জার্মানিতে বাসা ভাড়া নিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা
- প্রকাশঃ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৯
- / 4
বার্লিন, ১৮ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – জার্মানিতে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে আবাসন সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে দেশটিতে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীদের অনেকেই বাসা খুঁজতে গিয়ে প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন আবাসন গ্রুপে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে অগ্রিম ভাড়া বা জামানতের নামে অর্থ নেওয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এতে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি জার্মানিতে পৌঁছে আবাসন সংকটেও পড়ছেন।
বাংলাদেশের ঢাকার জামিলুর রহমান জার্মানির বার্লিনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়তে ভর্তি হয়েছেন। সেপ্টেম্বরে ক্লাস শুরুর আগে দীর্ঘদিন বাসা খুঁজেও আবাসন পাচ্ছিলেন না তিনি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গ্রুপে এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তি তাকে একটি বাসা দেখিয়ে দুই মাসের অগ্রিম ভাড়া হিসেবে ১ হাজার ২০০ ইউরো দাবি করেন।
কম ভাড়ায় বাসাটি পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশ থেকেই টাকা পাঠিয়ে দেন জামিলুর। কিন্তু ১৫ সেপ্টেম্বর বার্লিনে পৌঁছে ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে আর সাড়া পাননি তিনি। একই সঙ্গে বাসার বিজ্ঞাপনের লিংকও উধাও হয়ে যায়।
পরে দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে জামিলুর দেখতে পান, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে অন্য একজন ভাড়াটে বসবাস করছেন। তাঁর দাবি, যে বাসার জন্য অগ্রিম টাকা দিয়েছিলেন, সেটির সঙ্গে ওই ব্যক্তির কোনো সম্পর্কই ছিল না।
চট্টগ্রামের শারমিন আক্তারও একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে জার্মানির কটবুসে স্নাতকোত্তর পড়তে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি শিক্ষার্থী আবাসন গ্রুপে সুন্দর একটি স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করেন।
তুলনামূলক কম ভাড়া হওয়ায় শুরুতে তাঁর সন্দেহ হয়নি। কথিত চুক্তিপত্রও পাঠানো হয় তাকে। অগ্রিম হিসেবে প্রায় ৮৫০ ইউরো দেওয়ার পরদিনই সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টটি বন্ধ হয়ে যায়। জার্মানিতে পৌঁছে শারমিন জানতে পারেন, ওই ঠিকানায় কোনো খালি ফ্ল্যাটই নেই। পরে বাধ্য হয়ে কিছুদিন পরিচিত একটি বাংলাদেশি পরিবারের সঙ্গে থাকতে হয় তাকে।
ফ্রাঙ্কফুর্টের রাকিবুল হাসানের অভিজ্ঞতাও একই রকম। হোয়াটসঅ্যাপে পরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে একটি কক্ষ ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হন তিনি। ভিডিওকলে বাসাটি দেখানো হওয়ায় পুরো বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল তাঁর কাছে। জার্মানিতে যাওয়ার আগেই জামানতের টাকা পাঠিয়ে দেন রাকিবুল।
কিন্তু নির্ধারিত দিনে ঠিকানায় গিয়ে তিনি দেখতে পান, সেটি আবাসিক ভবন নয়, একটি অফিস ভবন। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মোবাইল ফোন নম্বরেও আর যোগাযোগ করা যায়নি। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক দপ্তরের সহায়তায় সাময়িক থাকার ব্যবস্থা করতে হয় তাকে।
জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমরান হোসাইন বলেন, নতুন করে জার্মানিতে আসা শিক্ষার্থীদের অনেকেই আবাসন সংকটের কারণে এমন প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, জার্মানিতে বাসা পাওয়া কঠিন হওয়ায় কম ভাড়ায় ভালো বাসার প্রস্তাব পেলে অনেকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছেন।
বার্লিনের সাংস্কৃতিক সংগঠক জাহিদ কবির হিমনও বাড়িভাড়া নিয়ে প্রতারণার একটি ঘটনার কথা জানান। তাঁর এক বন্ধুর ক্ষেত্রে বাড়ির কথিত মালিক নিজেকে আয়ারল্যান্ডে অবস্থান করছেন বলে দাবি করে সেখানে থাকা ব্যাংক হিসাবে অগ্রিম টাকা পাঠাতে বলেছিলেন। টাকা পাঠানোর পর বাড়ির চাবি পাঠানো হলেও পরে সেটি ভুয়া বলে জানা যায়।
জাহিদ কবির হিমন বলেন, বাংলাদেশ থেকে জার্মানি বা ইউরোপের অন্য দেশে আসা শিক্ষার্থীদের অচেনা ব্যক্তির কাছে অগ্রিম টাকা পাঠানোর বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। বিশেষ করে অন্য দেশের ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানোর আগে বাড়ি, মালিকানা ও চুক্তির তথ্য যাচাই করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
আবাসন সংকটকে কেন্দ্র করে অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ায় নতুন শিক্ষার্থীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ভুক্তভোগী ও কমিউনিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। অনলাইনে প্রকাশিত ছবি, ভিডিও, কথিত চুক্তিপত্র কিংবা কম ভাড়ার প্রস্তাবকে একমাত্র প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা না করে বাসার ঠিকানা, মালিক বা বৈধ ভাড়া দেওয়ার অধিকার, চুক্তির তথ্য এবং অর্থ গ্রহণকারীর পরিচয় যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে জার্মানিতে পৌঁছানোর আগে অচেনা ব্যক্তিকে বড় অঙ্কের অগ্রিম অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ, বাসা পাওয়ার তাড়াহুড়োয় নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত নতুন শিক্ষার্থীদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বিদেশের মাটিতে সাময়িক আবাসনের সংকটেও ফেলতে পারে।


























