ঢাকা ১২:০৫ , Sat, ৩১ Oct ২০২৬
বিশ্বসমাচার
যুক্তরাষ্ট্র

দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক, পাচার করা অর্থে ব্যবসা গড়ার অভিযোগ আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে

আওয়াজ বিডি
  • প্রকাশঃ ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৯
  • / 4
ছবি: এআই- আওয়াজ বিডি

নিউইয়র্ক, ৩১ অক্টোবর, (প্রজন্ম কথা) – শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত অর্থনীতিবিষয়ক শ্বেতপত্রে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার অবৈধ আর্থিক বহিঃপ্রবাহের অনুমান তুলে ধরা হয়। এই অর্থের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে বিভিন্ন দেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নিউইয়র্কে কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তিতে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে এসব বিনিয়োগের সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ কিংবা আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসূত্র স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।

২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ক্ষমতায় আসার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছর সাত মাস দেশ পরিচালনা করেন শেখ হাসিনা। এ সময়ে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত শ্বেতপত্রে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত অবৈধ আর্থিক বহিঃপ্রবাহের পরিমাণ বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করা হয়। প্রতিবেদনে ব্যাংকঋণ কেলেঙ্কারি, ব্যাংকের মালিকানা দখল এবং অবৈধভাবে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়াসহ বিভিন্ন দুর্নীতির ধরন তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই হিসাব কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল বা বিদেশের কোনো নির্দিষ্ট সম্পত্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়ার পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও তাঁদের ঘনিষ্ঠদের একাংশ দেশের বাইরে অবস্থান নিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের কেউ ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে গেছেন। তবে বিদেশে অবস্থান করা মানেই অর্থ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

নিউইয়র্কে ব্যবসা ও সম্পত্তিতে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা

নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটস, ওজোন পার্ক, ব্রঙ্কস ও কুইন্সের কয়েকটি এলাকায় বাংলাদেশি মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা পরিবর্তন এবং নতুন বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে। কমিউনিটির বিভিন্ন মহলে কয়েকটি বড় মুদি দোকান ও সুপারমার্কেট কেনাবেচার খবরও ছড়িয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ বা স্থবির থাকা কিছু বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নতুন অর্থায়নে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও আলোচনা রয়েছে।

তবে এসব ব্যবসার নতুন মালিক বা বিনিয়োগকারীদের পরিচয়, অর্থের উৎস এবং বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য নথি বা স্বাধীন তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এসব বিনিয়োগকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের ব্যবহার হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে যাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত বা মামলা হয়েছে, তাঁদের কয়েকজনের যুক্তরাষ্ট্রে সম্পত্তি থাকার তথ্য অবশ্য সরকারি তদন্তে উঠে এসেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকনের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কে বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে অর্থের উৎস গোপন ও অর্থ পাচারের অভিযোগ এনেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। তবে এ অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি।

জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকা পাচারের মামলা

শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর আলমের সম্পদ ও ব্যাংক লেনদেন নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা তাঁর বাসার সাবেক এক কর্মীর ৪০০ কোটি টাকার সম্পদের কথা উল্লেখ করেছিলেন। পরে সংবাদমাধ্যমে ওই ব্যক্তি হিসেবে জাহাঙ্গীর আলমের নাম প্রকাশিত হয়।

দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে জাহাঙ্গীরের ২৩টি ব্যাংক হিসাবে ৬২৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে ৬২৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা উত্তোলন বা স্থানান্তর করা হয় বলে অনুসন্ধান-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ১৮ কোটি ২৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগেও মামলা করা হয়।

২০২৪ সালের অক্টোবরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগও তাঁর সম্পদ ও বিদেশে অর্থ সরানোর অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে পৃথক মামলা করে সংস্থাটি।

সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জাহাঙ্গীরের প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৫৬৫ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছিল। এসব অর্থের উৎস নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে সংস্থাটি। তদন্তকারীদের দাবি, জাহাঙ্গীরের স্ত্রী ও ভাইও এসব আর্থিক লেনদেনে যুক্ত ছিলেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাহাঙ্গীর ও তাঁর স্ত্রী ২০২৪ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং ভার্জিনিয়ায় অবস্থান করছেন।

হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের সম্পদ নিয়েও তদন্ত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সংস্থাটি জানায়, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। আয়কর নথি ও ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করে বৈধভাবে সম্পদ অর্জনের সক্ষমতা পাওয়া যায় প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। বাকি প্রায় ১৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকার সম্পদকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বলে উল্লেখ করে দুদক।

তাঁর ভাই এবিএম শাহরিয়ারের বিরুদ্ধেও প্রায় ১৮ কোটি ২৮ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় দুজনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুদক। অভিযোগগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

আশরাফুল আলম খোকনের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কে বাড়ি কেনার অভিযোগ

শেখ হাসিনার সাবেক ডেপুটি প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন ও তাঁর স্ত্রী রিজওয়ানা নূরকে ঘিরেও আর্থিক অনুসন্ধান করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

২০২৫ সালের ২৭ মার্চ তাঁদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৭ কোটি ৩ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুটি মামলা করে দুদক। এর মধ্যে খোকনের বিরুদ্ধে ১৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা এবং তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে ৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়।

দুদকের অভিযোগে বলা হয়, খোকন অর্থের উৎস গোপন ও স্থানান্তরের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে একটি বাড়ি কিনেছেন। এ ঘটনায় অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনের ধারাও যুক্ত করা হয়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়া বাকি।

ব্যাংকঋণ কেলেঙ্কারির মামলায় পিকে হালদার ও অন্যরা

ব্যাংকিং খাতের ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগেও একাধিক মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। ২০২৫ সালের ২৬ জুন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার এবং সাদ মুসা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসিনসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে সংস্থাটি।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, মাহমুদ সাজিদ কটন মিলসের ৩৫ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ২৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং সাইমা সামিরা টেক্সটাইল মিলসের ২৫ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ২০ কোটি ৫২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ঋণ অনুমোদন ও অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও আনা হয়েছে। মামলাগুলোর আসামিদের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

বিদেশে সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি

জাহাঙ্গীর আলম, হারুন অর রশীদ ও আশরাফুল আলম খোকনের বিরুদ্ধে তদন্ত বা মামলার তথ্য সামনে আসার পর বিদেশে সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস নিয়ে আলোচনা নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে নিউইয়র্কে বাড়ি কেনা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা পরিবর্তন এবং নতুন বিনিয়োগের অর্থ কোথা থেকে আসছে, তা যাচাইয়ের দাবি উঠছে।

তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যে আরও কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম উঠে এলেও তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার বা নিউইয়র্কে ব্যবসায় বিনিয়োগের নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কারও বিরুদ্ধে মামলা বা তদন্ত থাকলে তার প্রকৃতি ও অভিযোগের পরিধি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা বা সম্পত্তি কেনা নিজে কোনো অপরাধ নয়। তবে অর্থের উৎস অবৈধ হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী অর্থ পাচার, কর ফাঁকি বা আর্থিক অপরাধের তদন্ত হতে পারে। এ কারণে নিউইয়র্কে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের নথি যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টদের রাজনৈতিক তৎপরতা

এদিকে নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়েও আলোচনা চলছে। ব্রঙ্কস, কুইন্স ও জ্যাকসন হাইটসসহ বিভিন্ন এলাকায় দলীয় অনুষ্ঠান, সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সাবেক নেতা ও সংগঠকদের উপস্থিতির খবর পাওয়া যাচ্ছে।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান ও শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলসহ কয়েকজন পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিতি আলোচনায় এসেছে। তবে এসব কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশে রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত করার কোনো বৃহত্তর পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রবাসে দলীয় সংগঠনগুলোর কার্যক্রম কতটা বিস্তৃত হচ্ছে, বিভিন্ন শহরের নেতাকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ কীভাবে বাড়ছে এবং এসব কর্মসূচির রাজনৈতিক লক্ষ্য কী, তা পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের সামগ্রিক অভিযোগ, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত এবং নিউইয়র্কে ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন বিনিয়োগের আলোচনা একসঙ্গে সামনে এলেও, এগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আর্থিক নথি, সম্পত্তির মালিকানা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের তথ্য প্রয়োজন। অভিযোগ ও প্রমাণের পার্থক্য বজায় রেখেই বিষয়টি অনুসন্ধান করা জরুরি।

❤️
👏
🙂
😞

দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক, পাচার করা অর্থে ব্যবসা গড়ার অভিযোগ আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে

প্রকাশঃ ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৯

নিউইয়র্ক, ৩১ অক্টোবর, (প্রজন্ম কথা) – শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত অর্থনীতিবিষয়ক শ্বেতপত্রে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার অবৈধ আর্থিক বহিঃপ্রবাহের অনুমান তুলে ধরা হয়। এই অর্থের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে বিভিন্ন দেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নিউইয়র্কে কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তিতে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে এসব বিনিয়োগের সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ কিংবা আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসূত্র স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।

২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ক্ষমতায় আসার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছর সাত মাস দেশ পরিচালনা করেন শেখ হাসিনা। এ সময়ে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত শ্বেতপত্রে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত অবৈধ আর্থিক বহিঃপ্রবাহের পরিমাণ বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করা হয়। প্রতিবেদনে ব্যাংকঋণ কেলেঙ্কারি, ব্যাংকের মালিকানা দখল এবং অবৈধভাবে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়াসহ বিভিন্ন দুর্নীতির ধরন তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই হিসাব কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল বা বিদেশের কোনো নির্দিষ্ট সম্পত্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়ার পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও তাঁদের ঘনিষ্ঠদের একাংশ দেশের বাইরে অবস্থান নিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের কেউ ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে গেছেন। তবে বিদেশে অবস্থান করা মানেই অর্থ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

নিউইয়র্কে ব্যবসা ও সম্পত্তিতে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা

নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটস, ওজোন পার্ক, ব্রঙ্কস ও কুইন্সের কয়েকটি এলাকায় বাংলাদেশি মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা পরিবর্তন এবং নতুন বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে। কমিউনিটির বিভিন্ন মহলে কয়েকটি বড় মুদি দোকান ও সুপারমার্কেট কেনাবেচার খবরও ছড়িয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ বা স্থবির থাকা কিছু বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নতুন অর্থায়নে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও আলোচনা রয়েছে।

তবে এসব ব্যবসার নতুন মালিক বা বিনিয়োগকারীদের পরিচয়, অর্থের উৎস এবং বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য নথি বা স্বাধীন তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এসব বিনিয়োগকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের ব্যবহার হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে যাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত বা মামলা হয়েছে, তাঁদের কয়েকজনের যুক্তরাষ্ট্রে সম্পত্তি থাকার তথ্য অবশ্য সরকারি তদন্তে উঠে এসেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকনের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কে বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে অর্থের উৎস গোপন ও অর্থ পাচারের অভিযোগ এনেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। তবে এ অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি।

জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকা পাচারের মামলা

শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর আলমের সম্পদ ও ব্যাংক লেনদেন নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা তাঁর বাসার সাবেক এক কর্মীর ৪০০ কোটি টাকার সম্পদের কথা উল্লেখ করেছিলেন। পরে সংবাদমাধ্যমে ওই ব্যক্তি হিসেবে জাহাঙ্গীর আলমের নাম প্রকাশিত হয়।

দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে জাহাঙ্গীরের ২৩টি ব্যাংক হিসাবে ৬২৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে ৬২৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা উত্তোলন বা স্থানান্তর করা হয় বলে অনুসন্ধান-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ১৮ কোটি ২৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগেও মামলা করা হয়।

২০২৪ সালের অক্টোবরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগও তাঁর সম্পদ ও বিদেশে অর্থ সরানোর অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে পৃথক মামলা করে সংস্থাটি।

সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জাহাঙ্গীরের প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৫৬৫ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছিল। এসব অর্থের উৎস নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে সংস্থাটি। তদন্তকারীদের দাবি, জাহাঙ্গীরের স্ত্রী ও ভাইও এসব আর্থিক লেনদেনে যুক্ত ছিলেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাহাঙ্গীর ও তাঁর স্ত্রী ২০২৪ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং ভার্জিনিয়ায় অবস্থান করছেন।

হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের সম্পদ নিয়েও তদন্ত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সংস্থাটি জানায়, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। আয়কর নথি ও ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করে বৈধভাবে সম্পদ অর্জনের সক্ষমতা পাওয়া যায় প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। বাকি প্রায় ১৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকার সম্পদকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বলে উল্লেখ করে দুদক।

তাঁর ভাই এবিএম শাহরিয়ারের বিরুদ্ধেও প্রায় ১৮ কোটি ২৮ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় দুজনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুদক। অভিযোগগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

আশরাফুল আলম খোকনের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কে বাড়ি কেনার অভিযোগ

শেখ হাসিনার সাবেক ডেপুটি প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন ও তাঁর স্ত্রী রিজওয়ানা নূরকে ঘিরেও আর্থিক অনুসন্ধান করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

২০২৫ সালের ২৭ মার্চ তাঁদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৭ কোটি ৩ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুটি মামলা করে দুদক। এর মধ্যে খোকনের বিরুদ্ধে ১৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা এবং তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে ৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়।

দুদকের অভিযোগে বলা হয়, খোকন অর্থের উৎস গোপন ও স্থানান্তরের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে একটি বাড়ি কিনেছেন। এ ঘটনায় অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনের ধারাও যুক্ত করা হয়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়া বাকি।

ব্যাংকঋণ কেলেঙ্কারির মামলায় পিকে হালদার ও অন্যরা

ব্যাংকিং খাতের ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগেও একাধিক মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। ২০২৫ সালের ২৬ জুন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার এবং সাদ মুসা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসিনসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে সংস্থাটি।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, মাহমুদ সাজিদ কটন মিলসের ৩৫ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ২৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং সাইমা সামিরা টেক্সটাইল মিলসের ২৫ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ২০ কোটি ৫২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ঋণ অনুমোদন ও অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও আনা হয়েছে। মামলাগুলোর আসামিদের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

বিদেশে সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি

জাহাঙ্গীর আলম, হারুন অর রশীদ ও আশরাফুল আলম খোকনের বিরুদ্ধে তদন্ত বা মামলার তথ্য সামনে আসার পর বিদেশে সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস নিয়ে আলোচনা নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে নিউইয়র্কে বাড়ি কেনা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা পরিবর্তন এবং নতুন বিনিয়োগের অর্থ কোথা থেকে আসছে, তা যাচাইয়ের দাবি উঠছে।

তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যে আরও কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম উঠে এলেও তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার বা নিউইয়র্কে ব্যবসায় বিনিয়োগের নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কারও বিরুদ্ধে মামলা বা তদন্ত থাকলে তার প্রকৃতি ও অভিযোগের পরিধি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা বা সম্পত্তি কেনা নিজে কোনো অপরাধ নয়। তবে অর্থের উৎস অবৈধ হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী অর্থ পাচার, কর ফাঁকি বা আর্থিক অপরাধের তদন্ত হতে পারে। এ কারণে নিউইয়র্কে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের নথি যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টদের রাজনৈতিক তৎপরতা

এদিকে নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়েও আলোচনা চলছে। ব্রঙ্কস, কুইন্স ও জ্যাকসন হাইটসসহ বিভিন্ন এলাকায় দলীয় অনুষ্ঠান, সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সাবেক নেতা ও সংগঠকদের উপস্থিতির খবর পাওয়া যাচ্ছে।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান ও শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলসহ কয়েকজন পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিতি আলোচনায় এসেছে। তবে এসব কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশে রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত করার কোনো বৃহত্তর পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রবাসে দলীয় সংগঠনগুলোর কার্যক্রম কতটা বিস্তৃত হচ্ছে, বিভিন্ন শহরের নেতাকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ কীভাবে বাড়ছে এবং এসব কর্মসূচির রাজনৈতিক লক্ষ্য কী, তা পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের সামগ্রিক অভিযোগ, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত এবং নিউইয়র্কে ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন বিনিয়োগের আলোচনা একসঙ্গে সামনে এলেও, এগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আর্থিক নথি, সম্পত্তির মালিকানা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের তথ্য প্রয়োজন। অভিযোগ ও প্রমাণের পার্থক্য বজায় রেখেই বিষয়টি অনুসন্ধান করা জরুরি।