ঢাকা ০৭:৫৭ , Sun, ২৭ Sep ২০২৬
বিশ্বসমাচার
অস্ট্রেলিয়া

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমায় চাপে অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়, ৯ কোটি ডলারের রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা

আয়ান সরকার
  • প্রকাশঃ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২০
  • / 7
একীভূতকরণের পর নতুন অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

অ্যাডিলেড, ২৭ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার নতুন অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত শিক্ষার্থী লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পিছিয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টি কয়েক কোটি ডলারের রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নীতির কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তিতে বড় ধরনের পতন হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় চলতি বছরের জানুয়ারিতে কার্যক্রম শুরু করে। প্রায় তিন বছর ধরে চলা একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়া একত্র হয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। এই একীভূতকরণে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া রাজ্য সরকার ৪৬ কোটি ৪৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলারের সহায়তা দিয়েছে।

একীভূতকরণের সময় তৈরি ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, ২০৩৪ সালের মধ্যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টি দুই পুরোনো প্রতিষ্ঠানের ২০২৩ সালের তুলনায় অতিরিক্ত ৬ হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণ করতে পারবে।

তবে চলতি বছরের পরিসংখ্যান সেই লক্ষ্যের বিপরীত চিত্র দেখাচ্ছে। অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত তাদের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৬ হাজার ৬৭৭। অথচ গত বছর একই সময়ে একীভূতকরণের আগের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ছিল ২০ হাজার ৮২০ জন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, গত দুই বছরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমাতে অস্ট্রেলীয় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন নীতির প্রভাবেই এই পতন হয়েছে।

এসব নীতির মধ্যে শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন ফি বাড়িয়ে ২ হাজার ৫০০ অস্ট্রেলীয় ডলার করা, শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বাড়ানো এবং নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তিতে সীমা আরোপের ব্যবস্থা রয়েছে। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় আসার সুযোগ সীমিত করার নতুন নীতিও ঘোষণা করেছেন।

অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ও বহিরাগত সম্পর্কবিষয়ক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক জেসিকা গ্যালাঘার বলেন, সরকারের সাম্প্রতিক নীতিগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণের সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, এসব পরিবর্তনের কারণে ২০৩৪ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ৬ হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির লক্ষ্যে পৌঁছানো এখন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।

মে মাসে অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিকোলা ফিলিপস জানিয়েছিলেন, প্রথম সেমিস্টারে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪০ শতাংশ কম হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৯ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, দ্বিতীয় সেমিস্টারেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তিতে প্রায় একই মাত্রার পতন দেখা গেছে।

তবে মে মাসে দেওয়া এক বার্তায় উপাচার্য জানিয়েছিলেন, কর্মীদের নিয়ে বড় ধরনের পুনর্গঠন করা হবে না এবং দেশীয় শিক্ষার্থী ভর্তির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক পথেই রয়েছে। একই সঙ্গে আগামী তিন বছর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

অধ্যাপক গ্যালাঘার জানান, বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে দেখেছে এবং অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রভাব বেশি অনুভব করেছে।

তাঁর ভাষ্য, অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল থেকে তুলনামূলক বেশি শিক্ষার্থী আসে। এসব দেশের শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার চীনসহ কয়েকটি বাজারের তুলনায় বেশি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও কমে গেলে এর উল্লেখযোগ্য আর্থিক প্রভাব পড়তে পারে।

অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়া ২০২২ সালের ডিসেম্বরে একীভূত হওয়ার বিষয়ে কাজ শুরু করে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে দুই প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া সরকারের ৪৬ কোটি ৪৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলারের সহায়তার মধ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণের জন্য ৩ কোটি ডলার বরাদ্দও ছিল।

তবে একীভূতকরণের আলোচনা মূলত অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের আগে হয়েছিল। মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা নীতিবিষয়ক অধ্যাপক অ্যান্ড্রু নর্টন বলেন, একীভূতকরণের সময়টি অনুকূল ছিল না।

তাঁর মতে, কয়েক বছর আগে এই একীভূতকরণ হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বাড়ানোর সুযোগ বেশি থাকত। কিন্তু একীভূতকরণের সময়ই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমানোর সরকারি নীতির সঙ্গে তা মিলে গেছে।

নর্টনের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া ফি কমে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যয় কমাতে ভবিষ্যতে আরও কর্মী পুনর্গঠনের পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান বা র‌্যাঙ্কিং উন্নত হলেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার চাহিদা কমে যাওয়ায় সেই উন্নতি থেকে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী পাওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে।

একীভূতকরণের সময় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমানোর মতো সরকারি নীতির সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক গ্যালাঘার বলেন, এত দ্রুত এতগুলো নীতি পরিবর্তন হবে, তা আগে থেকে অনুমান করা কঠিন ছিল।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়টি সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল বলেও জানান তিনি। ২০২৩ সালে দুই বিশ্ববিদ্যালয় একটি সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছিল, তারা সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক নিয়ে হিসাব করেছিল। এর মধ্যে একটি পরিস্থিতিতে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সংখ্যা পুরোপুরি কমে যাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়েছিল।

তৎকালীন নথিতে বলা হয়েছিল, এমন পরিস্থিতি কঠিন হলেও তা অত্যন্ত অসম্ভাব্য এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাও তৈরি ও হিসাব করা হয়েছিল।

দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের একীভূতকরণের সম্ভাব্য ব্যয় তখন ৫০ কোটি থেকে ৬৫ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলারের মধ্যে ধরা হয়েছিল। নথিতে বলা হয়েছিল, ব্যয় বেড়ে যাওয়া প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ছিল না। শিক্ষার্থীদের চাহিদা কমে যাওয়াকেই তুলনামূলক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার রাজ্য উন্নয়নমন্ত্রী ক্রিস পিকটনও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমানোর কেন্দ্রীয় নীতির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষা রাজ্যটির দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত।

তবে তিনি অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় একীভূতকরণের সময়কে ভুল বলে মনে করেন না। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়টির বৈশ্বিক অবস্থান উন্নত হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা, খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদসহ রাজ্যের বিকাশমান বিভিন্ন খাতে ভবিষ্যৎ সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পিকটনের ভাষ্য, একীভূতকরণের উদ্দেশ্য কেবল আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বাড়ানো ছিল না। রাজ্যের সামনে থাকা অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগানো এবং আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে শিল্পখাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ বাড়ানোও এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।

চলতি বছর কিউএস বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিংয়ে অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় ৭৯তম অবস্থানে উঠে এসেছে, যেখানে আগের বছর অবস্থান ছিল ৮২তম। টাইমস হায়ার এডুকেশন র‌্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ১৩৩তম এবং একাডেমিক র‌্যাঙ্কিং অব ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজে ১০১ থেকে ১৫০-এর মধ্যে রয়েছে।

❤️
👏
🙂
😞

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমায় চাপে অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়, ৯ কোটি ডলারের রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা

প্রকাশঃ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২০

অ্যাডিলেড, ২৭ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার নতুন অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত শিক্ষার্থী লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পিছিয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টি কয়েক কোটি ডলারের রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নীতির কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তিতে বড় ধরনের পতন হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় চলতি বছরের জানুয়ারিতে কার্যক্রম শুরু করে। প্রায় তিন বছর ধরে চলা একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়া একত্র হয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। এই একীভূতকরণে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া রাজ্য সরকার ৪৬ কোটি ৪৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলারের সহায়তা দিয়েছে।

একীভূতকরণের সময় তৈরি ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, ২০৩৪ সালের মধ্যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টি দুই পুরোনো প্রতিষ্ঠানের ২০২৩ সালের তুলনায় অতিরিক্ত ৬ হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণ করতে পারবে।

তবে চলতি বছরের পরিসংখ্যান সেই লক্ষ্যের বিপরীত চিত্র দেখাচ্ছে। অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত তাদের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৬ হাজার ৬৭৭। অথচ গত বছর একই সময়ে একীভূতকরণের আগের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ছিল ২০ হাজার ৮২০ জন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, গত দুই বছরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমাতে অস্ট্রেলীয় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন নীতির প্রভাবেই এই পতন হয়েছে।

এসব নীতির মধ্যে শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন ফি বাড়িয়ে ২ হাজার ৫০০ অস্ট্রেলীয় ডলার করা, শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বাড়ানো এবং নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তিতে সীমা আরোপের ব্যবস্থা রয়েছে। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় আসার সুযোগ সীমিত করার নতুন নীতিও ঘোষণা করেছেন।

অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ও বহিরাগত সম্পর্কবিষয়ক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক জেসিকা গ্যালাঘার বলেন, সরকারের সাম্প্রতিক নীতিগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণের সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, এসব পরিবর্তনের কারণে ২০৩৪ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ৬ হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির লক্ষ্যে পৌঁছানো এখন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।

মে মাসে অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিকোলা ফিলিপস জানিয়েছিলেন, প্রথম সেমিস্টারে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪০ শতাংশ কম হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৯ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, দ্বিতীয় সেমিস্টারেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তিতে প্রায় একই মাত্রার পতন দেখা গেছে।

তবে মে মাসে দেওয়া এক বার্তায় উপাচার্য জানিয়েছিলেন, কর্মীদের নিয়ে বড় ধরনের পুনর্গঠন করা হবে না এবং দেশীয় শিক্ষার্থী ভর্তির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক পথেই রয়েছে। একই সঙ্গে আগামী তিন বছর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

অধ্যাপক গ্যালাঘার জানান, বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে দেখেছে এবং অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রভাব বেশি অনুভব করেছে।

তাঁর ভাষ্য, অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল থেকে তুলনামূলক বেশি শিক্ষার্থী আসে। এসব দেশের শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার চীনসহ কয়েকটি বাজারের তুলনায় বেশি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও কমে গেলে এর উল্লেখযোগ্য আর্থিক প্রভাব পড়তে পারে।

অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়া ২০২২ সালের ডিসেম্বরে একীভূত হওয়ার বিষয়ে কাজ শুরু করে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে দুই প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া সরকারের ৪৬ কোটি ৪৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলারের সহায়তার মধ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণের জন্য ৩ কোটি ডলার বরাদ্দও ছিল।

তবে একীভূতকরণের আলোচনা মূলত অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের আগে হয়েছিল। মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা নীতিবিষয়ক অধ্যাপক অ্যান্ড্রু নর্টন বলেন, একীভূতকরণের সময়টি অনুকূল ছিল না।

তাঁর মতে, কয়েক বছর আগে এই একীভূতকরণ হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বাড়ানোর সুযোগ বেশি থাকত। কিন্তু একীভূতকরণের সময়ই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমানোর সরকারি নীতির সঙ্গে তা মিলে গেছে।

নর্টনের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া ফি কমে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যয় কমাতে ভবিষ্যতে আরও কর্মী পুনর্গঠনের পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান বা র‌্যাঙ্কিং উন্নত হলেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার চাহিদা কমে যাওয়ায় সেই উন্নতি থেকে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী পাওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে।

একীভূতকরণের সময় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমানোর মতো সরকারি নীতির সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক গ্যালাঘার বলেন, এত দ্রুত এতগুলো নীতি পরিবর্তন হবে, তা আগে থেকে অনুমান করা কঠিন ছিল।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়টি সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল বলেও জানান তিনি। ২০২৩ সালে দুই বিশ্ববিদ্যালয় একটি সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছিল, তারা সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক নিয়ে হিসাব করেছিল। এর মধ্যে একটি পরিস্থিতিতে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সংখ্যা পুরোপুরি কমে যাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়েছিল।

তৎকালীন নথিতে বলা হয়েছিল, এমন পরিস্থিতি কঠিন হলেও তা অত্যন্ত অসম্ভাব্য এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাও তৈরি ও হিসাব করা হয়েছিল।

দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের একীভূতকরণের সম্ভাব্য ব্যয় তখন ৫০ কোটি থেকে ৬৫ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলারের মধ্যে ধরা হয়েছিল। নথিতে বলা হয়েছিল, ব্যয় বেড়ে যাওয়া প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ছিল না। শিক্ষার্থীদের চাহিদা কমে যাওয়াকেই তুলনামূলক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার রাজ্য উন্নয়নমন্ত্রী ক্রিস পিকটনও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমানোর কেন্দ্রীয় নীতির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষা রাজ্যটির দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত।

তবে তিনি অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় একীভূতকরণের সময়কে ভুল বলে মনে করেন না। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়টির বৈশ্বিক অবস্থান উন্নত হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা, খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদসহ রাজ্যের বিকাশমান বিভিন্ন খাতে ভবিষ্যৎ সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পিকটনের ভাষ্য, একীভূতকরণের উদ্দেশ্য কেবল আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বাড়ানো ছিল না। রাজ্যের সামনে থাকা অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগানো এবং আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে শিল্পখাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ বাড়ানোও এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।

চলতি বছর কিউএস বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিংয়ে অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় ৭৯তম অবস্থানে উঠে এসেছে, যেখানে আগের বছর অবস্থান ছিল ৮২তম। টাইমস হায়ার এডুকেশন র‌্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ১৩৩তম এবং একাডেমিক র‌্যাঙ্কিং অব ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজে ১০১ থেকে ১৫০-এর মধ্যে রয়েছে।