বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর বেশিরভাগই বিশ্বকাপের বাইরে
- প্রকাশঃ ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:০১
- / 4
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসর বিশ্বকাপে এবারও অনুপস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ১০টি দেশের আটটি। বর্তমান আসরে জনসংখ্যার দিক থেকে শীর্ষ দশ দেশের মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল অংশ নিতে পেরেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এত বিশাল জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও কেন ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চীন কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো এখনো বিশ্বকাপে নিয়মিত জায়গা করে নিতে পারছে না?
আর্জেন্টিনার হয়ে লিওনেল মেসির গোল উদযাপনে যেমন বাংলাদেশের রাস্তায় হাজারো মানুষ উল্লাসে মেতে ওঠেন, তেমনি ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশেও আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকদের ঢল নামে। কারণ, নিজেদের জাতীয় দল এখনো বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নিয়মিত খেলতে পারে না।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত ১৯৫০ সালে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলেও প্রতিযোগিতা শুরুর আগেই নাম প্রত্যাহার করে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইথিওপিয়া এখনো কখনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে পারেনি। অন্যদিকে চীন ও ইন্দোনেশিয়া মাত্র একবার করে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। বাংলাদেশের অভিনেতা, লেখক ও ফুটবলপ্রেমী অদিতে করিম বিবিসিকে বলেন, “লক্ষ লক্ষ ফুটবল সমর্থকের একটি দেশ ফুটবলে এতটা পিছিয়ে থাকবে—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ও Soccernomics–এর সহলেখক স্টেফান শিমানস্কির মতে, শুধু জনসংখ্যা বেশি হলেই ফুটবলে সাফল্য আসে না। উন্নত প্রশিক্ষণ অবকাঠামো, প্রতিভা বিকাশের ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, “একটি দেশের মানুষ যত বেশি, সম্ভাব্য খেলোয়াড়ের সংখ্যাও তত বেশি। কিন্তু সেই প্রতিভা বিকাশের জন্য উন্নত অবকাঠামো ও বিনিয়োগও প্রয়োজন।”
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপজয়ী অধিকাংশ দেশের মাথাপিছু আয় তুলনামূলক বেশি। তবে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মতো ব্যতিক্রমী দেশগুলোর সাফল্যের পেছনে শতবর্ষের ফুটবল ঐতিহ্য, শক্তিশালী ঘরোয়া কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বড় ভূমিকা রেখেছে।
মাত্র সাড়ে ৩৫ লাখ জনসংখ্যার উরুগুয়ে দুটি বিশ্বকাপ জিতেছে। একইভাবে মরক্কো ২০২২ সালে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছায় এবং দক্ষিণ কোরিয়া ২০০২ সালে শেষ চারে খেলেছিল। অন্যদিকে ইথিওপিয়া বিনিয়োগ ও অবকাঠামোর সংকটে পিছিয়ে পড়েছে। দেশটির পেশাদার লিগে পর্যাপ্ত স্টেডিয়ামের অভাব রয়েছে এবং জাতীয় দলকে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ‘হোম ম্যাচ’ও মরক্কোতে গিয়ে খেলতে হয়েছে।
ভারতে ফুটবলের অগ্রগতিতে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তাকে বড় বাধা হিসেবে দেখেন সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলার শ্যাম থাপা। তবে বাংলাদেশের অদিতে করিম মনে করেন, ক্রিকেটকে দায়ী করা একটি অজুহাত মাত্র। তার মতে, “বিশ্বকাপে খেলার মতো দল গড়তে যে ধরনের পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দরকার, আমাদের দেশে সেটিরই অভাব রয়েছে।”
চীনের ক্ষেত্রেও বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদি ফুটবল পরিকল্পনার ঘাটতি দেশটির অন্যতম সমস্যা। ইন্দোনেশিয়া ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ভালো করলেও তাদের দলে ইউরোপে বেড়ে ওঠা ইন্দোনেশীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের ওপর নির্ভরতা বেশি ছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এশিয়া অঞ্চলের বাছাইপর্বে ছয়টি ম্যাচ খেলেও একটি জয় পায়নি।
সব সীমাবদ্ধতার পরও বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের আবেগে কোনো ঘাটতি নেই। অদিতে করিম বলেন, “বর্তমান বাস্তবতায় আমার জীবদ্দশায় বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে খেলতে দেখার সম্ভাবনা দেখি না। তবুও বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা বিশ্বকাপের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করবে।”






















