ঢাকা ০৬:৫১ , Sat, ২৯ Aug ২০২৬

তরুণ আলোকচিত্রী মারুফের ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’, প্রকৃতির সৌন্দর্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

শাহারিয়া নয়ন
  • প্রকাশঃ ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১৬:২৫
  • / 8
সূক্ষ্ম সৌন্দর্য দীর্ঘ এক্সপোজার ও আলো-ছায়ার ব্যবহারে ক্যামেরাবন্দি করছেন তরুণ আলোকচিত্রী ওভিউল মারুফ ছবি: ওভিউল মারুফের সৌজন্যে

সিলেটের তরুণ পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যামেরার ফ্রেমে প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্য ধরে রাখার চর্চা করে চলেছেন ওভিউল মারুফ। হবিগঞ্জে জন্ম নেওয়া এই তরুণ আলোকচিত্রী বর্তমানে সিলেটে বসবাস করছেন এবং জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত আলোকচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০২২ সালে আলোকচিত্রের জগতে তাঁর যাত্রা শুরু। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকৃতি-কেন্দ্রিক আলোকচিত্র, বিশেষ করে দীর্ঘ এক্সপোজার ও উদ্ভিদভিত্তিক কাজের মাধ্যমে নিজের আলাদা একটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছেন তিনি।

তাঁর ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ সিরিজে ফুল, পাতা, উদ্ভিদের সূক্ষ্ম গঠন এবং আলো-ছায়ার বিন্যাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রকৃতির পরিচিত দৃশ্যও নতুনভাবে ধরা দেয়। বাংলাদেশের সিলেটে ধারণ করা এই সিরিজের ছবিগুলো আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র ও শিল্পভিত্তিক বিভিন্ন প্রকাশনায় স্থান পেয়েছে।

তরুণ আলোকচিত্রী ওভিউল মারুফ<br />ছবি: ওভিউল মারুফের সৌজন্যে

ফ্রান্সের আলোকচিত্র সাময়িকী ‘লাই দে লা ফোতোগ্রাফি’, ইতালির শিল্প ও নকশাভিত্তিক সাময়িকী ‘কোলাতেরাল’ এবং অস্ট্রেলিয়ার ‘বায়রন ম্যাগাজিনে’ তাঁর কাজ প্রকাশিত ও আলোচিত হয়েছে। তাঁকে নিয়ে ‘ওয়ালম্যাগেও’ বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ বিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে সাফল্যও এসেছে তাঁর ঝুলিতে। ২০২৬ সালে সিলেট পরিবেশ সম্মেলনে আয়োজিত পরিবেশ বিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি।

লম্বা এক্সপোজারের প্রতি ওভিউলের আগ্রহের শুরু সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়। এক রাতে তাঁর এক মামা বাইরে ছবি তুলতে যাওয়ার কথা জানালে বিষয়টি তাঁকে অবাক করেছিল। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, সেখানে কীভাবে ছবি তোলা সম্ভব, সেটিই ছিল তাঁর প্রশ্ন।

মামা কোনো ব্যাখ্যায় না গিয়ে ট্রাইপড স্থাপন করেন এবং মুঠোফোনের ম্যানুয়াল মোড ব্যবহার করে ছবি তুলতে শুরু করেন। এরপর ক্যামেরার পর্দায় যে দৃশ্য ফুটে ওঠে, তা ওভিউলকে বিস্মিত করে। অন্ধকার রাতের দৃশ্য দীর্ঘ এক্সপোজারের মাধ্যমে যেন দিনের আলোর মতো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর কাছে দীর্ঘ এক্সপোজার আলোকচিত্রের প্রথম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। পরে তিনি অসংখ্য দীর্ঘ এক্সপোজার ছবি তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘নকটার্ন’ অ্যালবাম এবং ‘মিডনাইট ম্যাজিশিয়ান’ নামের একটি সিরিজ।

দীর্ঘ এক্সপোজার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ওভিউলের কাছে একটি বিষয় খুব পরিষ্কার হয়েছে, ক্যামেরার স্থিরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় শাটার খোলা থাকলে ক্যামেরাকে একেবারে স্থির রাখতে হয়। সামান্য নড়াচড়াতেও ছবির কাঙ্ক্ষিত মান নষ্ট হতে পারে। তাই তাঁর কাজের ক্ষেত্রে ট্রাইপড অপরিহার্য।

২০২২ সালে আলোকচিত্র শুরু করার পর থেকেই জানালার বাইরে পূর্ণিমার রাতের দৃশ্য দেখলে তিনি দীর্ঘ এক্সপোজারে ছবি তোলার চেষ্টা করতেন। কখনো কখনো বজ্রপাতের দৃশ্যও ক্যামেরাবন্দি করেছেন। তাঁর গ্যালারিতে ঝড়ের একটি ছবি এখনো রয়েছে। তবে ফোন হারিয়ে যাওয়ায় তাঁর আরও অনেক পুরোনো ছবি হারিয়ে গেছে।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ছবির গঠন বা কম্পোজিশনের বিষয়ে আরও ধৈর্যশীল ও সচেতন হয়েছেন তিনি। সামনে আরও দীর্ঘ এক্সপোজার ছবি করার পাশাপাশি নিজের কাজের পদ্ধতিকে নিয়মিত উন্নত করার প্রত্যয়ও রয়েছে তাঁর।

একই জায়গায় বারবার ছবি তোলার পেছনে ওভিউলের কাছে মূল অনুপ্রেরণা হলো একটি কাঙ্ক্ষিত ছবি তৈরি করার চেষ্টা। দীর্ঘ এক্সপোজারের কোনো ছবি, বিশেষ করে আলোর রেখা তৈরি হবে এমন দৃশ্য ধারণের আগে তিনি মনে মনে চূড়ান্ত ছবিটি কল্পনা করেন। ফ্রেমজুড়ে আলো কীভাবে ছড়িয়ে পড়বে, কোথায় আলোর রেখা তৈরি হবে কিংবা গতির কারণে দৃশ্যটি কীভাবে বদলে যাবে, সেগুলো আগে থেকেই ভাবেন তিনি। এরপর সেই কল্পিত দৃশ্যের কাছাকাছি যেতে একই জায়গায় একাধিকবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন।

উদ্ভিদ বিষয়ক কাজের মধ্যে একটি প্রিয় দীর্ঘ এক্সপোজার ছবির গল্পও আলাদা। ছবিটি তোলার সময় তিনি তাঁর মায়ের মুঠোফোন ব্যবহার করেছিলেন। ফুলের ঠিক পেছনে একটি আলোর উৎস নাড়াচাড়া করছিলেন এবং শাটার স্পিড রেখেছিলেন প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সেকেন্ড।

ছবিটি পরিকল্পিত কোনো দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল ছিল না। সে সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছিল। সেই পরিস্থিতিকেই কাজে লাগিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ছবিটি তোলেন তিনি। চলমান আলোর মৃদু আভা ফুলটির ওপর পড়ে তৈরি করে এক ধরনের স্বপ্নিল আবহ। তাঁর কাছে ছবিটির ফলাফল ছিল অনেকটা সৌভাগ্যের মতো।

শহুরে পরিবেশে রাতের ছবি তুলতে গিয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল উপযুক্ত কম্পোজিশন খুঁজে পাওয়া এবং কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তে ঝকঝকে একটি শট নেওয়া। যানবাহনের চলাচল, আলোর গতি এবং সঠিক সময় নির্ধারণের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয় এ ধরনের ছবিতে। এ কাজে তাঁর বন্ধু রাজ, জামিল ও মেহেদী পাশে ছিলেন। তাঁরা যানবাহনের চলাচলের দিকে নজর রাখতেন এবং কাঙ্ক্ষিত গাড়ি ফ্রেমে আসার মুহূর্তে শাটার চাপার সংকেত দিতেন। সঠিক সময় ও ফ্রেমিং নিশ্চিত করতে বন্ধুদের এই সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে জানান ওভিউল।

ওভিউলের একটি উল্লেখযোগ্য কাজের ধরন হলো হাতে ধরে দীর্ঘ এক্সপোজার ছবি তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে তিনি ম্যানুয়াল মোড, অর্থাৎ মুঠোফোনের প্রো মোড ব্যবহার করেছেন। ছবির উষ্ণতাও বাড়িয়েছেন। শাটার স্পিড রেখেছেন প্রায় সাত থেকে আট সেকেন্ড।

এক্সপোজার চলাকালে ফোনটি সাবধানে এদিক-সেদিক নাড়ানোর মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে আলোর রেখা ও ঝাপসা ভাব তৈরি করেছেন। এতে ছবিতে একটি শৈল্পিক, চিত্রকর্মের মতো আবহ তৈরি হয়েছে। পরে ওয়েবভিত্তিক ছবি সম্পাদনা সফটওয়্যার ব্যবহার করে ছবিটি সম্পাদনা করেছেন তিনি।

সম্পাদনার সময় বাম দিক থেকে আসা দেয়ালের ছায়া কমাতে এক্সপোজার কমিয়েছেন। মূল ছবিটি অন্ধকার থাকায় প্রাণবন্ত ও উজ্জ্বল রাখার জন্য আলোর উজ্জ্বল অংশের মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাড়িয়েছেন। পাশাপাশি উজ্জ্বলতাও কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। সবশেষে ছবির উষ্ণতা বাড়িয়ে ফ্রেমের আলোতে সমৃদ্ধ সোনালি আভা আনার চেষ্টা করেছেন তিনি।

ওভিউলের কাছে ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ মানে ফুলের শান্ত, অব্যক্ত সৌন্দর্য। সিরিজটির মাধ্যমে তিনি প্রকৃতির এমন কিছু সাধারণ মুহূর্ত ধরে রাখতে চেয়েছেন, যেগুলো আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত ঘটে, অথচ ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়। এই সিরিজের একটি ছবিতে একটি মৌমাছিকে ফুলের পরাগায়ন করতে দেখা যায়। ঘটনাটি প্রকৃতির একটি সাধারণ ও নিঃশব্দ মিথস্ক্রিয়া। কিন্তু স্থিরচিত্রের মাধ্যমে সেই ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তকে ধরে রাখার মধ্য দিয়ে ওভিউল সেটিকে নতুন করে দেখার সুযোগ তৈরি করেছেন।

২০২৬ সালে প্রকাশিত এই সিরিজে উদ্ভিদ, ফুল ও পাতার গঠনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সিলেটেই সিরিজটির ছবিগুলো ধারণ করা হয়েছে। দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যে চোখের আড়ালে থাকা উদ্ভিদের সৌন্দর্যকে ক্যামেরার ফ্রেমে তুলে ধরা এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

সাধারণ প্রকৃতির দৃশ্যের বদলে ফুল, পাতার সূক্ষ্ম শিরা, পাপড়ির গঠন এবং আলোর বিন্যাসকে কাছ থেকে দেখানোর জন্য ম্যাক্রো ও ক্লোজ-আপ ধরনের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। আলো ও ছায়ার বৈপরীত্য এবং স্বল্প উপকরণনির্ভর রচনাশৈলীও সিরিজটির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। গাঢ় পটভূমির বিপরীতে মৃদু আলোর ব্যবহার করে উদ্ভিদের সূক্ষ্ম গঠন স্পষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রকৃতিকে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপনের বদলে শান্ত ও ধীর পর্যবেক্ষণের জায়গা হিসেবে দেখানো হয়েছে সিরিজটিতে।

‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ সিরিজের কাজ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শিল্প, আলোকচিত্র ও পরিবেশভিত্তিক প্রকাশনায় জায়গা করে নিয়েছে। ফ্রান্সের ‘লাই দে লা ফোতোগ্রাফি’তে সিরিজটির কাজ প্রকাশিত হয়েছে। ইতালির ‘কোলাতেরাল’ সাময়িকী ওভিউলের কাজ নিয়ে বিশেষ পর্যালোচনা প্রকাশ করেছে, যেখানে প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ, ধীর পর্যবেক্ষণ এবং প্রাকৃতিক রূপের নান্দনিক উপস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার বায়রন বে-ভিত্তিক ‘বায়রন ম্যাগাজিনে’ তাঁর কাজ নিয়ে ‘দ্য কোয়ায়েট পোয়েট্রি অব ফ্লাওয়ার্স’ শিরোনামে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে উদ্ভিদের সূক্ষ্ম গঠন ও আলোর ব্যবহারকে প্রকৃতির নীরব কবিতার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পরিবেশভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম আর্থ ডট অর্গের বৈশ্বিক আলোকচিত্রী পরিচিতিতেও ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ কাজটি গুরুত্ব পেয়েছে। শিল্প ও আলোকচিত্রভিত্তিক ওয়ালম্যাগ এবং ওয়ার্থহোয়াইল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তাঁর নির্মাণ প্রক্রিয়া, দীর্ঘ এক্সপোজার, আলো-ছায়ার ব্যবহার এবং ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ সিরিজের ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আর্টবিট বাজ ও বাইকোস্টাল রিভিউতেও তাঁর সিরিজের বিভিন্ন ছবি সপ্তাহের সেরা ফিচার ও আন্তর্জাতিকভাবে নজরকাড়া কাজ হিসেবে স্থান পেয়েছে।

ওভিউলের কাজের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় দুটি সরঞ্জাম তাঁর কাছে একটি ট্রাইপড ও একটি রেডমি মুঠোফোন। দীর্ঘ এক্সপোজারের সময় ক্যামেরা স্থির রাখতে ট্রাইপডকে অপরিহার্য মনে করেন তিনি। আর রেডমি মুঠোফোনের ক্যামেরা ও ম্যানুয়াল মোড তাঁর আলোকচর্চার সঙ্গে ভালোভাবে মানিয়ে যায় বলে মনে করেন।

সাধারণ এই সমন্বয় দিয়েই তিনি সিলেটের প্রকৃতি, রাতের শহর, ফুল, পাতা ও আলোর বিভিন্ন মুহূর্তকে নিজের মতো করে ফ্রেমবন্দি করছেন।

জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের পড়াশোনার পাশাপাশি আলোকচর্চা চালিয়ে যাওয়া ওভিউল মারুফের পথচলা এখনো শুরুর পর্যায়ে। তবে ২০২২ সালে শুরু হওয়া সেই আগ্রহ এরই মধ্যে তাঁকে দীর্ঘ এক্সপোজার, প্রকৃতি ও উদ্ভিদের সৌন্দর্য নিয়ে নিজস্ব কাজের দিকে নিয়ে গেছে। ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ সেই যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে সিলেটের পরিচিত প্রকৃতি তাঁর ক্যামেরায় পেয়েছে নীরবতা, আলো এবং ধীর পর্যবেক্ষণের এক আলাদা ভাষা।

❤️
👏
🙂
😞

তরুণ আলোকচিত্রী মারুফের ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’, প্রকৃতির সৌন্দর্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

প্রকাশঃ ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১৬:২৫

সিলেটের তরুণ পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যামেরার ফ্রেমে প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্য ধরে রাখার চর্চা করে চলেছেন ওভিউল মারুফ। হবিগঞ্জে জন্ম নেওয়া এই তরুণ আলোকচিত্রী বর্তমানে সিলেটে বসবাস করছেন এবং জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত আলোকচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০২২ সালে আলোকচিত্রের জগতে তাঁর যাত্রা শুরু। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকৃতি-কেন্দ্রিক আলোকচিত্র, বিশেষ করে দীর্ঘ এক্সপোজার ও উদ্ভিদভিত্তিক কাজের মাধ্যমে নিজের আলাদা একটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছেন তিনি।

তাঁর ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ সিরিজে ফুল, পাতা, উদ্ভিদের সূক্ষ্ম গঠন এবং আলো-ছায়ার বিন্যাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রকৃতির পরিচিত দৃশ্যও নতুনভাবে ধরা দেয়। বাংলাদেশের সিলেটে ধারণ করা এই সিরিজের ছবিগুলো আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র ও শিল্পভিত্তিক বিভিন্ন প্রকাশনায় স্থান পেয়েছে।

তরুণ আলোকচিত্রী ওভিউল মারুফ<br />ছবি: ওভিউল মারুফের সৌজন্যে

ফ্রান্সের আলোকচিত্র সাময়িকী ‘লাই দে লা ফোতোগ্রাফি’, ইতালির শিল্প ও নকশাভিত্তিক সাময়িকী ‘কোলাতেরাল’ এবং অস্ট্রেলিয়ার ‘বায়রন ম্যাগাজিনে’ তাঁর কাজ প্রকাশিত ও আলোচিত হয়েছে। তাঁকে নিয়ে ‘ওয়ালম্যাগেও’ বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ বিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে সাফল্যও এসেছে তাঁর ঝুলিতে। ২০২৬ সালে সিলেট পরিবেশ সম্মেলনে আয়োজিত পরিবেশ বিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি।

লম্বা এক্সপোজারের প্রতি ওভিউলের আগ্রহের শুরু সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়। এক রাতে তাঁর এক মামা বাইরে ছবি তুলতে যাওয়ার কথা জানালে বিষয়টি তাঁকে অবাক করেছিল। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, সেখানে কীভাবে ছবি তোলা সম্ভব, সেটিই ছিল তাঁর প্রশ্ন।

মামা কোনো ব্যাখ্যায় না গিয়ে ট্রাইপড স্থাপন করেন এবং মুঠোফোনের ম্যানুয়াল মোড ব্যবহার করে ছবি তুলতে শুরু করেন। এরপর ক্যামেরার পর্দায় যে দৃশ্য ফুটে ওঠে, তা ওভিউলকে বিস্মিত করে। অন্ধকার রাতের দৃশ্য দীর্ঘ এক্সপোজারের মাধ্যমে যেন দিনের আলোর মতো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর কাছে দীর্ঘ এক্সপোজার আলোকচিত্রের প্রথম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। পরে তিনি অসংখ্য দীর্ঘ এক্সপোজার ছবি তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘নকটার্ন’ অ্যালবাম এবং ‘মিডনাইট ম্যাজিশিয়ান’ নামের একটি সিরিজ।

দীর্ঘ এক্সপোজার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ওভিউলের কাছে একটি বিষয় খুব পরিষ্কার হয়েছে, ক্যামেরার স্থিরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় শাটার খোলা থাকলে ক্যামেরাকে একেবারে স্থির রাখতে হয়। সামান্য নড়াচড়াতেও ছবির কাঙ্ক্ষিত মান নষ্ট হতে পারে। তাই তাঁর কাজের ক্ষেত্রে ট্রাইপড অপরিহার্য।

২০২২ সালে আলোকচিত্র শুরু করার পর থেকেই জানালার বাইরে পূর্ণিমার রাতের দৃশ্য দেখলে তিনি দীর্ঘ এক্সপোজারে ছবি তোলার চেষ্টা করতেন। কখনো কখনো বজ্রপাতের দৃশ্যও ক্যামেরাবন্দি করেছেন। তাঁর গ্যালারিতে ঝড়ের একটি ছবি এখনো রয়েছে। তবে ফোন হারিয়ে যাওয়ায় তাঁর আরও অনেক পুরোনো ছবি হারিয়ে গেছে।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ছবির গঠন বা কম্পোজিশনের বিষয়ে আরও ধৈর্যশীল ও সচেতন হয়েছেন তিনি। সামনে আরও দীর্ঘ এক্সপোজার ছবি করার পাশাপাশি নিজের কাজের পদ্ধতিকে নিয়মিত উন্নত করার প্রত্যয়ও রয়েছে তাঁর।

একই জায়গায় বারবার ছবি তোলার পেছনে ওভিউলের কাছে মূল অনুপ্রেরণা হলো একটি কাঙ্ক্ষিত ছবি তৈরি করার চেষ্টা। দীর্ঘ এক্সপোজারের কোনো ছবি, বিশেষ করে আলোর রেখা তৈরি হবে এমন দৃশ্য ধারণের আগে তিনি মনে মনে চূড়ান্ত ছবিটি কল্পনা করেন। ফ্রেমজুড়ে আলো কীভাবে ছড়িয়ে পড়বে, কোথায় আলোর রেখা তৈরি হবে কিংবা গতির কারণে দৃশ্যটি কীভাবে বদলে যাবে, সেগুলো আগে থেকেই ভাবেন তিনি। এরপর সেই কল্পিত দৃশ্যের কাছাকাছি যেতে একই জায়গায় একাধিকবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন।

উদ্ভিদ বিষয়ক কাজের মধ্যে একটি প্রিয় দীর্ঘ এক্সপোজার ছবির গল্পও আলাদা। ছবিটি তোলার সময় তিনি তাঁর মায়ের মুঠোফোন ব্যবহার করেছিলেন। ফুলের ঠিক পেছনে একটি আলোর উৎস নাড়াচাড়া করছিলেন এবং শাটার স্পিড রেখেছিলেন প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সেকেন্ড।

ছবিটি পরিকল্পিত কোনো দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল ছিল না। সে সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছিল। সেই পরিস্থিতিকেই কাজে লাগিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ছবিটি তোলেন তিনি। চলমান আলোর মৃদু আভা ফুলটির ওপর পড়ে তৈরি করে এক ধরনের স্বপ্নিল আবহ। তাঁর কাছে ছবিটির ফলাফল ছিল অনেকটা সৌভাগ্যের মতো।

শহুরে পরিবেশে রাতের ছবি তুলতে গিয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল উপযুক্ত কম্পোজিশন খুঁজে পাওয়া এবং কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তে ঝকঝকে একটি শট নেওয়া। যানবাহনের চলাচল, আলোর গতি এবং সঠিক সময় নির্ধারণের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয় এ ধরনের ছবিতে। এ কাজে তাঁর বন্ধু রাজ, জামিল ও মেহেদী পাশে ছিলেন। তাঁরা যানবাহনের চলাচলের দিকে নজর রাখতেন এবং কাঙ্ক্ষিত গাড়ি ফ্রেমে আসার মুহূর্তে শাটার চাপার সংকেত দিতেন। সঠিক সময় ও ফ্রেমিং নিশ্চিত করতে বন্ধুদের এই সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে জানান ওভিউল।

ওভিউলের একটি উল্লেখযোগ্য কাজের ধরন হলো হাতে ধরে দীর্ঘ এক্সপোজার ছবি তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে তিনি ম্যানুয়াল মোড, অর্থাৎ মুঠোফোনের প্রো মোড ব্যবহার করেছেন। ছবির উষ্ণতাও বাড়িয়েছেন। শাটার স্পিড রেখেছেন প্রায় সাত থেকে আট সেকেন্ড।

এক্সপোজার চলাকালে ফোনটি সাবধানে এদিক-সেদিক নাড়ানোর মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে আলোর রেখা ও ঝাপসা ভাব তৈরি করেছেন। এতে ছবিতে একটি শৈল্পিক, চিত্রকর্মের মতো আবহ তৈরি হয়েছে। পরে ওয়েবভিত্তিক ছবি সম্পাদনা সফটওয়্যার ব্যবহার করে ছবিটি সম্পাদনা করেছেন তিনি।

সম্পাদনার সময় বাম দিক থেকে আসা দেয়ালের ছায়া কমাতে এক্সপোজার কমিয়েছেন। মূল ছবিটি অন্ধকার থাকায় প্রাণবন্ত ও উজ্জ্বল রাখার জন্য আলোর উজ্জ্বল অংশের মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাড়িয়েছেন। পাশাপাশি উজ্জ্বলতাও কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। সবশেষে ছবির উষ্ণতা বাড়িয়ে ফ্রেমের আলোতে সমৃদ্ধ সোনালি আভা আনার চেষ্টা করেছেন তিনি।

ওভিউলের কাছে ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ মানে ফুলের শান্ত, অব্যক্ত সৌন্দর্য। সিরিজটির মাধ্যমে তিনি প্রকৃতির এমন কিছু সাধারণ মুহূর্ত ধরে রাখতে চেয়েছেন, যেগুলো আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত ঘটে, অথচ ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়। এই সিরিজের একটি ছবিতে একটি মৌমাছিকে ফুলের পরাগায়ন করতে দেখা যায়। ঘটনাটি প্রকৃতির একটি সাধারণ ও নিঃশব্দ মিথস্ক্রিয়া। কিন্তু স্থিরচিত্রের মাধ্যমে সেই ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তকে ধরে রাখার মধ্য দিয়ে ওভিউল সেটিকে নতুন করে দেখার সুযোগ তৈরি করেছেন।

২০২৬ সালে প্রকাশিত এই সিরিজে উদ্ভিদ, ফুল ও পাতার গঠনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সিলেটেই সিরিজটির ছবিগুলো ধারণ করা হয়েছে। দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যে চোখের আড়ালে থাকা উদ্ভিদের সৌন্দর্যকে ক্যামেরার ফ্রেমে তুলে ধরা এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

সাধারণ প্রকৃতির দৃশ্যের বদলে ফুল, পাতার সূক্ষ্ম শিরা, পাপড়ির গঠন এবং আলোর বিন্যাসকে কাছ থেকে দেখানোর জন্য ম্যাক্রো ও ক্লোজ-আপ ধরনের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। আলো ও ছায়ার বৈপরীত্য এবং স্বল্প উপকরণনির্ভর রচনাশৈলীও সিরিজটির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। গাঢ় পটভূমির বিপরীতে মৃদু আলোর ব্যবহার করে উদ্ভিদের সূক্ষ্ম গঠন স্পষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রকৃতিকে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপনের বদলে শান্ত ও ধীর পর্যবেক্ষণের জায়গা হিসেবে দেখানো হয়েছে সিরিজটিতে।

‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ সিরিজের কাজ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শিল্প, আলোকচিত্র ও পরিবেশভিত্তিক প্রকাশনায় জায়গা করে নিয়েছে। ফ্রান্সের ‘লাই দে লা ফোতোগ্রাফি’তে সিরিজটির কাজ প্রকাশিত হয়েছে। ইতালির ‘কোলাতেরাল’ সাময়িকী ওভিউলের কাজ নিয়ে বিশেষ পর্যালোচনা প্রকাশ করেছে, যেখানে প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ, ধীর পর্যবেক্ষণ এবং প্রাকৃতিক রূপের নান্দনিক উপস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার বায়রন বে-ভিত্তিক ‘বায়রন ম্যাগাজিনে’ তাঁর কাজ নিয়ে ‘দ্য কোয়ায়েট পোয়েট্রি অব ফ্লাওয়ার্স’ শিরোনামে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে উদ্ভিদের সূক্ষ্ম গঠন ও আলোর ব্যবহারকে প্রকৃতির নীরব কবিতার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পরিবেশভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম আর্থ ডট অর্গের বৈশ্বিক আলোকচিত্রী পরিচিতিতেও ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ কাজটি গুরুত্ব পেয়েছে। শিল্প ও আলোকচিত্রভিত্তিক ওয়ালম্যাগ এবং ওয়ার্থহোয়াইল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তাঁর নির্মাণ প্রক্রিয়া, দীর্ঘ এক্সপোজার, আলো-ছায়ার ব্যবহার এবং ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ সিরিজের ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আর্টবিট বাজ ও বাইকোস্টাল রিভিউতেও তাঁর সিরিজের বিভিন্ন ছবি সপ্তাহের সেরা ফিচার ও আন্তর্জাতিকভাবে নজরকাড়া কাজ হিসেবে স্থান পেয়েছে।

ওভিউলের কাজের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় দুটি সরঞ্জাম তাঁর কাছে একটি ট্রাইপড ও একটি রেডমি মুঠোফোন। দীর্ঘ এক্সপোজারের সময় ক্যামেরা স্থির রাখতে ট্রাইপডকে অপরিহার্য মনে করেন তিনি। আর রেডমি মুঠোফোনের ক্যামেরা ও ম্যানুয়াল মোড তাঁর আলোকচর্চার সঙ্গে ভালোভাবে মানিয়ে যায় বলে মনে করেন।

সাধারণ এই সমন্বয় দিয়েই তিনি সিলেটের প্রকৃতি, রাতের শহর, ফুল, পাতা ও আলোর বিভিন্ন মুহূর্তকে নিজের মতো করে ফ্রেমবন্দি করছেন।

জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের পড়াশোনার পাশাপাশি আলোকচর্চা চালিয়ে যাওয়া ওভিউল মারুফের পথচলা এখনো শুরুর পর্যায়ে। তবে ২০২২ সালে শুরু হওয়া সেই আগ্রহ এরই মধ্যে তাঁকে দীর্ঘ এক্সপোজার, প্রকৃতি ও উদ্ভিদের সৌন্দর্য নিয়ে নিজস্ব কাজের দিকে নিয়ে গেছে। ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ সেই যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে সিলেটের পরিচিত প্রকৃতি তাঁর ক্যামেরায় পেয়েছে নীরবতা, আলো এবং ধীর পর্যবেক্ষণের এক আলাদা ভাষা।