যাওয়া ডিএলআর ট্রেনটির অপারেটর হিসেবে তাঁকে বেছে নেওয়া হয়।

অনেক পিএসএর মধ্য থেকে তাঁকে বেছে নেওয়ার একটি কারণ ছিল ট্রেনে তাঁর ঘোষণার ধরন। তত দিনে তাঁর কণ্ঠস্বর যাত্রীদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। প্যারালিম্পিক মশাল বহনের সেই বিশেষ যাত্রায় বিবিসিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম উপস্থিত ছিল। মারওয়ার সেই কণ্ঠ পরে ডিএলআরের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণেও ব্যবহার করা হয়। ট্রেন অপারেটরদের জন্য তৈরি প্রশিক্ষণ ভিডিওতে পরিচালন পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনার বর্ণনা তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়েছে।

পিএসএ হিসেবে কাজ করার সময় মারওয়ার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সিগন্যালিং ব্যবস্থার ত্রুটি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকের আগে ডিএলআরের সিগন্যালিং ব্যবস্থা অনেক সময় সমস্যায় পড়ত। এমন পরিস্থিতিতে দিনে পাঁচ-ছয়বার পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে ম্যানুয়ালি ট্রেন চালাতে হয়েছে।

অলিম্পিকের সময় সিগন্যালিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিনিয়োগের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয় বলে জানান তিনি। ম্যানুয়াল মোডে ট্রেন চালানোর জন্য নির্দিষ্ট অনুমতি ও নির্দেশনা প্রয়োজন হতো। নির্দিষ্ট স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট স্টেশন পর্যন্ত ট্রেন চালানোর সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল যাত্রীদের সামলানো।

ডিএলআর ট্রেনে চালকের জন্য আলাদা কোনো কেবিন নেই। ফলে যাত্রীরা সরাসরি চালকের কাছে যেতে পারেন। কিন্তু ম্যানুয়াল ড্রাইভিংয়ের সময় সামনের দিকে পূর্ণ মনোযোগ রাখা প্রয়োজন। এ কারণে আগে থেকেই যাত্রীদের জানানো হতো যে ট্রেনটি ম্যানুয়াল মোডে চলছে এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার তুলনায় এর গতি কম থাকবে। তারপরও অনেক যাত্রী ট্রেন ধীরে চলার কারণ জানতে চাইতেন। মারওয়ার ভাষ্য, যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া থাকলেও তখন চালকের কাছে নিরাপত্তাই ছিল প্রধান বিষয়।

রেলওয়ের কাজে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। কখনো কেউ ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে ট্রেন সরিয়ে নেওয়া বা রিভার্স করার দায়িত্বও পিএসএকে পালন করতে হয়। মারওয়া জানান, এমন ঘটনার পর কয়েকজন সহকর্মী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁকে গিয়ে ট্রেনটি সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।

ডিএলআরে চার বছর ট্রেন পরিচালনার পর নতুন দায়িত্ব পান মারওয়া। এবার তাঁকে অপারেটরদের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতে হয়। নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের শেখানো এবং নতুন কর্মীদের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত করা হয়ে ওঠে তাঁর কাজের অংশ। মারওয়া জানান, প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তাঁকে আরও কর্তৃত্বপূর্ণ হতে হয়েছে। বিশেষ করে বয়স ও নারী হওয়ার কারণে কর্মক্ষেত্রে নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে ধরে রাখতে হয়েছে।

পুরুষ-প্রধান কর্মপরিবেশে কখনো সরাসরি প্রতিরোধের মুখেও পড়েছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একজন নারীর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে, এই কারণে দুজন প্রশিক্ষণার্থী কোর্স ছেড়ে দিয়েছিলেন। আরেকজন তাঁকে বলেছিলেন, তিনি এমন পরিস্থিতি চান না যেখানে কোনো নারী তাঁকে কী করতে হবে তা বলবেন।

এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে কষ্ট দিলেও নিজের অবস্থানে আরও দৃঢ় হতে সাহায্য করেছে বলে জানান মারওয়া। তাঁর দাবি, বর্তমানে তাঁর বিভাগে কর্মরত প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অপারেটর কোনো না কোনো সময়ে তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। মারওয়ার দাদাবাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। সুযোগ পেলেই বাংলাদেশে যান। সর্বশেষ গত অক্টোবরে দেশে এসেছিলেন তিনি। তবে বাংলাদেশের মেট্রোরেলে এখনো চড়ার সুযোগ হয়নি, যা নিয়ে তাঁর আক্ষেপ রয়েছে।

তাঁর বাবা প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবনের বড় সময় সৌদি আরবে কাটিয়েছেন। মারওয়া খুব অল্প বয়সে লেখাপড়ার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। দক্ষিণ লন্ডনের বিভিন্ন স্কুল ও সিক্সথ ফর্ম কলেজে পড়াশোনা করেছেন তিনি। পরে নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা শুরু করেন। চাকরির পাশাপাশি সেই পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছেন। এর ব্যয় তাঁর প্রতিষ্ঠান বহন করছে বলে জানান তিনি।

চার বোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা মারওয়া তাঁর বর্তমান অবস্থানের পেছনে মা-বাবার অবদানের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, মেয়েদের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে মা-বাবা কখনো ছেলে-মেয়ের মধ্যে পার্থক্য করেননি। পড়াশোনার পাশাপাশি গান, বাদ্যযন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহী হওয়ার সুযোগও পেয়েছেন তিনি।

নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মেয়েরা যেন প্রচলিত কয়েকটি পেশার মধ্যে নিজেদের ভবিষ্যৎ সীমাবদ্ধ না রাখে, সেটাই চান মারওয়া। তাঁর মতে, চিকিৎসা বা শিক্ষকতার পাশাপাশি রেলওয়ে, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন পেশাতেও মেয়েদের জন্য সুযোগ রয়েছে।