যুদ্ধের ক্ষতি সত্ত্বেও পারমাণবিক আলোচনায় আত্মবিশ্বাসী ইরান
- প্রকাশঃ ১১:৪১:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
- / 1
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর নতুন করে পারমাণবিক আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। যুদ্ধের সময় উল্লেখযোগ্য সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়লেও তেহরান নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী হিসেবে তুলে ধরছে। দেশটির নেতারা এই সমঝোতাকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে প্রচার করছেন এবং দাবি করছেন, এটি ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতার স্বীকৃতি।
যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক সমঝোতার পর ইরানের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, সামরিক কর্মকর্তা ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব একে দেশের দৃঢ়তা ও প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ইরান চূড়ান্ত বিজয়ের পথে একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে।
একইভাবে সরকারের কার্যক্রম তদারককারী শক্তিশালী পরিষদের চেয়ারম্যান সাদেঘ আমোলি লারিজানি দাবি করেছেন, ইরানি জনগণ নতুন করে প্রতিরোধের চেতনা প্রদর্শন করেছে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উৎখাতের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দিয়েছে।
তবে যুদ্ধ চলাকালে ইরানকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। দেশটির কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত। পাশাপাশি নৌ অবরোধের কারণে অর্থনীতির ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তারপরও তেহরানের নেতৃত্ব মনে করছে, চুক্তির শর্তাবলি যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ‘সম্পূর্ণ বিজয়’ এবং ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এর লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের পর ইরানের ক্ষমতার কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে। কিছু বাস্তববাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নিহত হওয়ায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। এর ফলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় ইরানের অবস্থান আরও কঠোর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যও ইরানের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেছেন এবং বর্তমান ইরানি নেতৃত্বকে তুলনামূলকভাবে ‘বাস্তববাদী’ বলে উল্লেখ করেছেন।
চুক্তি অনুযায়ী, ইরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে। তবে তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে, ভবিষ্যতে এই প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ফি আদায় করা হতে পারে, যা যুদ্ধের আগে প্রচলিত ছিল না।
মিসৌরি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ইরান বিশেষজ্ঞ মেহরজাদ বোরুজেরদি বলেন, সাম্প্রতিক চুক্তি ইরানকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে। এত বড় সামরিক ক্ষতির পরও কূটনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার এমন উদাহরণ খুব কম দেখা যায়।
জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের গবেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের ভূমিকা এখন কার্যত স্বীকৃতি পাচ্ছে এবং আঞ্চলিক দেশগুলোও সংঘাতের পরিবর্তে সমঝোতার পথ খুঁজছে।
তিনি জানান, ইরান আলোচনায় লেবাননের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছে। তেহরানের দাবি, চুক্তির আওতায় লেবাননেও সংঘাত কমানোর বিষয় রয়েছে। যদিও ইসরাইল এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে।
এদিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল বিষয়গুলো, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে কী ধরনের সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হবে, তা পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে নতুন দফার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মবিশ্বাসী অবস্থান নিয়ে আলোচনায় অংশ নিতে যাওয়া ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সহজে ছাড় দিতে রাজি হবে না। ফলে আসন্ন পারমাণবিক আলোচনা যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্থায়িত্ব এবং দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।

























