ঢাকা ০৯:৩২ , Mon, ০৩ Aug ২০২৬

ভিসা নিয়ে প্রবেশ করতে হয়, আছে নিজস্ব মুদ্রাও; বছরে একদিনের জন্য প্রতীকী রাজ্যে পরিণত হয় এস্তোনিয়ার একটি গ্রাম

ফাহমিদা আক্তার
  • প্রকাশঃ ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৭:৩৪
  • / 3
এস্তোনিয়ার মিকিতামায়ে গ্রামে সেতো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী ‘কিংডম ডে’ উৎসবে অংশ নিচ্ছেন স্থানীয়রা ছবি: ওয়াশিংটন পোস্ট

এস্তোনিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি ছোট্ট গ্রাম বছরে একদিনের জন্য রূপ নেয় একটি প্রতীকী রাজ্যে। সেখানে প্রবেশের জন্য দেওয়া হয় প্রতীকী ভিসা, চালু থাকে নিজস্ব প্রতীকী মুদ্রা এবং আয়োজন করা হয় সামরিক কুচকাওয়াজের আদলে প্রদর্শনী। এই আয়োজনের উদ্দেশ্য কোনো রাষ্ট্র পরিচালনা নয়, বরং বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা সেতো জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার দক্ষিণ-পূর্ব এস্তোনিয়ার মিকিতামায়ে গ্রামে সেতো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী ‘কিংডম ডে’ বা ‘রাজ্য দিবস’ উদ্‌যাপন করা হয়। উৎসবের মাঠে অ্যাকর্ডিয়নের সুরে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নাচতে দেখা যায় ৮০ বছর বয়সী মাইমে কাপতেনকে। তাঁর গলায় ঝুলছিল রুপার চেইন ও মুদ্রা, যার ঝনঝন শব্দ সেতো নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য।

সেতো জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এস্তোনিয়া ও রাশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। তাদের কখনো স্বাধীন কোনো রাজ্য ছিল না। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এস্তোনিয়া ও রাশিয়ার সীমান্ত নির্ধারণের ফলে তাদের ঐতিহাসিক আবাসভূমি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।

এর ফলে সীমান্তের দুই পাশে থাকা পরিবার ও স্বজনদের যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়ে। আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করা কিংবা পূর্বপুরুষদের কবর জিয়ারত করতেও অনেকের ভিসার প্রয়োজন হতে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৪ সালে প্রতীকী ‘সেতো রাজ্য’ উৎসবের সূচনা হয়। আয়োজনটির লক্ষ্য বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীকে একত্র করা, সেতো সংস্কৃতির প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং তাদের ভাষা সংরক্ষণে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

এস্তোনিয়ার ২০২১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ সেতো ভাষা বলতে পারেন। তবে ভাষাবিদদের ধারণা, দৈনন্দিন জীবনে এই ভাষা ব্যবহার করেন মাত্র কয়েক হাজার মানুষ। সেতো ভাষা এস্তোনীয় ভাষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত হলেও সেতো জনগোষ্ঠী এটিকে একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে বিবেচনা করে।

প্রতিবছর এই উৎসবে সেতো সম্প্রদায়ের একজন নতুন প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়, যিনি ‘উলেমসুতস্কা’ নামে পরিচিত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি সেতোদের পৌরাণিক রাজা পেকোর পক্ষ থেকে জনগণের কাছে বার্তা পৌঁছে দেন। এবার এই দায়িত্ব পেয়েছেন লোকজ পোশাক নির্মাতা ইংরিত কালা। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর প্রধান লক্ষ্য সেতো সংস্কৃতির প্রচার এবং ভাষা সংরক্ষণে কাজ করা।

উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ প্রাচীন ‘লেলো’ গান। এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতধারা ইউনেসকোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। এতে একজন নারী প্রথমে গানের সূচনা করেন, পরে দলগত কণ্ঠে অন্যরা শেষাংশ গেয়ে ওঠেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মৌখিকভাবে এই গানের ঐতিহ্য টিকে রয়েছে।

তবে সেতো ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে এখনও নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সম্প্রদায়ের নেতাদের মতে, পরিবারে ভাষার ব্যবহার কমে গেলে বিদ্যালয়ে শেখানো ভাষা যথেষ্ট কার্যকর হয় না। তরুণ প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে কাজ করছেন ২৩ বছর বয়সী মারিয়া গ্রুনবার্গ। তাঁর প্রত্যাশা, সেতো ভাষা ও গান যেন কেবল প্রবীণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে জীবন্ত ও মূল্যবান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে টিকে থাকে।

❤️
👏
🙂
😞

ভিসা নিয়ে প্রবেশ করতে হয়, আছে নিজস্ব মুদ্রাও; বছরে একদিনের জন্য প্রতীকী রাজ্যে পরিণত হয় এস্তোনিয়ার একটি গ্রাম

প্রকাশঃ ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৭:৩৪

এস্তোনিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি ছোট্ট গ্রাম বছরে একদিনের জন্য রূপ নেয় একটি প্রতীকী রাজ্যে। সেখানে প্রবেশের জন্য দেওয়া হয় প্রতীকী ভিসা, চালু থাকে নিজস্ব প্রতীকী মুদ্রা এবং আয়োজন করা হয় সামরিক কুচকাওয়াজের আদলে প্রদর্শনী। এই আয়োজনের উদ্দেশ্য কোনো রাষ্ট্র পরিচালনা নয়, বরং বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা সেতো জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার দক্ষিণ-পূর্ব এস্তোনিয়ার মিকিতামায়ে গ্রামে সেতো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী ‘কিংডম ডে’ বা ‘রাজ্য দিবস’ উদ্‌যাপন করা হয়। উৎসবের মাঠে অ্যাকর্ডিয়নের সুরে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নাচতে দেখা যায় ৮০ বছর বয়সী মাইমে কাপতেনকে। তাঁর গলায় ঝুলছিল রুপার চেইন ও মুদ্রা, যার ঝনঝন শব্দ সেতো নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য।

সেতো জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এস্তোনিয়া ও রাশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। তাদের কখনো স্বাধীন কোনো রাজ্য ছিল না। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এস্তোনিয়া ও রাশিয়ার সীমান্ত নির্ধারণের ফলে তাদের ঐতিহাসিক আবাসভূমি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।

এর ফলে সীমান্তের দুই পাশে থাকা পরিবার ও স্বজনদের যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়ে। আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করা কিংবা পূর্বপুরুষদের কবর জিয়ারত করতেও অনেকের ভিসার প্রয়োজন হতে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৪ সালে প্রতীকী ‘সেতো রাজ্য’ উৎসবের সূচনা হয়। আয়োজনটির লক্ষ্য বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীকে একত্র করা, সেতো সংস্কৃতির প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং তাদের ভাষা সংরক্ষণে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

এস্তোনিয়ার ২০২১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ সেতো ভাষা বলতে পারেন। তবে ভাষাবিদদের ধারণা, দৈনন্দিন জীবনে এই ভাষা ব্যবহার করেন মাত্র কয়েক হাজার মানুষ। সেতো ভাষা এস্তোনীয় ভাষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত হলেও সেতো জনগোষ্ঠী এটিকে একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে বিবেচনা করে।

প্রতিবছর এই উৎসবে সেতো সম্প্রদায়ের একজন নতুন প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়, যিনি ‘উলেমসুতস্কা’ নামে পরিচিত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি সেতোদের পৌরাণিক রাজা পেকোর পক্ষ থেকে জনগণের কাছে বার্তা পৌঁছে দেন। এবার এই দায়িত্ব পেয়েছেন লোকজ পোশাক নির্মাতা ইংরিত কালা। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর প্রধান লক্ষ্য সেতো সংস্কৃতির প্রচার এবং ভাষা সংরক্ষণে কাজ করা।

উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ প্রাচীন ‘লেলো’ গান। এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতধারা ইউনেসকোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। এতে একজন নারী প্রথমে গানের সূচনা করেন, পরে দলগত কণ্ঠে অন্যরা শেষাংশ গেয়ে ওঠেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মৌখিকভাবে এই গানের ঐতিহ্য টিকে রয়েছে।

তবে সেতো ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে এখনও নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সম্প্রদায়ের নেতাদের মতে, পরিবারে ভাষার ব্যবহার কমে গেলে বিদ্যালয়ে শেখানো ভাষা যথেষ্ট কার্যকর হয় না। তরুণ প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে কাজ করছেন ২৩ বছর বয়সী মারিয়া গ্রুনবার্গ। তাঁর প্রত্যাশা, সেতো ভাষা ও গান যেন কেবল প্রবীণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে জীবন্ত ও মূল্যবান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে টিকে থাকে।