যুক্তরাষ্ট্রে বসেই বাংলাদেশের এনআইডি, আবেদন ও কার্ড সংগ্রহের নিয়ম
- প্রকাশঃ ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৫৪
- / 8
ওয়াশিংটন, ১২ অক্টোবর, (প্রজন্ম কথা) – যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকেরা বাংলাদেশে না গিয়েও জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) জন্য আবেদন করতে পারেন। এ জন্য অনলাইনে আবেদন জমা দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেট জেনারেলে সশরীরে উপস্থিত হয়ে বায়োমেট্রিক তথ্য দিতে হয়।
ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, নতুন আবেদনকারীদের অনলাইনে ফরম পূরণ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা, বায়োমেট্রিক নিবন্ধন এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসের মাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের ধাপ অতিক্রম করতে হবে। আবেদন অনুমোদিত হলে অনলাইন থেকে এনআইডি ডাউনলোড করা যায়। স্মার্ট কার্ড দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেটে পৌঁছানোর পর তা সংগ্রহ করা সম্ভব।
ধাপ ১: আবেদনের যোগ্যতা যাচাই
দূতাবাসের নির্দেশনা অনুযায়ী, যাঁদের আগে বাংলাদেশের এনআইডি নেই এবং যাঁরা বাংলাদেশে এনআইডির জন্য আবেদন করেননি, তাঁরাই নতুন নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
নির্দেশনায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ১৬ বছরের বেশি বয়সী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের আবেদনের যোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনকারীর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হওয়ার প্রমাণ থাকতে হবে।
সাধারণত প্রয়োজন হবে বৈধ বা মেয়াদোত্তীর্ণ বাংলাদেশি পাসপোর্ট অথবা দূতাবাসের নির্ধারিত ঘোষণাপত্র। ঘোষণাপত্র ব্যবহার করলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত তিনজন বাংলাদেশি এনআইডিধারীর সত্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া ১৭ সংখ্যার বাংলাদেশি জন্মনিবন্ধন সনদ থাকতে হবে। পাসপোর্ট ও জন্মনিবন্ধনের তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।
তবে বয়সের শর্ত বা অন্য কোনো বিষয়ে দূতাবাসের ওয়েবপেজ ও নির্দেশিকার মধ্যে পার্থক্য থাকলে আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা কনস্যুলেটের কাছ থেকে সর্বশেষ নিয়ম নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত।
ধাপ ২: অনলাইনে আবেদনপত্র পূরণ
প্রথমে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সেবা পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে।
আবেদনের ওয়েবসাইট: https://services.nidw.gov.bd/nid-pub/
এরপর নতুন নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফরম-২(ক) পূরণ করতে হবে। আবেদনপত্রে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় সঠিক তথ্য দিতে হবে। নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের পরিচয় এবং বাংলাদেশের স্থায়ী ঠিকানা লেখার সময় পাসপোর্ট ও জন্মনিবন্ধনের তথ্য অনুসরণ করা জরুরি।
আবেদনের সময় সচল বাংলাদেশি মোবাইল নম্বর দিতে হবে। পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজনে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাচন অফিস ওই নম্বরে যোগাযোগ করতে পারে।
আবেদন জমা দেওয়ার পর ফরমটির মুদ্রিত কপি সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইনে বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে।
ধাপ ৩: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত
আবেদনের আগে প্রয়োজনীয় নথি গুছিয়ে রাখা জরুরি। দূতাবাসের নির্দেশনা অনুযায়ী সাধারণত যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে, সেগুলো হলো:
অনলাইনে পূরণ করা ফরম-২(ক)-এর মুদ্রিত কপি।
১৭ সংখ্যার বাংলাদেশি জন্মনিবন্ধন সনদের মূল কপি ও ফটোকপি।
বৈধ বা মেয়াদোত্তীর্ণ বাংলাদেশি পাসপোর্টের কপি।
পাসপোর্ট না থাকলে নির্ধারিত ঘোষণাপত্র এবং প্রয়োজনীয় সত্যায়ন।
সাম্প্রতিক পাসপোর্ট আকারের এক কপি ছবি।
বাবা-মায়ের এনআইডি, বাংলাদেশি জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মৃত্যু সনদ ও নাগরিকত্বের প্রমাণপত্রের কপি।
প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার বা দ্বৈত নাগরিকত্বের সনদ।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার আবেদনকারীদের অতিরিক্ত বিশেষ তথ্য ফরম পূরণ করতে হতে পারে।
কাগজপত্রের তালিকা আবেদনকারীর পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই অ্যাপয়েন্টমেন্টের আগে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা কনস্যুলেটের সর্বশেষ নির্দেশনা দেখে নেওয়া উচিত।
ধাপ ৪: দূতাবাস বা কনস্যুলেটে সশরীরে উপস্থিতি
অনলাইনে আবেদন করলেই এনআইডি নিবন্ধন সম্পন্ন হয় না। নির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্টের দিন আবেদনকারীকে নিজে বাংলাদেশ দূতাবাস বা তাঁর বসবাসের এলাকার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কনস্যুলেট জেনারেলে উপস্থিত হতে হবে।
সেখানে আবেদনকারীর আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিসের তথ্য, ছবি ও স্বাক্ষর নেওয়া হবে। বায়োমেট্রিক নিবন্ধন শেষে একটি স্লিপ দেওয়া হবে, যা পরবর্তী সময়ে স্মার্ট কার্ড সংগ্রহের জন্য প্রয়োজন হতে পারে।
তাই স্লিপটি যত্ন করে সংরক্ষণ করতে হবে। দূতাবাসে যাওয়ার আগে অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময়, সেবার নিয়ম এবং অতিরিক্ত কাগজপত্রের প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।
ধাপ ৫: বাংলাদেশের নির্বাচন অফিসে তথ্য যাচাই
বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের পর আবেদনকারীর তথ্য বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাচন অফিসে যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হবে। এ পর্যায়ে আবেদনকারীর পরিচয়, পারিবারিক তথ্য ও বাংলাদেশের স্থায়ী ঠিকানা যাচাই করা হতে পারে।
প্রয়োজনে অতিরিক্ত নথি চাওয়া হতে পারে। যেমন:
এসএসসি বা সমমানের শিক্ষাগত সনদ, জেএসসি বা পিএসসি সনদ।
দ্বৈত নাগরিকত্বের সনদ।
বাংলাদেশি ড্রাইভিং লাইসেন্স বা কর শনাক্তকরণ নম্বরের নথি।
বিবাহ বা তালাকের সনদ এবং স্বামী বা স্ত্রীর এনআইডি।
জাতীয়তা সনদ।
বাংলাদেশের ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে ইউটিলিটি বিল বা হোল্ডিং ট্যাক্সের রসিদ।
সব আবেদনকারীর ক্ষেত্রে সব নথি প্রয়োজন হবে না। যাচাইকারী অফিসের চাহিদা অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
ধাপ ৬: এনআইডি ডাউনলোড ও স্মার্ট কার্ড সংগ্রহ
তথ্য যাচাই ও অনুমোদনের পর এনআইডি প্রস্তুত হলে আবেদনকারী এনআইডি সেবা পোর্টালে নিজের অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে পরিচয়পত্র ডাউনলোড করতে পারবেন। এ জন্য আবেদন করার সময় ব্যবহৃত ব্যবহারকারীর নাম ও পাসওয়ার্ড সংরক্ষণ করা জরুরি।
অন্যদিকে, স্মার্ট এনআইডি কার্ড বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে প্রস্তুত হওয়ার পর দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেটে পাঠানো হতে পারে। কার্ড সেখানে পৌঁছালে নির্ধারিত নিয়মে সংগ্রহ করা যাবে।
তবে আবেদন থেকে স্মার্ট কার্ড হাতে পাওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নিশ্চিত নয়। বাংলাদেশের তথ্য যাচাই, অনুমোদন, কার্ড প্রস্তুত এবং যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর প্রক্রিয়ার ওপর সময় নির্ভর করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোন এলাকার আবেদনকারী কোথায় যাবেন?
আবেদনকারীর বসবাসের অঙ্গরাজ্য অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ মিশন নির্ধারিত হয়। ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী:
নিউইয়র্ক কনস্যুলেট: কানেকটিকাট, নিউ হ্যাম্পশায়ার, নিউ জার্সি, নিউইয়র্ক, মেইন, ম্যাসাচুসেটস, রোড আইল্যান্ড ও ভারমন্ট।
লস অ্যাঞ্জেলেস কনস্যুলেট: ক্যালিফোর্নিয়া, ওরেগন, ওয়াশিংটন, নেভাডা, আইডাহো, ইউটাহ, ওয়াইওমিং ও অ্যারিজোনা।
মায়ামি কনস্যুলেট: ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, আলাবামা, মিসিসিপি, লুইজিয়ানা, আরকানসাস, টেনেসি ও সাউথ ক্যারোলাইনা।
ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাস: তালিকাভুক্ত কনস্যুলেটগুলোর আওতার বাইরের অঙ্গরাজ্যগুলো।
সংশ্লিষ্ট মিশনের নির্দেশনা ও সেবার সময়সূচি যাচাই করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া উচিত।
আবেদনের আগে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
এই প্রক্রিয়া মূলত নতুন এনআইডি নিবন্ধনের জন্য। আগে থেকেই বাংলাদেশের এনআইডি থাকলে দূতাবাস বা কনস্যুলেটের এই প্রক্রিয়ায় নতুন নিবন্ধন করা যাবে না। সংশোধন বা অন্যান্য সেবার জন্য আলাদা নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
আবেদনপত্রে ভুল বা মিথ্যা তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের পরিচয় এবং বাংলাদেশের স্থায়ী ঠিকানা প্রামাণ্য নথির সঙ্গে মিলিয়ে দিতে হবে।
বয়সের যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফি ও অ্যাপয়েন্টমেন্টের নিয়ম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সেবা পোর্টাল এবং সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
সরকারি তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশ দূতাবাস, ওয়াশিংটন ডিসি: https://washington.mofa.gov.bd/pages/static-pages/6952668935ce18e1c05a9de3
২. বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সেবা: https://services.nidw.gov.bd/nid-pub/























