ঢাকা ০৩:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগে বাড়ছে আগ্রহ, কারণ কী?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • প্রকাশঃ ০২:৩৯:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
  • / 5

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব একসময় বিশ্বের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত পরিচয় হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছায় মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করছেন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিস (আইআরএস) প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট ৪ হাজার ৮৮৯ জন মার্কিন নাগরিক আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। অভিবাসন ও কর বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০২৬ সালে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ৪০ হাজারেরও বেশি প্রবাসী আমেরিকান নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে রয়েছেন।

নিউজিল্যান্ডে বসবাসকারী ৩৪ বছর বয়সী ইরিন ক্লাট এদের একজন। ২০১৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে নিউজিল্যান্ডে স্থায়ী হন এবং এক দশক পর আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। তিনি বলেন, “আমি কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খুব গভীরভাবে নিজেকে যুক্ত অনুভব করিনি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিদেশে থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের করব্যবস্থার আওতায় থাকার বিষয়টি আমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। এখন আমার কোনো অনুশোচনা নেই।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রধান কারণ অর্থনৈতিক চাপ।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের খুব অল্প কয়েকটি দেশের একটি, যারা নাগরিকত্বের ভিত্তিতে কর আরোপ করে। অর্থাৎ একজন মার্কিন নাগরিক পৃথিবীর যে দেশেই বসবাস করুন না কেন, নির্দিষ্ট শর্তে তাকে কর-সংক্রান্ত তথ্য যুক্তরাষ্ট্রে জমা দিতে হয়। ফরেন অ্যাকাউন্ট ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স অ্যাক্ট (FATCA) কার্যকর হওয়ার পর এই বাধ্যবাধকতা আরও কঠোর হয়েছে।

এর ফলে বিদেশে বসবাসকারী লাখো আমেরিকানের ওপর প্রভাব পড়েছে। ইউরোপের অনেক ব্যাংক জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকদের, যাদের অনেকেই কখনো যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসও করেননি, তাদের অ্যাকাউন্ট খুলতে বা আর্থিক সেবা দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। এতে গৃহঋণ, অবসরকালীন সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে জটিল হয়ে উঠেছে।

নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়ায় আরেকটি পরিবর্তন এসেছে। চলতি বছর মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এই আবেদন ফি ২ হাজার ৩৫০ ডলার থেকে কমিয়ে ৪৫০ ডলারে নামিয়ে এনেছে। প্রায় ৮০ শতাংশ ফি কমানোর পর আবেদন সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তবে এই সিদ্ধান্ত সহজ নয়। মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হলে আগে অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করতে হয়। এরপর পাঁচ বছরের কর-সংক্রান্ত নথিপত্র জমা, মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটে সশরীরে উপস্থিত হয়ে শপথ গ্রহণ এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। যাদের সম্পদের পরিমাণ ২০ লাখ ডলারের বেশি, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কর বিধানও প্রযোজ্য হয়।

আইনজীবীরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি একবারের এবং স্থায়ী সিদ্ধান্ত। নাগরিকত্ব ত্যাগের পর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য ভিসা লাগবে এবং সেই ভিসা পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই সাময়িক রাজনৈতিক ক্ষোভ বা স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সুবিধার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

প্রবাসী আমেরিকানদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন Americans Overseas-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ড্যান ডারলাখার বলেন, “আপনি যদি মার্কিন নাগরিক হন, তাহলে এখনও আপনার ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার ব্যবহার করে পরিবর্তনের চেষ্টা করা যেতে পারে।”

মার্কিন নাগরিকত্ব আজও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হিসেবে বিবেচিত হলেও বৈশ্বিক জীবনযাত্রা, করনীতি এবং পরিবর্তিত বাস্তবতার কারণে এটি ধরে রাখার ব্যয়ও অনেকের কাছে বাড়ছে। সেই বাস্তবতার মধ্যেই এক সময়ের কাঙ্ক্ষিত নাগরিকত্ব এখন অনেকের জন্য কঠিন কিন্তু বাস্তব সিদ্ধান্তে পরিণত হচ্ছে।

শেয়ার করুন

মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগে বাড়ছে আগ্রহ, কারণ কী?

প্রকাশঃ ০২:৩৯:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব একসময় বিশ্বের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত পরিচয় হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছায় মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করছেন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিস (আইআরএস) প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট ৪ হাজার ৮৮৯ জন মার্কিন নাগরিক আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। অভিবাসন ও কর বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০২৬ সালে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ৪০ হাজারেরও বেশি প্রবাসী আমেরিকান নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে রয়েছেন।

নিউজিল্যান্ডে বসবাসকারী ৩৪ বছর বয়সী ইরিন ক্লাট এদের একজন। ২০১৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে নিউজিল্যান্ডে স্থায়ী হন এবং এক দশক পর আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। তিনি বলেন, “আমি কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খুব গভীরভাবে নিজেকে যুক্ত অনুভব করিনি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিদেশে থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের করব্যবস্থার আওতায় থাকার বিষয়টি আমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। এখন আমার কোনো অনুশোচনা নেই।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রধান কারণ অর্থনৈতিক চাপ।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের খুব অল্প কয়েকটি দেশের একটি, যারা নাগরিকত্বের ভিত্তিতে কর আরোপ করে। অর্থাৎ একজন মার্কিন নাগরিক পৃথিবীর যে দেশেই বসবাস করুন না কেন, নির্দিষ্ট শর্তে তাকে কর-সংক্রান্ত তথ্য যুক্তরাষ্ট্রে জমা দিতে হয়। ফরেন অ্যাকাউন্ট ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স অ্যাক্ট (FATCA) কার্যকর হওয়ার পর এই বাধ্যবাধকতা আরও কঠোর হয়েছে।

এর ফলে বিদেশে বসবাসকারী লাখো আমেরিকানের ওপর প্রভাব পড়েছে। ইউরোপের অনেক ব্যাংক জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকদের, যাদের অনেকেই কখনো যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসও করেননি, তাদের অ্যাকাউন্ট খুলতে বা আর্থিক সেবা দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। এতে গৃহঋণ, অবসরকালীন সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে জটিল হয়ে উঠেছে।

নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়ায় আরেকটি পরিবর্তন এসেছে। চলতি বছর মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এই আবেদন ফি ২ হাজার ৩৫০ ডলার থেকে কমিয়ে ৪৫০ ডলারে নামিয়ে এনেছে। প্রায় ৮০ শতাংশ ফি কমানোর পর আবেদন সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তবে এই সিদ্ধান্ত সহজ নয়। মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হলে আগে অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করতে হয়। এরপর পাঁচ বছরের কর-সংক্রান্ত নথিপত্র জমা, মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটে সশরীরে উপস্থিত হয়ে শপথ গ্রহণ এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। যাদের সম্পদের পরিমাণ ২০ লাখ ডলারের বেশি, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কর বিধানও প্রযোজ্য হয়।

আইনজীবীরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি একবারের এবং স্থায়ী সিদ্ধান্ত। নাগরিকত্ব ত্যাগের পর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য ভিসা লাগবে এবং সেই ভিসা পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই সাময়িক রাজনৈতিক ক্ষোভ বা স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সুবিধার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

প্রবাসী আমেরিকানদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন Americans Overseas-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ড্যান ডারলাখার বলেন, “আপনি যদি মার্কিন নাগরিক হন, তাহলে এখনও আপনার ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার ব্যবহার করে পরিবর্তনের চেষ্টা করা যেতে পারে।”

মার্কিন নাগরিকত্ব আজও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হিসেবে বিবেচিত হলেও বৈশ্বিক জীবনযাত্রা, করনীতি এবং পরিবর্তিত বাস্তবতার কারণে এটি ধরে রাখার ব্যয়ও অনেকের কাছে বাড়ছে। সেই বাস্তবতার মধ্যেই এক সময়ের কাঙ্ক্ষিত নাগরিকত্ব এখন অনেকের জন্য কঠিন কিন্তু বাস্তব সিদ্ধান্তে পরিণত হচ্ছে।