যুদ্ধবিরতিতে আজই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি, কী থাকছে সমঝোতায়?
- প্রকাশঃ ০৩:০৭:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
- / 3
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মোজতবা খামেনি। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে একটি প্রাথমিক চুক্তি রোববার স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে ইরান বলছে, চুক্তি স্বাক্ষর রোববার নয়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে হতে পারে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে চুক্তিতে সই করবেন।
শনিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, “আগামীকাল (আজ) চুক্তিটি সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি সই হওয়ার পরপর হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, পুরো প্রক্রিয়া দ্রুত, সহজ ও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে।
এর আগে শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, “আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন শান্তিচুক্তির আরও কাছাকাছি অবস্থানে আছি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুক্তির চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হতে পারে। এরপরই শান্তিচুক্তি ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সই হবে। পাকিস্তান এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর পরের সপ্তাহে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা হবে।”
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের সুনির্দিষ্ট সময় নিয়ে অপেক্ষা করতে হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তি রোববার নয়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে স্বাক্ষর হতে পারে।
এদিকে সম্ভাব্য চুক্তির আলোচনা চললেও শনিবার ভোরে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একাধিক ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ইরানের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সব পক্ষের আশাবাদ
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের কর্মকর্তারা গত শুক্রবার থেকে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। যুদ্ধ শুরুর পর গত তিন মাসে এ ধরনের ইতিবাচক বার্তা আগে দেখা যায়নি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার এক্সে লিখেছেন, “ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছেছে।”
পরে তিনি দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তিনি জানান, চুক্তি ইলেকট্রনিক বা দূরবর্তী পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হবে।
অন্যদিকে পশ্চিমা এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। ট্রাম্পও একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সম্ভাব্য চুক্তিতে ইরান বেশি সুবিধা পাচ্ছে বলে যে আলোচনা চলছে, তার জবাবে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “ইরান যেসব শর্ত ফাঁস করেছে, তার সঙ্গে লিখিতভাবে যেসব শর্তে সম্মতি হয়েছে, তার কোনো সম্পর্ক নেই।”
চুক্তিতে কী থাকতে পারে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত সমঝোতা চুক্তির ধারাগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হতে পারে।
এ ছাড়া ইরানের বন্দরগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং জব্দ অর্থের একটি অংশ ছাড় দেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, প্রাথমিক এই চুক্তিতে পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। এ বিষয়ে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে পৃথক আলোচনা হবে।
হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, প্রাথমিক সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি বাতিল এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস অথবা অন্যত্র স্থানান্তরে সম্মত হয়েছে। তবে ইরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরানের অবস্থান হলো, ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে নেওয়া হবে না; দেশে রেখেই এর সমৃদ্ধির মাত্রা কমানো হবে।
যুদ্ধবিরতি থেকে চুক্তির পথে
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। ৪০ দিনের সংঘাতের পর ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশ সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
পরবর্তী সময়ে ১১ ও ১২ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রায় ২১ ঘণ্টার বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। এরপর থেকে নতুন করে আলোচনার চেষ্টা চলছিল। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের কর্মকর্তারা সরাসরি উপস্থিত না থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সংঘাতের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির একাধিক শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, খামেনির জানাজার আনুষ্ঠানিকতা আগামী ৪ জুলাই শুরু হবে এবং ৯ জুলাই মাশহাদে তাঁকে দাফন করা হবে।
ইউরেনিয়াম মজুত আরও সুরক্ষিত করেছে ইরান
এদিকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিরাপদ রাখতে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সম্ভাব্য অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র যাতে ইউরেনিয়াম দখল করতে না পারে, সে জন্য কিছু টানেল ধ্বংস করা হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রবেশপথে বিস্ফোরক মাইন বসানো হয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যার সক্ষমতা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মজুত দখল বা অপসারণের কাজ এখন আগের তুলনায় আরও জটিল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।





















