ঢাকা ০১:৪০ , Thu, ০৫ Nov ২০২৬
বিশ্বসমাচার
যুক্তরাজ্য

রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে সংগীত প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন ব্রিটিশ বাংলাদেশি কিশোর নাভহান

প্রজন্ম কথা ডেস্ক
  • প্রকাশঃ ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:১২
  • / 3
লন্ডনের রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে ‘ফিউচার মেকার্স ২০২৬’ সংগীত প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়নের সম্মাননা হাতে ব্রিটিশ বাংলাদেশি কিশোর নাভহান উজায়ের রঈস চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত

লন্ডন, ৫ নভেম্বর (প্রজন্ম কথা): নিজের লেখা পিয়ানোর সুরে যুদ্ধ, বেদনা ও ভালোবাসার গল্প তুলে ধরে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে মর্যাদাপূর্ণ সংগীত প্রতিযোগিতা ‘ফিউচার মেকার্স ২০২৬’-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ১৬ বছর বয়সী ব্রিটিশ বাংলাদেশি কিশোর নাভহান উজায়ের রঈস চৌধুরী। বুধবার ঐতিহাসিক রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে আসা প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে এই সম্মান অর্জন করে সে।

যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-তরুণ সংগীতশিল্পীরা এবারের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। হাজারো আবেদন থেকে বাছাই, অডিশন ও সরাসরি পরিবেশনার একাধিক ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেয় নির্বাচিত প্রতিযোগীরা। সেখানে পিয়ানোয় নিজের মৌলিক композиশন পরিবেশন করে বিচারকদের মূল্যায়নে সেরা নির্বাচিত হয় নাভহান।

প্রায় পাঁচ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের মঞ্চে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে বিভিন্ন সংগীতধারার পরিবেশনা ছিল। প্রতিযোগীরা জ্যাজ, পপ, গ্রাইম ও ধ্রুপদি সংগীত পরিবেশন করে। তাদের মধ্যে নাভহান বেছে নেয় নিজের লেখা ধ্রুপদি পিয়ানো সংগীত।

প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে নাভহান পরিবেশন করে তার নিজের রচনা ‘লা দ্যুল্যর এক্সকিজ’। ফরাসি শব্দগুচ্ছটির অর্থ তীব্র বেদনা। এফ-শার্প মাইনর স্কেলে তৈরি композиশনটির মূল বিষয় যুদ্ধ ও ভালোবাসা।

সংগীতটির মাধ্যমে যুদ্ধের বিপরীত দুই পক্ষের প্রেমিক-প্রেমিকার গল্প তুলে ধরেছে নাভহান। পিয়ানোর ডান ও বাঁ হাতের বিপরীতধর্মী সুরের ব্যবহারে ফুটিয়ে তুলেছে সংঘাত, ভালোবাসা, বেদনা ও আবেগের ভিন্ন ভিন্ন দিক। তার রচনার মূল বক্তব্য, ঘৃণা, সংঘাত ও ঈর্ষার বিপরীতে শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার জয়।

প্রতিযোগিতার মঞ্চে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কিশোর নাভহান উজায়ের রঈস চৌধুরী
প্রতিযোগিতার মঞ্চে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কিশোর নাভহান উজায়ের রঈস চৌধুরী।ছবি: পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া

ধ্রুপদি সংগীতের রোমান্টিক যুগের প্রতি নাভহানের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। ফ্রেদেরিক শোপাঁ, সের্গেই রাখমানিনভ ও ফ্রানৎস লিস্টের সংগীত তার চর্চায় অনুপ্রেরণা জোগায়। তবে পিয়ানোয় ধ্রুপদি সংগীতের পাশাপাশি জ্যাজ, পপ ও রকসহ বিভিন্ন ধারার সংগীতেও আগ্রহ রয়েছে তার।

নাভহানের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে ইনস্টাগ্রামে একটি বিজ্ঞাপন দেখে। রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের ‘ফিউচার মেকার্স’ আয়োজনের বিজ্ঞাপনটি চোখে পড়ার পর নিজের সংগীতপ্রতিভা যাচাইয়ের সুযোগ হিসেবে আবেদন করে সে।

প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী, আবেদনকারীদের নিজস্ব রচিত মৌলিক সংগীত জমা দিতে হয়। সেটি কণ্ঠসংগীত, যন্ত্রসংগীত কিংবা দুইয়ের সমন্বয়ে তৈরি হতে পারে। নাভহান জমা দেয় নিজের লেখা পিয়ানো композиশন।

তার মা রুবেনা চৌধুরী প্রথম আলোকে জানান, হাজারো আবেদন থেকে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর গত মে মাসে অনুষ্ঠিত অডিশনের জন্য নির্বাচিত হয় নাভহান। এরপর জুনে সরাসরি অডিশনে অংশ নেওয়া ২৫ জনের মধ্যে জায়গা করে নেয় সে। সেখান থেকে নির্বাচিত ৯ প্রতিযোগী চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেয়।

চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে আগামী এক বছর সংগীতশিল্পের অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের কাছ থেকে বিশেষ সহায়তা পাবে নাভহান। এর মধ্যে সংগীত প্রযোজনা, রেকর্ডিং, প্রচারণা এবং পেশাগত সংগীতজীবন গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে অভিজ্ঞ সংগীতশিল্পীদের কাছ থেকে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণও পেয়েছে সে।

২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যে জন্ম নাভহানের। বর্তমানে দেশটির ঐতিহ্যবাহী আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হ্যারো স্কুলে পড়াশোনা করছে সে। ১৩ বছর বয়সে সংগীতবৃত্তি নিয়ে এই বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় নাভহান।

প্রতিষ্ঠানটিতে পিয়ানো ও চেলো, দুটি বাদ্যযন্ত্রেই উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে সে। খ্যাতিমান শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে উভয় বাদ্যযন্ত্রে ডিপ্লোমা পর্যায়ের যোগ্যতা অর্জনের প্রস্তুতি চলছে তার। সংগীতের বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষায় অল্প বয়সেই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে নাভহান।

পিয়ানো ও চেলোর পাশাপাশি গিটারও বাজায় সে। আধুনিক গানেও রয়েছে তার দক্ষতা। হ্যারো স্কুলের বায়রন কনসোর্ট চেম্বার কয়ারের সদস্য নাভহান। এই সংগীত দলের জন্য তার লেখা গান যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি বিদেশেও পরিবেশিত হয়েছে। স্কুলের সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা ও স্ট্রিং অর্কেস্ট্রার সদস্য হিসেবেও কাজ করছে সে। এ ছাড়া বিগ ব্যান্ডের সঙ্গে কণ্ঠসংগীত পরিবেশন করে।

সংগীতের বাইরে পড়াশোনাতেও ভালো ফল করছে নাভহান। তার রয়েছে বিশেষ শ্রবণক্ষমতা, যার মাধ্যমে কোনো বাদ্যযন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই নির্দিষ্ট সুরের স্বর শনাক্ত করতে পারে। সংগীতের ভাষায় এই দক্ষতাকে বলা হয় ‘পারফেক্ট পিচ’।

হ্যারো স্কুলে ভর্তির আগে ব্রেন্টউড স্কুলে সংগীতবৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করেছে সে। পাশাপাশি লন্ডনের গিল্ডহল স্কুল অব মিউজিক অ্যান্ড ড্রামার জুনিয়র বিভাগে পিয়ানো, চেলো ও সংগীত রচনার প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

নাভহানের সংগীতচর্চার শুরু ছোটবেলায়। মা রুবেনা চৌধুরীর গাওয়া ঘুমপাড়ানি গানের সুর অনুকরণ করার চেষ্টা করত সে। প্রায় আট বছর বয়সে শুরু হয় তার প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতশিক্ষা।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে লন্ডনের ঐতিহাসিক ড্রেপার্স হলে নিজের লেখা সংগীত পরিবেশন করে নাভহান। সিটি অব লন্ডন করপোরেশনের বিনিয়োগ কমিটির বার্ষিক নৈশভোজে তার সেই পরিবেশনা উপস্থিত অতিথিদের প্রশংসা পায়। পরিবেশনা শেষে অতিথিরা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান।

নাভহানের বাবা মোহাম্মদ চৌধুরী, যিনি ভুলন চৌধুরী নামেও পরিচিত, বাংলাদেশের দিনাজপুরের সন্তান। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। মা রুবেনা চৌধুরীর আদি বাড়ি সিলেটে। তিনি ১৯৭৯ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন। দুই সন্তানের মধ্যে নাভহান ছোট।

মা রুবেনা চৌধুরীরও সংগীতের প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল। সাত বছর বয়স থেকে বাংলা, উর্দু ও হিন্দি গান গাইতেন তিনি। লন্ডনের ভারতীয় বিদ্যা ভবনে ভারতীয় শাস্ত্রীয় কণ্ঠসংগীতে প্রশিক্ষণ নেন। দুই বছরের পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হলেও নাভহানের জন্মের কারণে তৃতীয় বছরের প্রশিক্ষণ শেষ করা সম্ভব হয়নি তাঁর।

বড় বোনের সংগীতচর্চাও নাভহানের শৈশবের অনুপ্রেরণার একটি উৎস। বোন বেহালা ও পিয়ানো বাজানোর পাশাপাশি গানও করতেন। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞানভিত্তিক পেশায় কর্মরত।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী মাহমুদুন্নবী নাভহানের বাবার ফুফা ছিলেন। একই পারিবারিক সূত্রে খ্যাতনামা গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরীও তাঁর বাবার ফুফা ছিলেন।

রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের উদ্যোগে ২০২২ সালে শুরু হয় ‘ফিউচার মেকার্স’ প্রতিযোগিতা। যুক্তরাজ্যের ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সী তরুণ সংগীতশিল্পীদের প্রতিভা তুলে ধরা এবং তাঁদের পেশাগত সংগীতজীবন গড়ে তুলতে সহায়তা করাই এই আয়োজনের উদ্দেশ্য।

প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদনকারীদের নিজস্ব রচিত মৌলিক সংগীত জমা দিতে হয়। প্রাথমিক বাছাইয়ের পর সরাসরি অডিশনের মাধ্যমে চূড়ান্ত পর্বের প্রতিযোগীদের নির্বাচন করা হয়।

এই আয়োজনের মাধ্যমে নির্বাচিত শিল্পীদের এক বছরের জন্য বিশেষ সহায়তা দেওয়া হয়। এর মধ্যে অভিজ্ঞ সংগীত প্রযোজকদের সঙ্গে কাজ, রেকর্ডিং স্টুডিও ব্যবহারের সুযোগ, প্রচারণা এবং পেশাগত সংগীতজীবন সম্পর্কে পরামর্শ রয়েছে। এ ছাড়া রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের এলগার রুমে নিজেদের সংগীত পরিবেশনার সুযোগও পান বিজয়ীরা।

নাভহানের এবারের সাফল্যের মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যের সংগীতাঙ্গনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে তার সামনে। নিজের মৌলিক সংগীত রচনা ও পরিবেশনার মাধ্যমে আগামী দিনে এই অঙ্গনে আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে সে।

❤️
👏
🙂
😞

রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে সংগীত প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন ব্রিটিশ বাংলাদেশি কিশোর নাভহান

প্রকাশঃ ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:১২

লন্ডন, ৫ নভেম্বর (প্রজন্ম কথা): নিজের লেখা পিয়ানোর সুরে যুদ্ধ, বেদনা ও ভালোবাসার গল্প তুলে ধরে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে মর্যাদাপূর্ণ সংগীত প্রতিযোগিতা ‘ফিউচার মেকার্স ২০২৬’-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ১৬ বছর বয়সী ব্রিটিশ বাংলাদেশি কিশোর নাভহান উজায়ের রঈস চৌধুরী। বুধবার ঐতিহাসিক রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে আসা প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে এই সম্মান অর্জন করে সে।

যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-তরুণ সংগীতশিল্পীরা এবারের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। হাজারো আবেদন থেকে বাছাই, অডিশন ও সরাসরি পরিবেশনার একাধিক ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেয় নির্বাচিত প্রতিযোগীরা। সেখানে পিয়ানোয় নিজের মৌলিক композиশন পরিবেশন করে বিচারকদের মূল্যায়নে সেরা নির্বাচিত হয় নাভহান।

প্রায় পাঁচ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের মঞ্চে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে বিভিন্ন সংগীতধারার পরিবেশনা ছিল। প্রতিযোগীরা জ্যাজ, পপ, গ্রাইম ও ধ্রুপদি সংগীত পরিবেশন করে। তাদের মধ্যে নাভহান বেছে নেয় নিজের লেখা ধ্রুপদি পিয়ানো সংগীত।

প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে নাভহান পরিবেশন করে তার নিজের রচনা ‘লা দ্যুল্যর এক্সকিজ’। ফরাসি শব্দগুচ্ছটির অর্থ তীব্র বেদনা। এফ-শার্প মাইনর স্কেলে তৈরি композиশনটির মূল বিষয় যুদ্ধ ও ভালোবাসা।

সংগীতটির মাধ্যমে যুদ্ধের বিপরীত দুই পক্ষের প্রেমিক-প্রেমিকার গল্প তুলে ধরেছে নাভহান। পিয়ানোর ডান ও বাঁ হাতের বিপরীতধর্মী সুরের ব্যবহারে ফুটিয়ে তুলেছে সংঘাত, ভালোবাসা, বেদনা ও আবেগের ভিন্ন ভিন্ন দিক। তার রচনার মূল বক্তব্য, ঘৃণা, সংঘাত ও ঈর্ষার বিপরীতে শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার জয়।

প্রতিযোগিতার মঞ্চে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কিশোর নাভহান উজায়ের রঈস চৌধুরী
প্রতিযোগিতার মঞ্চে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কিশোর নাভহান উজায়ের রঈস চৌধুরী।ছবি: পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া

ধ্রুপদি সংগীতের রোমান্টিক যুগের প্রতি নাভহানের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। ফ্রেদেরিক শোপাঁ, সের্গেই রাখমানিনভ ও ফ্রানৎস লিস্টের সংগীত তার চর্চায় অনুপ্রেরণা জোগায়। তবে পিয়ানোয় ধ্রুপদি সংগীতের পাশাপাশি জ্যাজ, পপ ও রকসহ বিভিন্ন ধারার সংগীতেও আগ্রহ রয়েছে তার।

নাভহানের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে ইনস্টাগ্রামে একটি বিজ্ঞাপন দেখে। রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের ‘ফিউচার মেকার্স’ আয়োজনের বিজ্ঞাপনটি চোখে পড়ার পর নিজের সংগীতপ্রতিভা যাচাইয়ের সুযোগ হিসেবে আবেদন করে সে।

প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী, আবেদনকারীদের নিজস্ব রচিত মৌলিক সংগীত জমা দিতে হয়। সেটি কণ্ঠসংগীত, যন্ত্রসংগীত কিংবা দুইয়ের সমন্বয়ে তৈরি হতে পারে। নাভহান জমা দেয় নিজের লেখা পিয়ানো композиশন।

তার মা রুবেনা চৌধুরী প্রথম আলোকে জানান, হাজারো আবেদন থেকে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর গত মে মাসে অনুষ্ঠিত অডিশনের জন্য নির্বাচিত হয় নাভহান। এরপর জুনে সরাসরি অডিশনে অংশ নেওয়া ২৫ জনের মধ্যে জায়গা করে নেয় সে। সেখান থেকে নির্বাচিত ৯ প্রতিযোগী চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেয়।

চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে আগামী এক বছর সংগীতশিল্পের অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের কাছ থেকে বিশেষ সহায়তা পাবে নাভহান। এর মধ্যে সংগীত প্রযোজনা, রেকর্ডিং, প্রচারণা এবং পেশাগত সংগীতজীবন গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে অভিজ্ঞ সংগীতশিল্পীদের কাছ থেকে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণও পেয়েছে সে।

২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যে জন্ম নাভহানের। বর্তমানে দেশটির ঐতিহ্যবাহী আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হ্যারো স্কুলে পড়াশোনা করছে সে। ১৩ বছর বয়সে সংগীতবৃত্তি নিয়ে এই বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় নাভহান।

প্রতিষ্ঠানটিতে পিয়ানো ও চেলো, দুটি বাদ্যযন্ত্রেই উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে সে। খ্যাতিমান শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে উভয় বাদ্যযন্ত্রে ডিপ্লোমা পর্যায়ের যোগ্যতা অর্জনের প্রস্তুতি চলছে তার। সংগীতের বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষায় অল্প বয়সেই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে নাভহান।

পিয়ানো ও চেলোর পাশাপাশি গিটারও বাজায় সে। আধুনিক গানেও রয়েছে তার দক্ষতা। হ্যারো স্কুলের বায়রন কনসোর্ট চেম্বার কয়ারের সদস্য নাভহান। এই সংগীত দলের জন্য তার লেখা গান যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি বিদেশেও পরিবেশিত হয়েছে। স্কুলের সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা ও স্ট্রিং অর্কেস্ট্রার সদস্য হিসেবেও কাজ করছে সে। এ ছাড়া বিগ ব্যান্ডের সঙ্গে কণ্ঠসংগীত পরিবেশন করে।

সংগীতের বাইরে পড়াশোনাতেও ভালো ফল করছে নাভহান। তার রয়েছে বিশেষ শ্রবণক্ষমতা, যার মাধ্যমে কোনো বাদ্যযন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই নির্দিষ্ট সুরের স্বর শনাক্ত করতে পারে। সংগীতের ভাষায় এই দক্ষতাকে বলা হয় ‘পারফেক্ট পিচ’।

হ্যারো স্কুলে ভর্তির আগে ব্রেন্টউড স্কুলে সংগীতবৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করেছে সে। পাশাপাশি লন্ডনের গিল্ডহল স্কুল অব মিউজিক অ্যান্ড ড্রামার জুনিয়র বিভাগে পিয়ানো, চেলো ও সংগীত রচনার প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

নাভহানের সংগীতচর্চার শুরু ছোটবেলায়। মা রুবেনা চৌধুরীর গাওয়া ঘুমপাড়ানি গানের সুর অনুকরণ করার চেষ্টা করত সে। প্রায় আট বছর বয়সে শুরু হয় তার প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতশিক্ষা।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে লন্ডনের ঐতিহাসিক ড্রেপার্স হলে নিজের লেখা সংগীত পরিবেশন করে নাভহান। সিটি অব লন্ডন করপোরেশনের বিনিয়োগ কমিটির বার্ষিক নৈশভোজে তার সেই পরিবেশনা উপস্থিত অতিথিদের প্রশংসা পায়। পরিবেশনা শেষে অতিথিরা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান।

নাভহানের বাবা মোহাম্মদ চৌধুরী, যিনি ভুলন চৌধুরী নামেও পরিচিত, বাংলাদেশের দিনাজপুরের সন্তান। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। মা রুবেনা চৌধুরীর আদি বাড়ি সিলেটে। তিনি ১৯৭৯ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন। দুই সন্তানের মধ্যে নাভহান ছোট।

মা রুবেনা চৌধুরীরও সংগীতের প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল। সাত বছর বয়স থেকে বাংলা, উর্দু ও হিন্দি গান গাইতেন তিনি। লন্ডনের ভারতীয় বিদ্যা ভবনে ভারতীয় শাস্ত্রীয় কণ্ঠসংগীতে প্রশিক্ষণ নেন। দুই বছরের পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হলেও নাভহানের জন্মের কারণে তৃতীয় বছরের প্রশিক্ষণ শেষ করা সম্ভব হয়নি তাঁর।

বড় বোনের সংগীতচর্চাও নাভহানের শৈশবের অনুপ্রেরণার একটি উৎস। বোন বেহালা ও পিয়ানো বাজানোর পাশাপাশি গানও করতেন। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞানভিত্তিক পেশায় কর্মরত।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী মাহমুদুন্নবী নাভহানের বাবার ফুফা ছিলেন। একই পারিবারিক সূত্রে খ্যাতনামা গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরীও তাঁর বাবার ফুফা ছিলেন।

রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের উদ্যোগে ২০২২ সালে শুরু হয় ‘ফিউচার মেকার্স’ প্রতিযোগিতা। যুক্তরাজ্যের ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সী তরুণ সংগীতশিল্পীদের প্রতিভা তুলে ধরা এবং তাঁদের পেশাগত সংগীতজীবন গড়ে তুলতে সহায়তা করাই এই আয়োজনের উদ্দেশ্য।

প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদনকারীদের নিজস্ব রচিত মৌলিক সংগীত জমা দিতে হয়। প্রাথমিক বাছাইয়ের পর সরাসরি অডিশনের মাধ্যমে চূড়ান্ত পর্বের প্রতিযোগীদের নির্বাচন করা হয়।

এই আয়োজনের মাধ্যমে নির্বাচিত শিল্পীদের এক বছরের জন্য বিশেষ সহায়তা দেওয়া হয়। এর মধ্যে অভিজ্ঞ সংগীত প্রযোজকদের সঙ্গে কাজ, রেকর্ডিং স্টুডিও ব্যবহারের সুযোগ, প্রচারণা এবং পেশাগত সংগীতজীবন সম্পর্কে পরামর্শ রয়েছে। এ ছাড়া রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের এলগার রুমে নিজেদের সংগীত পরিবেশনার সুযোগও পান বিজয়ীরা।

নাভহানের এবারের সাফল্যের মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যের সংগীতাঙ্গনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে তার সামনে। নিজের মৌলিক সংগীত রচনা ও পরিবেশনার মাধ্যমে আগামী দিনে এই অঙ্গনে আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে সে।